চট্টগ্রামে বিসিএস পরীক্ষা

নারী পরীক্ষার্থীকে শাঁখা পরে কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা!

চট্টগ্রাম সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ৪১তম বিসিএস পরীক্ষার প্রিলিমিনারিতে অংশ নিতে আসা এক নারী পরীক্ষার্থীকে হাতের শাঁখা খুলে কেন্দ্রে ঢুকতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। গত শুক্রবার ওই ঘটনা ঘটলেও গতকাল সোমবার বিষয়টি ফেইসবুকের মাধ্যমে জানাজানি হওয়ার পর এ নিয়ে ক্ষোভ জানান নগরীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

এদিকে নারী পরীক্ষার্থীকে হয়রানির ওই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি গত রবিবার প্রতিবেদন জমা দিলেও দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তি পাননি অভিযুক্ত ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর মোহাম্মদ ইলিয়াছ। এর প্রতিবাদ জানিয়ে ফেইসবুকে লেখালেখি করছেন অনেকেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নিতে নগরীর নাসিরাবাদের ‘চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট’ পরীক্ষা কেন্দ্রে যান মৌপিয়া রায় নামে এক নারী। কিন্তু হাতে শাঁখা থাকার কারণে কেন্দ্রে প্রবেশে বাধার শিকার হন তিনি। সনাতন ধর্মাবলম্বী বিবাহিত নারীর হাতে শাঁখা ও কপালে সিঁদুর থাকাটা ধর্মীয় রীতি বলে সবাই জানলেও ইনস্টিটিউটের ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর ইলিয়াছ মৌপিয়াকে শাঁখা নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশের নিয়ম নেই বলে বাধা দেন। পরীক্ষা শেষে মৌপিয়া তার পরিবারকে বিষয়টি জানান। এরপর তার ভাসুর (স্বামীর বড় ভাই) সুবীর দাশ এ বিষয়ে পলিটেকনিকের অধ্যক্ষের কাছে মৌখিক অভিযোগ করেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাজী মুহম্মদ মহসীন কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুবীর দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী মৌপিয়া বিসিএস দিতে গিয়ে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। আমি সেদিন ফোনে পলিটেকনিকের প্রিন্সিপাল স্বপন নাথকে বিষয়টি জানাই। মৌপিয়াকে হলে প্রবেশের আগে তল্লাশি করা হচ্ছিল, তখন তাকে শাঁখা খুলে রাখার জন্য বলে ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর ইলিয়াছ। মৌপিয়া তখন জানায়, সনাতন ধর্মাবলম্বী হিসেবে বিবাহিত কোনো নারী স্বামী বেঁচে থাকা অবধি শাঁখা খুলতে পারে না, তখন গেইটে ক্ষেপে গিয়ে বকাবকি করতে থাকে ইলিয়াছ।’

সুবীর দাশ আরও বলেন, ‘নির্দেশনা ছিল মেটালিক কিছু নিয়ে প্রবেশ করা যাবে না। শাঁখা তো মেটালিক না। সনাতন ধর্মাবলম্বী বিবাহিত নারীদের শাঁখা থাকবেই। এটাই তো ধর্মীয় বিধান। তা ছাড়া পরীক্ষায় ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর দায়িত্ব দেওয়ারও নিয়ম নেই। আমি নিজে মহসীন কলেজে দায়িত্বে ছিলাম। আমরা পরীক্ষার্থীদের সসম্মানে পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ করিয়েছি। পরীক্ষার হলে ছাত্রীদের অনুরোধ জানিয়ে বলেছি, কোনোভাবেই যাতে কান ঢাকা না থাকে, এর কারণও ব্যাখ্যা করেছি যে যাতে কেউ কোনো ধরনের ডিভাইস কানে রাখতে না পারে, এই জন্য কান না ঢাকার জন্য নির্দেশনাটা।’

মৌপিয়ার পরীক্ষা কেন্দ্রে অভিযোগ জানানোর সুযোগ ছিল উল্লেখ করে অধ্যাপক সুবীর বলেন, ‘সে সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে সেখানে পৌঁছে। তাকে শাঁখা নিয়ে তখন প্রবেশ করতে দিচ্ছিল না মোহাম্মদ ইলিয়াছ। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে মৌপিয়াকে জানিয়ে দেওয়া হয় শাঁখা পরে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। একপর্যায়ে কান্নাকাটি করে হাত থেকে মৌপিয়া নিজে শাঁখা খুলতেই একটি শাঁখা ভেঙে যায়। মৌপিয়া তখন বলে ওঠে শাঁখা একটি ভেঙে গেছে, আরও একটি খুলাবেন? আপনারা এ রকম করছেন কেন? এরপর পরীক্ষার সময় হয়ে যাওয়ায় মৌপিয়া পরীক্ষা কেন্দ্রে চলে যায়। পরে পরীক্ষা দিয়ে এসে আমাদের জানালে আমি প্রিন্সিপালকে বিষয়টি জানাই।’

চট্টগ্রাম সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ওই ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জানিয়ে ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ স্বপন নাথ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আমরা জেনেছি। আমরা আসলে লজ্জিত। তবে ওই নারীর পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত কেউ অভিযোগ করেনি। আমরা তাদের কাছ থেকে জেনে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। গত রবিবার তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। আমরা অভিযুক্ত ইলিয়াছকে যে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়েছিলাম, তাকে সেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছি। তিনি ক্ষমা চেয়ে বলেছেন, এটি তিনি বুঝতে পারেননি। এমনকি আমরাও পরীক্ষার্থীর পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়েছি।’

অধ্যক্ষ আরও বলেন, ‘কোনো নিয়মেই তো শাঁখা খুলে রাখার নির্দেশনা নেই। শাঁখা তো স্বর্ণালংকার না। ইলিয়াছের বুঝা উচিত ছিল যে এটি তো ধর্মীয় বিধান। আমরা ওই দায়িত্ব থেকে তাকে অব্যাহতি দিয়েছি। যেহেতু তিনি এসব বুঝেন না, তাই তার দায়িত্বে থাকারও প্রয়োজন নেই।’

নারী পরীক্ষার্থীকে হাতের শাঁখা খুলে কেন্দ্রে ঢুকতে বাধ্য করার ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর এ নিয়ে ফেইসবুকে ক্ষোভ জানাচ্ছেন নগরীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিষয়টি নিয়ে সৃজিতা মিতু নামে একজন লিখেছেন ‘আজ শুনলাম বিসিএস পরীক্ষার্থীর হাতের শাঁখা খুলতে বাধ্য করেছে কেন্দ্রের শিক্ষক। এ কেমন অসভ্যতা!  এখন কোনো হিন্দু শিক্ষক যদি হিজাব খুলতে বাধ্য করত, দেশে তুলকালাম কান্ড ঘটে যেত।’

ফারহান ফারজিয়া নামে আরেকজন লিখেন ‘এইরকম নিচু মানসিকতার যারা, তাদের পরীক্ষায় গার্ড ফেলে কেন, অবশ্য ভালোবা আছে কয়জন।’