স্টল বিন্যাস নিয়ে ক্ষোভ

করোনা সংক্রমণের বিষয়টি মাথায় রেখে এবারের অমর একুশে বইমেলার পরিসর বাড়ার পাশাপাশি স্টল বিন্যাসেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। পরিসর বাড়ানোর বিষয়টি প্রশংসিত হলেও স্টল বিন্যাস নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে আয়োজক প্রতিষ্ঠান। প্রকাশকদের একাংশের অভিযোগ, মেলার মূল অংশে সব প্যাভিলিয়ন পাশাপাশি বরাদ্দ দেওয়ায় বইমেলা এবার একপেশে হয়ে গেছে। এ ছাড়া লিটলম্যাগ চত্বরের বরাদ্দ নিয়ে ক্ষুব্ধ লিটলম্যাগকর্মীরা টানা দুই দিন স্টল বন্ধ রেখেছে। প্রতিবাদের মুখে গত বছরের জায়গাতেই (সোহরাওয়ার্দী মুক্তমঞ্চের পাশে) লিটলম্যাগ চত্বর স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলা একাডেমি।

প্রতিভা প্রকাশের স্বত্বাধিকারী মঈন মুরসালিন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সব প্যাভিলিয়ন এক জায়গায় দেওয়ার কারণে ছোট প্রকাশকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্যাভিলিয়নগুলো তো সারা মেলায় ছড়িয়ে থাকার কথা। কিন্তু ছোট প্রকাশকদের কথা মেলার বিন্যাসের ক্ষেত্রে ভাবা হয়নি। এখন মেলার দুই কোনায় সব স্টলকে পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে। একটা স্টলের সাথে আরেকটা স্টলের কোনো ফাঁক রাখা হয়নি। মেলায় আসলে মনে হবে প্যাভিলিয়নগুলো মেলার অংশ, আমরা যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।’

এবার বইমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রায় ১৫ লাখ বর্গফুট জায়গায়। একাডেমি প্রাঙ্গণে ১০৭টি প্রতিষ্ঠানকে ১৫৪টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৩৩টি প্রতিষ্ঠানকে ৬৮০টি ইউনিট; মোট ৫৪০টি প্রতিষ্ঠানকে ৮৩৪টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মেলায় ৩৩টি প্যাভিলিয়ন রয়েছে, যার সবগুলো পাশাপাশি মেলার মধ্যভাগে। প্যাভিলিয়ন এক জায়গায় বরাদ্দ দেওয়ায় ক্ষুদ্র প্রকাশকদের অবহেলা করা হয়েছে বলে মনে করছেন কবি ওবায়েদ আকাশ। তিনি বলেন, ‘বইমেলার পরিসর বেড়েছে। এটা যেমন প্রশংসা করার মতো, আবার সব প্যাভিলিয়ন এক জায়গা রেখে ক্ষুদ্র প্রকাশকদের আলাদা দুই কোনায় সারিবদ্ধভাবে স্টল করে দেওয়াটা ঠিক হয়নি।’

এদিকে মেলার পূর্ব দিকে লেখক বলছি মঞ্চের পেছনে লিটলম্যাগ চত্বরটি করা হলেও লিটলম্যাগকর্মীদের প্রতিবাদের মুখে আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি গত বছরের জায়গাটিতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, সোহরাওয়ার্দী মুক্তমঞ্চের পাশের জায়গাটিতে নতুন করে লিটলম্যাগ চত্বরের স্টল সাজানোর কাজ শুরু হয়েছে। এবার লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে ১৩৫টি লিটলম্যাগকে স্টল বরাদ্দের পাশাপাশি ৫টি উন্মুক্ত স্টলসহ ১৪০টি স্টল দেওয়া হয়েছে।

স্টল বিন্যাসের ক্ষেত্রে করোনা সংক্রমণের বিষয়টি মাথায় রেখে এবার পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি স্টল বিন্যাস করা হয়েছে বলে জানান বইমেলার নকশাকার স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর। তিনি বলেন, ‘কাউকে বঞ্চিত করার জন্য নয়, মেলায় যেন স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং স্টল পেতে সহজ হয়, তার জন্য এবার জলাধারটির দুই পাশজুড়ে স্টলগুলো করা হয়েছে। আর সব প্যাভিলিয়ন এক জায়গায় করা হয়েছে। আমরা মনে করেছি এভাবে স্টল খুঁজে পেতে সহজ হবে। পাশাপাশি ঝড়-বৃষ্টির বিষয়টি মাথায় রেখে স্টল বিন্যাস করেছি।’

বইমেলার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্টল বিন্যাস নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে, আবার অনেকে প্রশংসাও করছেন। তবে আমরা আগামী বইমেলায় প্রকাশকদের সাথে আলোচনা করে স্টল বিন্যাসের বিষয়টি নতুন করে ভাবব।’

গতকাল বইমেলা বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলে। বিকেলে লোকজন কম থাকলেও সন্ধ্যায় দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা যায়। বই বিক্রি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন স্টলের বিক্রয়কর্মীরা। চারুলিপি প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী সোহেল বলেন, “বই বিক্রি ভালো হচ্ছে। শেখ হাসিনার লেখা ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনক আমার নেতা আমার’ বইটি ভালো বিক্রি হচ্ছে।” প্রথমা প্রকাশন থেকে মহিউদ্দিন আহমেদের লেখা ‘প্রতিনায়ক’, আকবর আলি খানের লেখা ‘বাংলাদেশ বাজেট অর্থনীতি ও রাজনীতি’, আহমদ রফিকের লেখা ‘রুশ বিপ্লব স্তালিন-বিতর্ক ও রবীন্দ্রনাথ’, বাতিঘর থেকে ‘লাল সন্ত্রাস’ বইগুলো ভালো বিক্রি হচ্ছে। মেলার শিশু চত্বরে বাবুই প্রকাশনী থেকে এসেছে অমর্ত্য রূপাইয়ের লেখা ‘কোলিয়াপ্তা কুলাপ্তা কালাপ্তা’। শিশু চত্বরে দেখা যায়, বড়দের হাত ধরে ছোটরাও এসে নতুন বই কিনছে। ধানমণ্ডি থেকে আসা চতুর্থ শ্রেণিপড়ুয়া তাইফা জানায়, মেলায় জাফর ইকবালের বই কিনতে এসেছে। মেলায় বইপ্রেমীদের অনেকেই ঘুরে বেড়িয়েছেন আর নতুন বইয়ের তালিকা সংগ্রহ করছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহনাফ ও মাইশা জানান, নতুন বইয়ের তালিকা তৈরি করে পরে একসাথে সব বই কিনে নেবেন তারা।

বইমেলার অনুষ্ঠান

গতকাল সোমবার ‘লেখক বলছি’ মঞ্চের অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন হুমায়ূন কবির ঢালী, জয়দীপ দে ও রাহেল রাজিব। এ ছাড়া বিকেল ৪টায় মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তারেক রেজা। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন নাসির আহমেদ, খালেদ হোসাইন ও মিনার মনসুর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবি অসীম সাহা।

নতুন বই

বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছে ১৩৯টি। এর মধ্যে বিভাস এনেছে মহাদেব সাহার কবিতার বই ‘পৃথিবী, তোমার দুঃখ ঘুচে যাবে’, মানবর্দ্ধন পালের প্রবন্ধের বই ‘ব্যাকরণের বিন্দুবিসর্গ’, অন্যপ্রকাশ এনেছে মৌরী মৌরিয়মের ‘ফানুস’, আগামী এনেছে মঈনুল আহসান সাবেরের উপন্যাস ‘কবেজ লেঠেল’, মোনায়েম সরকারের ‘আমার রাজনৈতিক জীবনে মুক্তিসংগ্রাম ও বঙ্গবন্ধু’,        আনোয়ারা সৈয়দ হকের উপন্যাস ‘আমার রেণু’ প্রভৃতি।

আজকের অনুষ্ঠানসূচি

আজ মঙ্গলবার অমর একুশে বইমেলার ষষ্ঠ দিন। মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী : মুক্তিযুদ্ধ ও নারী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মনিরুজ্জামান শাহীন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন মোহাম্মদ জাকীর হোসেন ও একেএম জসীমউদ্দীন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন সেলিনা হোসেন।