মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের আত্মার আত্মীয়। তিনি ভালো করে জানতেন কলকারখানার খেটে খাওয়া শ্রমিক ও মাঠে ঘাম ঝরানো কৃষকই তার সংগ্রামের সহযোদ্ধা। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আদমজী জুটমিলে বাঙালি-বিহারি ও হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে পরিকল্পিত দাঙ্গা বাধিয়ে অসংখ্য শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত করে নারায়ণগঞ্জের মাটি। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন বঙ্গবন্ধু ও আটক নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে সারা দেশে ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘটের সময় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গিতে পুলিশের গুলিতে তেজগাঁও শিল্প এলাকায় মনুমিয়াসহ ১১ জন শ্রমিক নিহত হন।

১৯৬৬ সালের ৬ দফা, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন ও ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে শিল্প শ্রমিকদের অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। ’৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলনে শ্রমিকরা অংশগ্রহণ না করলে ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান সফল হতো না। বাঙালির আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু হতে পারতেন না। ’৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারত না বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী জাতির বিরল সম্মানে ভূষিত হতে পারত না বাঙালি জাতি। পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে থাকতে হতো আজীবন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আগে আগে করোনা মহামারীর কারণে দেশের শ্রমশক্তির প্রায় ২ কোটি ৫০ হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। ২৫টি সরকারি পাটকল বন্ধের কারণে কাজ হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে ৩০ হাজার শ্রমিক। দেশে ৪ লাখ একর জমিতে আখ চাষ হয়। আখ চাষের সঙ্গে ৫ লাখ কৃষক সরাসরি জড়িত। এই খাতে ২ লাখ কৃষি শ্রমিকের ৬ মাসের কর্মসংস্থান হয়। ২৫টি পাটকল ও ৬টি চিনিকল বন্ধ করে শ্রমিকদের চরম দুর্দশায় নিপতিত করা হয়েছে। তারা অনাহারে, অর্ধাহারে এমনকি বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করছেন। তাই আজ প্রশ্ন উঠেছে এজন্য কি আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম? অস্ত্র হাতে নিয়ে যুদ্ধ করেছিলাম? কিছু লোক মুনাফার স্বর্গে বাস করবে আর শ্রমিকরা না খেয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে! অথচ স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ছিল ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমিয়ে দেশের সব মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা নিশ্চিত করা। তাই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ২০ ডিসেম্বর বলেছিলেন ‘মেহনতি মানুষের জন্য ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা করতে না পারলে স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়বে।’

বলা হচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত পাট ও চিনিকলগুলো আধুনিকায়ন করে লাভজনক করতে সরকারের ব্যয় হবে এক হাজার কোটি টাকা। এতে কর্মসংস্থান হবে দেড় লাখ লোকের। কিন্তু সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত  মিলকারখানার আধুনিকায়ন করছে না। মনে রাখা দরকার রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ধ্বংস হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনষ্ট হবে। প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতার কারণে পাটকল-চিনিকল বন্ধ হওয়ার জন্য শ্রমিকরা দায়ী নন। এজন্য দায়ী সরকারের আমলাতন্ত্র ও ভুল নীতিনির্ধারণ। কী কারণে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন ও বাাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধিত হয়নি তা উদঘাটনের জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। মুজিববর্ষে শ্রমিকদের নির্যাতন করলে জাতির জনকের আত্মা শান্তি পাবে না। বঙ্গবন্ধু বলতেন, আমার মৃত্যুর পরও যদি রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে আমার আত্মা শান্তি পাবে। গরির কৃষকের কষ্টে, শ্রমিকের কষ্টে বঙ্গবন্ধু চোখের জল ফেলতেন। তিনি কখনোই কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের স্বার্থ পরিপন্থী কোনো কাজের সমর্থক ছিলেন না। 

সম্প্রতি পাট-সুতা ও বস্ত্রকল শ্রমিক-কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদ এবং বাংলাদেশ আখচাষি ও চিনিকল রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কৃষক-শ্রমিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ থেকে ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। দাবিগুলো হলো

এক. চিনিকলগুলোর যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি অত্যন্ত পুরাতন এবং শ্রমঘন হওয়ায় উৎপাদনের গতি মন্থর ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। চিনি উৎপাদনকারী অন্যান্য দেশ আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই সংকটের উত্তরণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। ব্যয় সাশ্রয়ী নিবিড় ও উন্নত প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে দেশের পাট ও চিনিকলগুলোকে আধুনিকায়ন করতে  হবে।

দুই. সংকট মোকাবিলায় সফল চিনিশিল্প পরিচালনাকারী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের বাস্তবতার নিরিখে এই শিল্পকে বহুমুখীকরণ করতে হবে। নিজ দেশেই এর উদাহরণ রয়েছে। কেবলমাত্র স্পিরিট ও পানীয় উৎপাদনের কারণে দর্শনার কেরু অ্যান্ড কোম্পানি সুগার মিলটি লাভজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

তিন. দেশে বর্তমানে বার্ষিক চিনির চাহিদা ১৬ লাখ টনের বিপরীতে আখ থেকে চিনি উৎপাদিত হয় মাত্র ৮০ থেকে ৯০ হাজার মেট্রিক টন। অথচ বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার এই চিনি বিক্রি না করে চিনিকলে মজুদ করে রাখে। বাজার নিয়ন্ত্রণের নামে চিনিকলের উৎপাদিত চিনি মজুদ করে রাখা যাবে না। মজুদ রাখার প্রয়োজন হলে যথাসময়ে চিনিকলগুলোকে মজুদ চিনির দাম পরিশোধ করতে হবে।

চার. ডাম্পিং নীতির কার্যকারিতা বন্ধের জন্য আমদানিকৃত বেসরকারি চিনি ও দেশীয় চিনিকলে উৎপাদিত চিনির দামে সমতা আনতে হবে। সমতা আনতে প্রয়োজনে আমদানিকৃত চিনির ওপর নির্ধারিত পরিমাণ শুল্ক ধার্য করতে হবে।

পাঁচ. চিনি আমদানি, দেশীয় চিনি মজুদ-বিক্রিসহ সব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রনীতির সফল প্রয়োগের জন্য কৃষি, শিল্প, অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। এই সেলের সুপারিশের ভিত্তিতে সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

ছয়. ভোক্তা অধিকারের প্রশ্ন তুলে কমমূল্যে চিনি বিক্রির অবাধ অধিকার দিয়ে চিনিশিল্পকে ধ্বংস করা যাবে না। চিনিশিল্প থেকে প্রাপ্ত ভ্যাট-ট্যাক্স শুল্ক রাষ্ট্রীয় খাতে ব্যয় না করে নির্দিষ্ট ফান্ডে জমা করতে হবে, যা দ্বারা চিনিশিল্প রক্ষা ফান্ড গঠিত হবে। যেখান থেকে চিনিকল ও আখচাষিরা বিনাসুদে ঋণ পাবে।

সাত. অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। নিয়োগ বাণিজ্যসহ অব্যবস্থাপনা ও ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

আট. বাজার মূল্যের সঙ্গে সংগতি রেখে আখের দাম নির্ধারণসহ পরিবেশ উপযোগী টেকসই ও উচ্চ ফলনশীল আখ বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করে আখচাষি ও চিনিকলকে রক্ষা করতে হবে।

নয়. আখচাষিরা চিনিকলের প্রধান কাঁচামাল সরবরাহ করেন। কিন্তু তারা কোনো সুবিধা পান না।  আখ সরবরাহ করে জাতিকে চিনি খাওয়ান আখচাষিরা। তাই আখ চাষে উৎসাহ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আখচাষিদের উৎপাদনের সব উপকরণে ভর্তুকি প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি অন্যান্য ফসল চাষিদের মতো আখচাষিদেরও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সব সুযোগের আওতায় আনতে হবে।

সমাবেশে প্রবীণ শ্রমিক নেতা পাট-সুতা ও বস্ত্রকল শ্রমিক-কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক সহিদুল্লাহ চৌধুরীর কথা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প খাত মুক্তিযুদ্ধের অর্জন ও চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত খাত বিলুপ্ত করা বঙ্গবন্ধুর নীতির পরিপন্থী। আমলা ও লুটেরারা এটা বুঝবে না। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে তা বুঝতে হবে। উপলব্ধি করতে হবে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ দিয়ে। পাট ও চিনিশিল্পের মতো কৃষিভিত্তিক শিল্প বিরাষ্ট্রীকরণ দেশের জন্য হবে আত্মঘাতী। কিন্তু আজ সেইসব শিল্প ধ্বংস করে কয়েক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানে আঘাত হানা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, জাতীয়করণকৃত পাট ও চিনিকলের জায়গা-জমি সম্পদ অনেকের লোলুপ দৃষ্টিতে পড়েছে। এসব রাষ্ট্রীয় সম্পদ গ্রাস করার জন্য লুটপাটকারী শ্রেণি মুখিয়ে আছে। পিপিআর বা লিজের নামে এই সম্পদ লুফে নিতে তারা নানা চক্রান্ত করছে।

স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুর নীতি ছিল লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে নয়, জাতি ও জনগণের কল্যাণ ও সেবা দিতে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প খাতগুলো পরিচালিত হবে। বর্তমান সরকারও তার নির্বাচনী অঙ্গীকার ঘোষণা করেছিল বন্ধকৃত রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ও কলকারখানা চালু করাসহ চালু শিল্প, কল-কারখানাগুলো যুগোপযোগী ও উন্নত প্রযুক্তির সংযোজন দ্বারা লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে শ্রমিক-কর্মচারীসহ দেশের আপামর জণসাধারণের জীবন-জীবিকার মান বৃদ্ধি করার। সেই অঙ্গীকার সরকারকেই পূরণ করতে হবে।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লি.

netairoy18@yahoo.com