পূর্ব পাকিস্তানে তখন চূড়ান্ত সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বাঙালি। শহর, গ্রামগঞ্জে চলছে অস্ত্র প্রশিক্ষণ, কুচকাওয়াজ। বিক্ষোভে আন্দোলনে অচল ঢাকা। ধানম-ির ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধুর বাড়িটি শেষ গন্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সব মানুষের, মিছিলের। রাতে কয়েক ঘণ্টার জন্য নীরব থাকে। তারপর মধ্যরাত অবধি জেগে থাকে বাড়িটি মিছিলে স্লোগানে গানে। ভেতরে ব্যস্ত বঙ্গবন্ধু। চলছে অবিরাম বৈঠক। কিছুক্ষণ পর পর বারান্দায় এসে দাঁড়ান। ছোট ছোট বক্তৃতা দেন। সাহস জোগান বাঙালিকে।
আজ ১৮ মার্চ। একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের সপ্তদশ দিন। সরকারি-বেসরকারি ভবনের শীর্ষে যথারীতি উড়ল কালো পতাকা। বন্ধ থাকল অফিস আদালত। মুজিব-ইয়াহিয়া পরবর্তী বৈঠকের কোনো সময় নির্ধারণ না হওয়ায় জনমনে সৃষ্টি হলো উৎকণ্ঠার। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে ভিড় করে রইল উৎসুক জনতা। দেখা দিল নতুন সংকট। আজ থেকেই চূড়ান্ত সংগ্রামের প্রস্তুতি নিল আওয়ামী লীগ। সর্বত্র শুরু হলো যুবক-যুবতীদের সামরিক প্রশিক্ষণ। ৩২ নম্বরে আসা সর্বস্তরের মানুষের প্রতি চরম প্রস্তুতি নিয়ে ঘরে ঘরে সংগ্রামী দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানালেন বঙ্গবন্ধু।
আজও সকাল থেকেই বিপুলসংখ্যক দেশি-বিদেশি সাংবাদিক সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার বাসভবনে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আরও সৈন্য আনা হচ্ছে, সে সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু কিছু জানেন কী নাজনৈক বিদেশি সাংবাদিকের এমনতর প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, আমার দেশের মাটিতে যা কিছু ঘটছে তার সব খবরই আমি রাখি।
সকালে হঠাৎ করেই সেনাবাহিনীর সদস্যরা তেজগাঁও ও মহাখালীতে শ্রমিকদের ট্রাকে হামলা চালায়। নির্মমভাবে প্রহার করে নিরস্ত্র ট্রাক আরোহীদের। ছিনিয়ে নেয় টাকা-পয়সা। প্রতিবাদে পথে নামে বিক্ষুব্ধ মানুষ। রাতে ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে এক বিবৃতি দেন আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির উপনেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম। রাতে আরেকটি বিবৃতিতে পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনী তলব প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেন, আমরা এ ধরনের তদন্ত কমিশন চাইনি। আমরা চেয়েছিলাম সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রকাশ্য তদন্ত। তাই এ কমিশন মেনে নিতে পারি না।
রাতে এক সরকারি ঘোষণায় বলা হয়, ১৯ মার্চ বেলা ১১টায় প্রেসিডেন্ট হাউসে আওয়ামী লীগ প্রধান ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে তৃতীয় দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
পূর্ব পাকিস্তানের জন্য খাদ্যশস্যবাহী ‘ইরনা এলিজাবেথ’ নামে জাহাজটি গতিপথ বদল করে করাচি নিয়ে যায় সরকার। চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক গুলিবর্ষণ ও অন্যান্য ঘটনার সরেজমিন তদন্তে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তিন সদস্যের একটি দলীয় তদন্ত কমিটি চট্টগ্রামে যায়।
ঢাকায় বিমানবাহিনীর সাবেক বাঙালি সৈনিকরা স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে সংগ্রাম কমিটি গঠন করেন। বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এক বিবৃতিতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশ্বের মুক্তিকামী জনগণের সমর্থন কামনা করে। আমেরিকা, ব্রিটেন, রাশিয়া, চীন প্রভৃতি শক্তির প্রতি তাদের সরবরাহকৃত অস্ত্রের দ্বারা বাঙালিদের ওপর গণহত্যা চালানোর প্রয়াস ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সামরিক বাহিনী ও অস্ত্রশস্ত্র বোঝাই বিমান চলাচল বন্ধের জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুদ্ধিজীবীদের কাছে অসংখ্য তারবার্তা পাঠায়। তারবার্তায় পশ্চিম পাকিস্তান সামরিক জান্তার পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা চক্রান্তের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় এবং গণহত্যাযজ্ঞ থেকে তাদের নিবৃত্ত করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়।
করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো জানান, শাসনতান্ত্রিক প্রশ্নে আলোচনার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তাকে ঢাকায় আসার যে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলে, তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ ঢাকা যাওয়ার ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের কাছে জানতে চাওয়া কয়েকটি বিষয়ের কোনো জবাব পাননি তিনি।