প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের অধীনে চলমান প্রকল্পের বেশ কয়েকটির অগ্রগতি অসন্তোষজনক। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে এসব প্রকল্পের গতি বাড়াতে নিবিড় পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা সভা হয়েছে। এতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। সভার কার্যপত্র প্রকল্প তদারকি সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে (আইএমইডি) পাঠানো হলে বিভাগের সচিব বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বে সঙ্গে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন বিভাগের সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী।
প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের আওতাধীন প্রকল্পের সংখ্যা ১৮টি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিভুক্ত (এডিপি) এসব প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ রয়েছে ৩ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক সহায়তা ২ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা, জিওবি ১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। অর্থবছরের সাত মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও এসব প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা সভা হয়েছে। সভার কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। সভায় এসব প্রকল্পে অগ্রগতি সন্তোষজনক নয় বলে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে একদিকে প্রকল্পের সময় বৃদ্ধি পায়, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অর্থায়নের সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয়। প্রায়ই যথাযথ পরিকল্পনা এডিপিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বরাদ্দ দাবি করে খরচ করতে না পেরে তা সংশোধিত এডিপিতে হ্রাস করার প্রবণতা দেখা যায়। এতে আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে।
আইএমইডি সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী আইএমইডির সংশ্লিষ্ট সেক্টরকে এ প্রসঙ্গে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, কার্যবিবরণীতে বর্ণিত সিদ্ধান্তগুলোর বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট সেক্টরে পাঠানো হয়েছে। সেক্টরগুলোকে বলা হয়েছে, এসব প্রকল্প পর্যবেক্ষণের সময় প্রকল্পের পরিচালকদের কাছে ফিডব্যাক যেন নেওয়া হয় এবং তা পরিবীক্ষণের প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করা হয়। বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা থাকলেও তা সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কার্যপত্রে বাস্তবায়নাধীন এর প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের আওতাধীন চারটি সংস্থার বাস্তবায়নাধীন ১৮টি প্রকল্পের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের পাঁচটি, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের আটটি, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তিনটি, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তরে একটি, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার কর্তৃপক্ষের একটি প্রকল্প রয়েছে। বর্ণিত প্রকল্পের সাতটি প্রকল্পের কাজ চলতি অর্থবছরের শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৪০ ভাগ প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে অর্থাৎ সাতটি প্রকল্প সংশোধন করা হয়েছে ও সাতটি প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারির সভায় আহমদ কায়কাউস বলেন, এর আগে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় প্রধানমন্ত্রী একান্ত অপরিহার্য না হলে প্রকল্প সংশোধন পরিহার এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে যেকোনো ধরনের গাফিলতি হলে প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে নির্দেশনা দিয়েছেন। এ নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাখ্যা করার নির্দেশ দেন তিনি।
সভায় বলা হয়, বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের মধ্যে চারটি প্রকল্প সবচেয়ে কম গতিসম্পন্ন। এসব প্রকল্প বেজা ও বেপজার আওতায় বাস্তবায়নাধীন, যার সার্বিক অগ্রগতি শূন্য থেকে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ।
সভায় সচিব প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও প্রকল্প পরিচালকের তৎপরতা পর্যাপ্ত না হওয়ায় বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে রয়েছে। এ সময় জানানো হয়, বেজার আওতায় মিরসরাইয়ে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পের অনুমোদন পায় ২০১৯ সালের এপ্রিলে। কিন্তু অদ্যবদি প্রকল্পের কোনো কাজ হয়নি। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক সভায় বলেন, ভারতের পক্ষ থেকে পরামর্শক নিয়োগ ও কার্যাদেশ অনুমোদন পেতে দেরি হয়েছে। তবে এখন মূল কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া চলছে। চলতি অর্থবছরে এডিপি বরাদ্দ কমানো হয়েছে।
বেজার অধীনে নারায়ণগঞ্জ আড়াইহাজারে জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন হয় ২০১৯ সালের মার্চ মাসে। ২০২০ সালের জুন নাগাদ প্রকল্পে সার্বিক অগ্রগতি ৬.৮ শতাংশ এবং চলতি বছরের মোট বরাদ্দে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য চারভাগ ব্যয় হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক বলেন, এডিপির বরাদ্দ ছিল ৮৫৫ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ১৭০ কোটি টাকা করা হয়েছে।
বেপজার অধীনে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল মিরসরাই প্রকল্পের অনুমোদন পায় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে। ২০২০ সালের জুন নাগাদ এর অগ্রগতি ২৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ আর চলতি অর্থবছরে বরাদ্দে মাত্র ৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। তবে এডিপি বরাদ্দে ২০০ কোটি টাকা খরচ করা সম্ভব হবে বলে প্রকল্প পরিচালক জানান। সভায় বেজার নির্বাহী পরিচালক বেপজাকে ধীরগতিসম্পন্ন প্রকল্পে গতি বাড়ানোর অনুরোধ করেন। এ ক্ষেত্রে বিশেষ পরিবীক্ষণের আহ্বান জানান। তবে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অগ্রগতি ভালো। চলতি অর্থবছরের বরাদ্দে শতভাগ ব্যয় হবে বলে জানানো হয়। এ বছর ১ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পে এ বছর কোনো বরাদ্দ ছিল না। চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেলে খরচ করা যাবে।
টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট অর্জনে জনপ্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে কভিড-১৯-এর কারণে। এজন্য এডিপিতে বরাদ্দের ৮৭ কোটি টাকা থেকে সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ হ্রাস করে ৭২ কোটি টাকা করা হয়েছে। বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া) প্রকল্পের বরাদ্দের পুরো টাকা ব্যয় করা সম্ভব হবে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক। এ বছর ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।
সভা শেষে সভাপতি বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাজ দ্রুত সমাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। খুরুশকুল প্রকল্পে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যান্য প্রকল্পের বিষয়েও সব ধরনের সমস্যা সমাধান করতে হবে।