কয়রার নাকশা গ্রামের কৃষক হাফিজুর রহমান এখন থাকেন খুলনা নগরীর ৫ নম্বর ঘাটের গ্রিনল্যান্ড বস্তির ডি ব্লকে। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে ঘরবাড়ি সব হারিয়ে সপরিবারে এসে ওঠেন খুলনার এই বস্তিটিতে। ঘূর্ণিঝড় আইলা বদল ঘটিয়েছে হাফিজুরের পেশাতেও। নিজে রিকশা চালিয়ে যা পান তার সঙ্গে বাসাবাড়িতে কাজ করে স্ত্রী হালিমা বেগমের পাওয়া হাজার তিনেক টাকায় কোনোরকমে টেনেটুনে চলছে সংসার। সংসারের অভাব-অনটন নিয়ে তেমন একটা দুঃখ নেই এই দম্পতির। তবে মাথাগোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু হারানোর আতঙ্ক সবসময় ঘিরে থাকে তাদের। কারণ তাদের আশ্রয়স্থল বস্তিটি রেলওয়ের জমিতে হওয়ায় যেকোনো সময় হতে পারেন উচ্ছেদের শিকার।
এই হাফিজুর-হালিমা দম্পতির মতো হাজারো জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারের ঠিকানা এখন খুলনা নগরী। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে ছোট-বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই আছে। বছরে বছরে এই সংখ্যা বেড়ে চলেছে। আর সেই সঙ্গে বাড়ছে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যাও। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ভিড় বাড়ছে নগরীতে। তবে এসব উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কারও যেন কোনো মাথাব্যথা নেই। এমনই দাবি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে মাইগ্রেশন হওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক হলেও তাদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের সুদীর্ঘ পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
খুলনা সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, নগরীতে ছোট-বড় মোট ৪০টি বস্তি রয়েছে। এসব বস্তিতেই জলবায়ু উদ্বাস্তুরা ঠাঁই নিচ্ছেন। তেমনি একটি নগরীর ২১ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রিনল্যান্ড বস্তি। এখানে হাজারো মানুষ বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে বসবাস করছেন। রেলওয়ের জমিতে গড়ে ওঠা এই বস্তিতে বসবাস করছেন একসময়ে কয়রার স্থায়ী বাসিন্দা অর্ধশত পরিবার। তাদের মধ্যে কোনো পরিবার এসেছে ঘূর্ণিঝড় আইলার পর, কেউ এসেছেন ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর, আবার কেউবা এসেছেন ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর। তারা সবাই প্রাকৃতিক দুর্যোগে হারিয়েছে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু। নদী কেড়ে নিয়েছে শেষ সম্বল জমি। কারও আবার জমি থাকলেও লবণাক্ততা কেড়ে নিয়েছে সেই জমিতে ফসল করার অনুকূলতা।
সব হারানো তেমনি একজন হালিমা বেগম (৩৭)। তার বাড়ি ছিল কয়রার নাকশা গ্রামে। ঘূর্ণিঝড় আইলার প্রভাবে নদীর পানিতে ঘরবাড়ি সব তলিয়ে যাওয়ার পর সপরিবারে খুলনায় আসেন। তখন থেকেই ৫ নম্বর ঘাট গ্রিনল্যান্ড বস্তির ডি ব্লকে নিজ খরচে ঘর তুলে বসবাস শুরু করেন। বাসাবাড়িতে কাজ করে মাসে আয় হয় আড়াই হাজার টাকা। এই আয় দিয়ে চলে তার ছয়জনের সংসার।
তিনি জানান, তার স্বামী হাফিজুর রহমান পেশায় রিকশাচালক। দুজনের আয় দিয়ে সংসার চলে কোনোরকমে। সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী সুমী ও সাড়ে চার বছরের ময়নাসহ দুটি সন্তান এই দম্পতির। সংসারের অভাব-অনটন নিয়ে তেমন একটা দুঃখ না থাকলেও মাথাগোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু হারানোর আতঙ্ক সবসময় ঘিরে থাকে হালিমা বেগমকে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের বস্তিটি রেলওয়ের জমিতে। প্রায়ই রেল কর্র্তৃপক্ষ উচ্ছেদ করার কথা বলে যায়। এ নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকি। এছাড়া করোনার সময় সারা দেশে গরিব মানুষরা অনেক সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছে বলে শুনেছি। কিন্তু আমরা শুধু পাঁচটি সাবান ছাড়া আর কিছুই পাইনি।’
নগরীর সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালের পাশে গড়ে উঠেছে খোড়াবস্তি। ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে এ বস্তির অবস্থান। বর্তমানে এ বস্তির নামকরণ হয়েছে স্থানীয় কাউন্সিলরের নাম অনুসারে হাফিজ নগরী। এ বস্তিতে ভাড়া থাকেন কামরুল রহমান। পেশায় রাজমিস্ত্রি কামরুলের দৈনিক আয় ৬৫০ টাকা। দেড় হাজার টাকা দিয়ে তিনি ঘরভাড়া থাকেন পরিবারের চার সদস্য নিয়ে। তার স্ত্রী নূর নাহার বেগম গৃহিণী। এই দম্পতি কয়রার দক্ষিণ বেদকাশী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে তাদের বাড়িঘর সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। দু’বছর কোনোভাবে পাউবোর বেড়িবাঁধের ওপর বসবাস করলেও পরে আর পারেননি।
কামরুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইলার দুই বছরের মাথায় চরম অর্থ সংকটে পড়ে খুলনা শহরে চলে আসি। এই বস্তিতে কোনোরকম জীবনযাপন করছি। করোনার সময় মেলেনি কোনো সাহায্য।’ কামরুলের মতো এই বস্তিতে আইলার পরে স্থায়ী ঠিকানা করেছে ৩০ থেকে ৪০টি পরিবার। তাদের মধ্যে কয়রার ভোগায় গ্রামের জলিল গাজী ও তার স্ত্রী আঞ্জুয়ারা, বামিয়া গ্রামের মুহসিন ও তার স্ত্রী তাসলিমা খাতুনেরও একই অবস্থা।
সাতক্ষীরার আশাশুনি থানার মধ্যম একসরা গ্রামের এক সময়ের বাসিন্দা দিনমজুর নূর ইসলামের স্ত্রী রহিমা বেগমও জলবায়ু উদ্বাস্তু। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চারজনের সংসারে স্বামী একা আয় করেন। ১৯শ টাকা ভাড়া দিয়ে খোড়াবস্তিতে থাকি। জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম করেই আমাদের বেঁচে থাকতে হচ্ছে। করোনার সময় শুধু দু’বার পাঁচ কেজি করে চাল সাহায্য হিসেবে পেয়েছি।’
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে মাইগ্রেশন হওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক হলেও তাদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের সুদীর্ঘ পরিকল্পনা থাকা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবেশ সুরক্ষা ফোরাম খুলনার আহ্বায়ক অ্যাড. কুদরৎ ই খুদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাইগ্রেশন হবে, বেঁচে থাকার স্বার্থে মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের সব অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এজন্য থাকা দরকার সুষ্ঠু পরিকল্পনা। কিন্তু এ উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকারের গৃহীত পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়।’
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের শিক্ষক অধ্যাপক তানজিল সৌগাত বলেন, ‘প্রকৃতিক কোনো দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ তাদের কাছাকাছি যে শহর আছে সেখানে আশ্রয় নেয়। খুলনা শহরেও একই অবস্থা। সরকারের কাজ হলো এই মানুষদের আশ্রয় দেওয়া ও জীবিকার ব্যবস্থা করা। তাছাড়া শহরের আশপাশের উপজেলাগুলোকে শহরের আদলে তৈরি করা হলে মূল শহরের ওপর চাপ কম পড়বে। তাহলে শহরের শৃঙ্খলা ঠিক থাকবে।’
জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনে কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না জানতে চাইলে খুলনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আজিজুল হক জোয়ার্দ্দার বলেন, ‘শহর এলাকায় আমাদের কাজ নেই বললেই চলে। আমাদের কাজ রুট লেবেলে। আমরা কাজ করি প্রশাসনের (ডিসি, ইউএনও) সঙ্গে। আমরা মাধ্যম হিসেবে কাজ করি, বাস্তবায়ন করে প্রশাসন। তাদের সঙ্গে কথা বললে এ বিষয়ে তারা সব থেকে ভালো বলতে পারবেন।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের আমরা সরকারি ও বেসরকারিভাবে পুনর্বাসনের জন্য কাজ করছি। রাস্তাঘাট ও বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। যারা গৃহহারা হয়েছে তাদের গৃহ নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৭০ পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে।’
অন্যদিকে খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি এনজিও যারা দুর্যোগপ্রবণ এলাকা থেকে শহরে এসেছে তাদের জন্য কাজ করছে। তাছাড়া আমাদের দারিদ্র্য মোচনের একটি কর্মসূচি আছে। বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে তাদের জীবনমান উন্নয়নসহ নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য করতে সাহায্য করি। শহর এলাকা হলো সরকারি জায়গা, সেখানে তাদের জন্য তো বাড়ি করা যাবে না। তবে শহরতলির বাইরে যদি খাসজমি থাকে তবে সেখানে তাদের জন্য বাড়ি বানানোর আমরা চেষ্টা করতে পারি।’