প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের দুর্নীতির সহযোগী ও তার বান্ধবী নাহিদা আক্তার রুনাইসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিল এলাকা থেকে দুদকের উপ-পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানের নেতৃত্বে একটি টিম ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট নাহিদা রুনাই, সাবেক এমডি সৈয়দ আবেদ হাসান ও সিনিয়র ম্যানেজার রাফসান রিয়াদ চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য গতকাল দেশ রূপান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। আদালতের প্রসিকিউটর মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীরের বরাতে তিনি জানান, মতিঝিল থেকে গ্রেপ্তার করে দুদকের কার্যালয়ে আনার পর আসামিদের প্রত্যেকের পাঁচ দিন করে রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক রবিউল আলমের আদালত শুনানি শেষে তাদের পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করে।
প্রণব কুমার ভট্টাচার্য জানান, গত জানুয়ারি মাসে দুদকের দায়ের করা একটি মামলায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ওই মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামিরা অসৎ উদ্দেশ্যে পরস্পরের সহায়তায় প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির আশ্রয়ে ভুয়া বা অস্তিত্ববিহীন প্রতিষ্ঠান ‘আনান কেমিক্যাল লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জাল রেকর্ডপত্র তৈরি করেন। তারা অস্তিত্ববিহীন প্রতিষ্ঠানের মালিককে ভুয়া ঋণ পেতে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেন। আনান কেমিক্যালের পরিচালকরা ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ৭০ কোটি ৮২ লাখ ভুয়া ঋণ অনুমোদন করেন। পরবর্তীকালে তা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করেন।
গ্রেপ্তার রুনাই চট্টগ্রামের খুলশী থানার পূর্ব নাসিরাবাদ এলাকার জাকির হোসেন বাইলেনের স্থায়ী বাসিন্দা। তার বাবার নাম মফিজুর রহমান। রুনাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষে ঢাকায় এসে রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিডেটে চাকরি পান। সেখানেই ২০০৯ সাল থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন পি কে হালদার। ২০১১-১২ সালে পি কে হালদারের সঙ্গে পরিচয় হয় রুনাইয়ের। এরপর ঘনিষ্ঠতা। পরে পি কে হালদার রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে নাহিদা রুনাইকে নিয়ে আসেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে। দ্রুত সময়ে তাকে চারটি পদোন্নতি দিয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট করেন পি কে হালদার।
দুদক কর্মকর্তারা আরও জানান, পি কে’র টাকা পাচারের অন্যতম সহযোগী এই নাহিদা রুনাই। কোন প্রতিষ্ঠান থেকে কত টাকা আত্মসাৎ ও পাচার হচ্ছে সেই হিসাব রাখতেন রুনাই। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন মহলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করতেন রুনাই।
দুদকের অনুসন্ধান দলের এক কর্মকর্তা বলেন, পি কে’র দখলে থাকা ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটিজের ১০০ কোটি টাকা নিজের মতো করে খরচ করার সুযোগ পান রুনাই। এ ছাড়া পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানিতে (বিআইএফসি) রুনাইয়ের দাপট ছিল। রুনাইয়ের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে ৭০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়া তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ২৮ কোটি টাকা।
গ্রেপ্তার সৈয়দ আবেদ হাসানের বাবার নাম সৈয়দ জাকের হোসেন। তার বাসা এলিফ্যান্ট রোডে। তিনি পি কে’র বন্ধু ও অর্থপাচারের অন্যতম সহযোগী। আর রাফসান রিয়াদ চৌধুরীর বাবার নাম সামসুদৌল্লা চৌধুরী। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী কাস্টম অ্যাকাডেমি এলাকার দক্ষিণ কাট্টলী এলাকার বাসিন্দা তিনি। রাফসান ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সিনিয়র ম্যানেজার।
আবেদ হাসান, রুনাই ও রাফসান এবং তাদের আরও কয়েক সহযোগী অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। তারা প্রতারণার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণের বিপরীতে কোনো মর্টগেজ নেননি। মর্টগেজ না নিয়ে ১০টি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের কথিত মালিককে কথিত ঋণ পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেন। যারা সবাই মূলত পি কে’রই সহযোগী। তারা ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ঋণের নামে ৭০০ কোটি টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করেন। ওই টাকা লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে ভুয়া কোম্পানি এবং বিভিন্ন ব্যক্তির হিসাবে স্থানান্তর ও রূপান্তর করেন যা অর্থপাচার আইনে অপরাধ। যার পরিপ্রেক্ষিতে দুদক ৩৭ আসামির বিরুদ্ধে ১০টি মামলার সুপারিশ করেছে। প্রত্যেকটি মামলায় প্রধান আসামি হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে পি কে হালদারের নাম।