কালো পতাকায় ছেয়ে গেছে পূর্ব পাকিস্তান। কিছু সরকারি দপ্তর ছাড়া বন্ধ সব অফিস-আদালত। বাতাসে ছড়াচ্ছে দ্রোহ। ক্ষোভে জ্বলছে বাঙালি। মুক্তিপাগল বাঙালির সব পথ এসে মিশেছে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে। ভিড় বাড়ছেই জনতার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ সামরিক জান্তা। সংকট উত্তরণে আন্দোলনের নানা পথ, দিক ও গতিপ্রকৃতির নানা নির্দেশনা দিচ্ছিলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
উত্তাল পরিস্থিতি নিয়েই এলো ১৬ মার্চ। একাত্তরের এদিন সকালে কড়া সামরিক প্রহরায় প্রেসিডেন্ট হাউজে (বর্তমান সুগন্ধা) বসে ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক। সাদা গাড়িতে শোকের প্রতীক কালো পতাকা উড়িয়ে বৈঠকে যোগ দেন বঙ্গবন্ধু।
সকাল ১১টায় শুরু হয়ে একান্ত রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলে টানা আড়াই ঘণ্টা। ভেতরে যখন আলোচনা চলছিল, ভবনের সংরক্ষিত এলাকার বাইরে তখন উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছাত্র-জনতা। থেকে থেকে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে কেঁপে উঠছে চারপাশ। বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট ভবনের প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষারত দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের বঙ্গবন্ধু বললেন, রাজনৈতিক ও অন্যান্য সমস্যা প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, আলোচনা চলবে। কাল সকালে আবার আমরা বসছি। প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বেরিয়ে বঙ্গবন্ধু সোজা এলেন ধানমন্ডির বাসভবনে। গভীর রাত পর্যন্ত দু’দফা বৈঠক করলেন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে।
সকালে ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় আইনজীবীদের এক সমাবেশ। সভাপতিত্ব করেন আসাদুজ্জামান খান। চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক সমাবেশ করেন। সভা শেষে বিক্ষোভ মিছিল নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিলের নেতৃত্ব দেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হয় ব্রতচারী আন্দোলনের অনুশীলন। বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিল্পী ও সাহিত্যিকরা কবিতা পাঠ ও গণসংগীত পরিবেশন করেন। বুলবুল ললিতকলা একাডেমির শিল্পীরা ধানমন্ডিতে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন।
বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে সমাবেশ শেষে শোভাযাত্রা বের করেন ডাক বিভাগের কর্মীরা।
টঙ্গীর ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা জঙ্গি মিছিল করেন। শীতলক্ষ্যা নদীতে নৌকা মিছিল করেন নারায়ণগঞ্জের ডকইয়ার্ড শ্রমিকরা। জাতীয় শিপিং করপোরেশনের দুই বাঙালি পরিচালক সংস্থার জাহাজে করে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য ও সমরাস্ত্র আনার প্রতিবাদ জানান।
বিদেশি বিমানে করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য ও সামরিক অস্ত্র বহন বন্ধ করতে ভারত সরকার তার ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে সব বিদেশি বিমানের পূর্ব পাকিস্তান গমন নিষিদ্ধ করে।
ভারতের প্রবীণ রাজনীতিক জয়প্রকাশ নারায়ণ নয়াদিল্লিতে বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ নেতৃত্বের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বিশ্বের প্রতিটি মানুষ ও সরকারকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশকে অকুণ্ঠ সমর্থনের আহ্বান জানান।
ময়মনসিংহের জনসভায় ন্যাপ প্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আহ্বান জানান।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হোস্টেল, জোহা হল ও মুন্নুজান হল, যশোর ও রংপুর সেনানিবাস এলাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, ঢাকার পিলখানা, ফার্মগেট, রামপুরা ও কচুক্ষেত এলাকায় অসহযোগ আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালায় সামরিক বাহিনী।
শাসনতন্ত্র প্রণয়নের আগে আওয়ামী লীগ ও পিপলস পার্টির সমন্বয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠনে পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ভুট্টোর প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেন পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা।