কেন বাড়ে অনিষ্পন্ন মামলা?

দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতগুলো দীর্ঘদিন ধরেই মামলার ভারে ভারাক্রান্ত। নানা সময়ে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও অসহনীয় মামলাজট থেকে নিষ্কৃতি মিলছে না। এতে করে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়ে ভুগতে হচ্ছে বিচারপ্রার্থীদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলা উদ্ভবের কারণ চিহ্নিত করে মামলার জট সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে না পারলে বিচারপ্রার্থী মানুষ আইন ও বিচার বিভাগ নিয়ে আস্থার সংকটে পড়বে।

২০১১ সালের শেষে দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতে বিচারাধীন অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৩২ হাজার। আইনমন্ত্রী ও আইন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলা ৩৮ লাখ বা এর কিছু কমবেশি হতে পারে। সে হিসাবে মাত্র এক দশকে মামলা বেড়েছে ১৬ লাখের বেশি। মামলাজটের এ ঊর্ধ্বমুখিতাকে ভয়াবহ আখ্যায়িত করে একে বিচার বিভাগের জন্য অশনি সংকেত বলছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। তাদের মতে, মামলা উদ্ভবের কারণ চিহ্নিত করে মামলার জট অবশ্যই সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। ব্যত্যয় হলে বিচারপ্রার্থী মানুষ আইন ও বিচার বিভাগ নিয়ে আস্থার সংকটে পড়বে।

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অধস্তন আদালতে মামলার জট কমাতে দেওয়ানি আদালত ও অর্থঋণ আদালতে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করতে গতকাল রবিবার নির্দেশনা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

মামলা কেন বাড়ে এমন প্রশ্নে আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানুষ বাড়ছে। বেড়েছে ফৌজদারি অপরাধ, পাল্টেছে অপরাধের ধরন। এছাড়া প্রশাসনের আইন পরিপন্থী সিদ্ধান্ত, মামলার কারণ উদ্ভব ও মানুষের মধ্যে মামলার প্রবণতাও বেড়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে দীর্ঘদিনেও আইন ও বিচার বিভাগের সংস্কার হয়নি। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিচারপ্রার্থীকে দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচার দিতে লক্ষণীয় কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাদের মতে, বিভিন্ন আইনে আপসযোগ্য মামলায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা যেমন মধ্যস্থতা, সালিশ ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পক্ষগণের বিরোধ নিষ্পত্তি করে মামলার প্রবণতা থেকে মানুষকে দমিয়ে আনা সম্ভব হলে লাখ লাখ মামলা আদালত পর্যন্ত আসবে না। কিন্তু এ পদ্ধতিও প্রতিপালিত হচ্ছে না যথাযথভাবে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলা বাড়লে শুনানিও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। আজকে পাঁচটা মামলা হলো। এর মধ্যে একটার শুনানি করতে চলে গেল ১৫ দিন। এদিকে প্রতিদিন নতুন মামলা ফাইল হচ্ছে। এসব কারণে কিন্তু মামলার দীর্ঘসূত্রতা হয়। মামলার জট বাড়ে। এখন কাদের স্বার্থে মামলা জিইয়ে রাখা হচ্ছে বুঝি না। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে একটা মামলা থেকে আরেকটা মামলা সৃষ্টি হচ্ছে। সমাজে তো এটা নিয়ে বিশৃঙ্খলা প্রতিহিংসা বাড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থা কেন ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে না বোধগম্য নয়। খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর ফৌজদারি মামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ দেওয়ানি মামলা ছাড়া অন্যান্য আপসযোগ্য মামলাগুলো শুধু সালিশ, মধ্যস্থতা ও আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সম্ভব। তাহলে এত মামলার জট হবে না, উভয়পক্ষ সন্তুষ্ট হবে এবং সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

তিনি বলেন, আমি মনে করি এডিআরের মাধ্যমে একটা নির্দিষ্ট সময়ে ১০ লাখের বেশি মামলা নিষ্পত্তি সম্ভব এবং এটি করতে পারলে মামলাজট এমনিতেই কমে আসবে।’

গত বছর মধ্য জুলাইতে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অধস্তন আদালতে ৩১ লাখ ৭২ হাজার ৪৩টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬৭৮ দেওয়ানি মামলা এবং ১৮ লাখ ৬ হাজার ৩৬৫ ফৌজদারি মামলা। এছাড়া সুপ্রিম কোটের হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলা পাঁচ লাখের বেশি। যার বেশিরভাগ মামলাই ফৌজদারি। সব মিলিয়ে ২০১৯ সাল পর্যন্ত উচ্চ ও অধস্তন আদালতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচারাধীন মামলা পৌনে ৩৭ লাখের কিছু বেশি (৩৬ লাখ ৮৪ হাজার ৭২৮টি)।

সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানায়, ২০২০ সালের প্রায় শুরু থেকে করোনাভাইরাসজনিত সৃষ্ট রোগ কভিড-১৯ সংক্রমণের শুরু হলে দীর্ঘ সময় উচ্চ ও অধস্তন আদালত বন্ধ থাকে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০২১ সালের মামলার পরিসংখ্যান প্রস্তুতের কাজ চলছে। এই এক বছরের বেশি সময়ে অন্তত লাখের বেশি নতুন মামলা যুক্ত হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বাধীনতার পর দেশের জনসংখ্যা ছিল আট কোটি। এখন জনসংখ্যা ১৮ কোটি। স্বাভাবিকভাবে মামলা বাড়ছে। কিন্তু সে অনুপাতে দীর্ঘদিনেও বিচারক, অবকাঠামো বাড়ানোসহ আইন ও বিচার বিভাগের সংস্কার হয়নি। ৩৮ লাখ মামলার জট। কিন্তু আমরা এখনো গতানুগতিক ধারায় চলছি। এখন সত্যিকার অর্থেই বিচার বিভাগের সংস্কার প্রয়োজন। যে হারে মামলা বাড়ছে এবং বিচার দীর্ঘসূত্রতায় পড়ছে তাতে মানুষ হতাশ হয়ে আর আদালতের দোরগোড়ায় আসতে চাইবে না। তখন অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। তার পরামর্শ, পরিস্থিতি উত্তরণে আইন বিষয়ে দক্ষ অভিজ্ঞ লোকদের মাধ্যমে অচিরেই একটি কমিশন গঠন করে বিচার বিভাগের আশু সংস্কার প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘বিচার করার পরেই আইনের শাসনের প্রশ্ন আসে। কিন্তু দ্রুততম সময়ে বিচার করার সুযোগটা তো থাকতে হবে। তাহলে না আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। এখন বিচারই যদি না হয় আইনের শাসন আসবে কোথা থেকে। তাই মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি এবং মামলার জট অবশ্যই কমাতে হবে।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেওয়ানি বা রিট মামলা বাড়ার জন্য সরকারের প্রশাসন দায়ী। প্রশাসন যদি আইন অনুযায়ী কাজ করে তাহলে মামলা কমে যাবে। আর আইন ভঙ্গ করে যত কাজ করবে তত মামলা বাড়বে। অন্যায় না হলে তো মামলা হবে না। দ্বিতীয়ত অপরাধের ক্ষেত্রে যখন অপরাধীরা মনে করে যে, অপরাধ করলে তারা পার পেয়ে যেতে পারবে, পাঁচ বছরেও বিচার শুরু হবে না, ২০ বছরেও বিচার শেষ হবে না এ ধরনের অসৎ সাহসটা কিন্তু সরকারের প্রশাসন যারা চালায় বা তদন্ত করে তাদের সম্মিলিত ফলাফল। এর দায়টাও সরকারের ওপরই পড়ে। এ দুই ধারার ক্ষেত্রেই সরকার বা প্রশাসন যত ভালো ব্যবস্থা নেবে মামলা তত কমে আসবে।’

তিনি বলেন, ‘মামলা বাড়লেও তাতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কোনো উদ্যোগ নেই। এর মানে সরকারের আইনের শাসনের প্রতি খেয়াল কম। সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে মহাপরিকল্পনা করতে হবে। না হলে কোনো লাভ হবে না। আইনের শাসনের দুর্বলতা যত বেশি দেখা দেবে রাষ্ট্রের জন্য সমাজের জন্য খারাপ বার্তা বয়ে আনবে।’