সার্ধশতবর্ষে নতুন সমাজের দিশারি পারি কমিউন

পারি কমিউন! আধুনিক পৃথিবীতে শ্রেণিসংগ্রাম আর মুক্তির যুদ্ধে যারা সদা সোচ্চার, প্রতিটি মানুষের কাছে এই শব্দযুগল এক অসাধারণ ব্যঞ্জনা নিয়ে হাজির হয়। শোষকের কাছে ৭২ দিনের এই অভূতপূর্ব গণবিপ্লব ইউটোপিয়া হিসেবে সাব্যস্ত হয়, কিন্তু স্বাপ্নিক মানুষের কাছে এর প্রেরণা চিরস্থায়ী। বোধকরি, এই আন্দোলনকে আধুনিক যুগের সবচেয়ে মহত্তম ঘটনা বললে অত্যুক্তি করা হবে না। আজ থেকে ঠিক ১৫০ বছর আগে, ১৮ মার্চ, ১৮৭১ সালে ফ্রান্সের প্যারিস বা পারি শহরে এই স্বপ্নের শুরু। রাজা-গজা, অভিজাত আর জন্মসূত্রে পাওয়া শ্রেষ্ঠত্বের বদলে আমরা যাদের ‘নিচুতলার মানুষ’ বলি, তারাই শাসনভার নিতে পারেন, গড়তে পারেন এক সাম্যের সমাজ, সেই স্বপ্ন দেখিয়েছিল পারি কমিউন।

ফ্রান্স তথা শিল্পবিপ্লবের পরের ইউরোপে আন্দোলন-সংগ্রাম ব্যাপারটা নতুন ছিল না। কিন্তু পারি কমিউন এমন উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল যে সেটা আজও প্রাসঙ্গিক। ফ্রান্সের অবস্থা তখন বেশ খারাপ, সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন প্রুশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত ও ধৃত হন, পতন ঘটে দ্বিতীয় ফরাসি সাম্রাজ্য আর সূচনা হয় তৃতীয় রিপাবলিকের। প্রুশিয়ার কাছে পরাস্ত হওয়ায় পর ফ্রান্সের মূল সেনাবাহিনীকে নিরস্ত্রীকরণ করা হয় আর প্যারিস রক্ষার দায়িত্ব পড়ে ন্যাশনাল গার্ড তথা আধাসামরিক বাহিনীর হাতে।

নানা দলবল আর মতাদর্শে ফ্রান্সের প্রগতিশীল শিবির তখন সোশ্যালিস্ট, এনার্কিস্ট, জ্যাকোবিন ইত্যাদি ভাগে বিভক্ত। যুদ্ধে হারলেও এসব দলের বেশির ভাগ নেতাই তখন জেলবন্দি। কিন্তু মেহনতি মানুষের মধ্যে ক্রোধ আর অসহায়ত্ব ক্রমাগত বেড়ে চলছিল।

এসবেরই প্রেক্ষাপটে ১৮ মার্চ সকালবেলা মন্টমার্টের চূড়ায় আশ্রয় নেওয়া ফরাসি সৈনিক এবং তাদের কামানগুলোকে আটক করে সাধারণ জনতার ঢল। একই সঙ্গে প্যারিসের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকে সাধারণ মানুষ। অভিজাত শাসকশ্রেণি পড়িমরি করে পালিয়ে বাঁচে।

মন্টমার্টের দখলে অন্যতম নেতৃস্থানীয় ভূমিকা ছিল লুইজে মিশেলের। যদিও পারি কমিউনের বিপ্লবে আলাদা করে নেতা চিহ্নিত করা হয় না, কারণ এই আন্দোলন নেতাসর্বস্ব ছিল না, কিন্তু এই এনার্কিস্ট নারী এই আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে আছেন।

মিশেলের জবানিতে ‘সকালের সূর্য উঠছিল। গার্ডরা পাগলের মতো বেল বাজাচ্ছিল, কিন্তু আমাদের কি জানি হলো! আমরা এর চেয়েও জোরে পাহাড় বাইতে লাগলাম। আমাদের সেই মুহূর্তে জীবনের মায়া বলে কিছু ছিল না। আমাদের খালি একটাই লক্ষ্য, এই হাজার বছরের অভিজাত অভিশাপদের হটাতে হবে, তা না হলে এই জীবনের মানেই বা কী!’

মিশেলের এই উত্তেজনা টের পাওয়া যায় প্যারিসের রাস্তায়, যেখানে হাজার হাজার উন্মত্ত জনতা গান গাইছে

‘আকাশ ফুঁড়ে আমাদের জন্য কোনো রক্ষাকর্তা আসেনি

আমাদের বিশ্বাস নেই কোনো রাজপুত্তুর বা পয়গম্বরে

আমাদের এই শ্রমিকের হাতই ভাঙবে সমস্ত শৃঙ্খল’

মিশেলদের স্বপ্নের কমিউন মাত্র ৭২ দিনের জন্য সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও এ সময়েই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল নারীদের পুরুষদের মতো সমতার মজুরি ও ভোটাধিকারের। আর শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা, ন্যূনতম মজুরি, গৃহহীনদের জন্য গৃহের ব্যবস্থা আর অভিবাসী শ্রমিকদের নাগরিক অধিকারের ব্যাপারগুলো তো ছিলই। যুদ্ধবিধ্বস্ত, খরা আর অর্থনৈতিক মন্দার হুমকিতে থাকা শহরটায়ও এই ক্ষণস্থায়ী সরকার কীভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছিল, সেটা জানা যায় কাউন্সিল মেম্বার আর্নল্ডের জবানিতে : ‘কমিউনের স্বল্পকালীন শাসনের সময়কালে একজন পুরুষ, নারী বা শিশুও অভুক্ত থাকেনি, ঠান্ডায় মারা যায়নি কিংবা গৃহহীন হওয়ার কারণে খোলা আকাশের নিচে থাকতে বাধ্য হয়নি। এটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার ছিল যে, খুবই সামান্য রসদে কীভাবে ওই সরকার দুই মাস শুধু যুদ্ধ চালায়নি বরং একই সঙ্গে বিপুল জনগোষ্ঠীর দিকে ধেয়ে আসা খরার মোকাবিলা করে; যে জনগোষ্ঠী বিগত এক বছর প্রায় কর্মহীন ছিল। সত্যিকারের গণতন্ত্র কি দারুণ সুফল বয়ে আনতে পারে এর সেরা উদাহরণ ছিল পারি কমিউন।’

পারি কমিউন সত্যি সত্যিই গণতন্ত্র তথা জনতার শাসন ছিল। জনতার প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে চালিত সেই ব্যবস্থা প্রচলিত বৈষম্যের সমাজব্যবস্থাকে ভেঙেচুরে দেয়। ইতিহাসবিদরা যেমনটা বলেন যে, বেশির ভাগ সময়ে বিরোধীদের আলাপেই প্রকৃত সত্য উঠে আসে। তাই, কমিউনবিরোধীদের আলাপগুলোও প্রণিধানযোগ্য। সে সময় প্যারিসের নামজাদা ডায়েরি লেখক ও কমিউনবিরোধী এডমুন্ড গনকুর্টের লেখায় পাওয়া যায় :

‘যা হচ্ছে তা সরল ভাষায় বললে শ্রমিক শ্রেণির মানুষের ফ্রান্স দখল এবং এদের স্বৈরাচারী শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে অভিজাত ও শাসকশ্রেণির মানুষ। যাদের সব ছিল তাদের বদলে ক্ষমতা এখন সর্বহারাদের দখলে। এসব নচ্ছার সর্বহারাগুলো যুগ যুগ ধরে সমাজে চলে আসা ব্যবস্থা, রীতিনীতি, জাতপাত, স্থিতি আর পবিত্রতার প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ দেখাচ্ছে না।’

প্রথাগত গণতন্ত্রের নামে অভিজাতের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা আর বড় বড় করপোরেশনকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ায় বিশ্বাসী ছিল না পারি কমিউন। বরং তারা দৃঢ়ভাবে বলতেন এই শাসনব্যবস্থা ‘শ্রমিকের একনায়কতন্ত্র’।

এ কথাটাই ধার করেছিলেন কার্ল মার্ক্স, ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস আর এই মন্ত্রে উদ্দীপ্ত হয়ে প্রায় বছর পঞ্চাশেক পরে বিপ্লব করেন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। মার্ক্সের ভাষায় : ‘প্যারিসের শ্রমজীবী মানুষ, তাদের কমিউনকে, চিরদিন স্মরণ উদযাপন করা হবে নতুন সমাজের আলোর দিশারি হিসেবে। এর শহীদরা চিরদিন শ্রমিক শ্রেণির হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে থাকবেন। আর এর নির্মাতাদের জন্য ইতিহাস ইতিমধ্যেই এমন এক স্থায়ী আসন পেতেছে, যা দুনিয়ার তাবৎ শক্তি মিলেও সরাতে পারবে না।’

অবশ্য, ইতিহাসের পাতা থেকে সরাতে না পারলেও পারি কমিউনকে নির্মূল করা হয়েছিল নৃশংসভাবে। যেই প্রুশিয়ার কাছে লজ্জাজনকভাবে হেরেছিল তাদেরই কাছে মাথা নুইয়ে তাদের সেনাবাহিনী আর ফ্রান্সের সেনাবাহিনীকে এক করে কমিউনারদের ওপর নির্মম আক্রমণ করা হয়। মাত্র দশ দিনের মাথায় অন্তত ২৫ হাজার মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। শ্রেণি-সংগ্রামের আলাপে শ্রমিক শ্রেণিকে বেশির ভাগ সময় প্রতিশোধপরায়ণ দেখানো হলেও পারি কমিউন নির্মূলে অভিজাতরা যে নৃশংসতা দেখান, সেটি অবিশ্বাস্য। ফরাসি ইতিহাসবিদ জন মেরিম্যান ‘ম্যাসাকার’ বইয়ে এর বহু বিবরণ দিয়েছেন।

মেরিম্যানের জবানিতে ‘যাকেই সন্দেহ করা হয়েছিল সে ওই ৭২ দিন প্যারিসে ছিল, অভিজাতরা ওদের বিনা প্রশ্নে, তা সে শিশু হোক কিংবা বিকলাঙ্গ, গুলি করে মারে।’ তাতে অবশ্য, পারি কমিউনকে চাপা দেওয়া যায়নি। পারি কমিউন আজও প্রাসঙ্গিক।

তাই দেড়শো বছর পরেও এই বিশেষ দিবস উপলক্ষে প্যারিসের কাউন্সিলর লরেন্স প্যাট্রিস ব্রিটেনের সংবাদপত্র গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘আমরা এমন এক বিশাল অংশের নাগরিকদের কথা বলছি, যারা নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার জন্য জড়ো হয়েছিলেন। কমিউন এমন এক দুনিয়ার স্বপ্ন দেখত, যেটা আমরা আজও দেখি।’

আজকের দিনে ভীষণ অসাম্যের এই দুনিয়ায়, একদিকে কিছু লোকের সম্পদ খালি বাড়ছেই, অন্যদিকে অনেক গুণে বাড়ছে দরিদ্র, অভুক্ত মানুষের সংখ্যা। বাড়ছে মহামারী, ক্ষুধা, যুদ্ধ আর সব হারানো শরণার্থী। স্বাধীনতাকামী মানুষরা পথে নামছে, নতুন করে স্লোগান উঠছে ‘সময় এসেছে নতুন দুনিয়া গড়ার’, ‘আমরাই ৯৯ শতাংশ’ কিংবা ‘বৈশ্বিক চিন্তা করো, স্থানীয়ভাবে কার্যকর করো’। সিয়াটল, ক্যাটালুনিয়া কিংবা দিল্লির রাজপথ যখন আন্দোলনের উত্তাপে দিশা খুঁজছে, তখন পারি কমিউনকে এক বাতিঘর হিসেবে স্মরণ করাটাই স্বাভাবিক।

সেই পারি কমিউন, যা নৃশংসভাবে দমন করা হলেও, যার গর্ভে জন্ম হয়েছিল ইউজিন পটিয়ারের সেই অমর গান ‘ইন্টারন্যাশনাল’। পারি কমিউনের দেড়শো বছরের পূর্তিতে তাই নানা দেশে একসঙ্গে গাওয়া হবে সেই অমর সংগীত : ‘জাগো জাগো জাগো সর্বহারা/অনশন বন্দী ক্রীতদাস/শ্রমিক দিয়াছে আজ সাড়া/উঠিয়াছে মুক্তির আশ্বাস।। সনাতন জীর্ণ কু-আচার/চূর্ণ করি জাগো জনগণ/ঘুচাও এ দৈন্য হাহাকার/জীবন-মরণ করি পণ।। শেষ যুদ্ধ আজ শুরু কমরেড/আসো মোরা মিলি একসাথ/গাও ইন্টারন্যাশনাল/মিলাবে মানবজাত।।

লেখক সাংবাদিক ও অনুবাদক

faizbsu006@gmail.com