হুজুরের লম্বা হাত

‘হুজুরের হাত অনেক লম্বা’, জজিয়তির জীবনভর এ কথাই শুনে এসেছি। অধস্তন আদালতে বিচারককে আইনজীবীরা সচরাচর ‘হুজুর’ বলেই সম্বোধন করেন, এটি চলে আসছে বহুকাল থেকেই। ইংরেজিতে সাধারণত ‘স্যার’, কালেভদ্রে ‘ইয়োর অনার’ চলে। অন্তর্বর্তী আদেশ, বিশেষত জামিনের আদেশ নিতে দরখাস্তকারীর আইনজীবীর সব কথার শেষ কথা থাকত এটাই। (এখনকার খবর জানা নেই, ওসব শোনাশুনির মধ্যে আমি আর নেই।) এসব আদেশ দিতে নাকি বিচারকের ‘ডিসক্রিশন’ আছে! ‘হুজুর’ ইচ্ছে করলেই মঞ্জুর করতে পারেন! এমন স্তুতিবাদে মজে বেশি লম্বা হাত দেখিয়ে হুজুরদের নিজেদেরই লম্বা হওয়ার নজির ঘটে। ভাগ্যবানরা পুণ্যবান! তারা পান পদ, বাকিরা বিপদ। পিছলে পড়েন পদোন্নতি থেকে, ক্ষমতা খাটো হয়, কখনো-বা জজিয়তিই খুইয়ে হন একেবারে ঠুঁটো। শোকজ, তলব তো আছেই। অভাগাদের তাই বুঝতে হয় ‘ডিসক্রিশন’ মানে হুজুরের খেয়ালখুশির লম্বা হাত নয়, বিচারবুদ্ধি দিয়ে বিচারকের সুবিবেচনা।

সাড়ে বারো বছর দেওয়ানি ঠেলে পদোন্নতি পেয়ে সাব-জজ হওয়ার পর ফৌজদারি পাই সহকারী দায়রা জজ হিসেবে। পিছলে পড়িনি, উন্নত পদ ফাঁকা না হলে পদোন্নতির নিয়ম নেই বিচার বিভাগে। ফাঁকা হওয়ার পর পদোন্নতির অপেক্ষায় পদ ফাঁকা থাকাটাই চলে। সেকালে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি না থাকায় এখনকার মতো জজিয়তির শুরুতেই ফৌজদারি পাওয়া যেত না। আমাদের জজিয়তির শুরুটা হয়েছিল সহকারী জজ হিসেবে। আমাদের আগে পর্যন্ত সবার শুরু হতো মুনসেফ হিসেবে। ১৯৮৫ সালের বিসিএস পরীক্ষায় দরখাস্ত চাওয়া হয়েছিল মুনসেফ পদে, করেও ছিলাম তাই। কয়েক স্তরের পরীক্ষা পার হয়ে ১৯৮৮ সালে চাকরিতে ঢোকার আগেই ১৯৮৭ সালে পদের নাম বদলে হয়ে গেল সহকারী জজ। পদোন্নতি পেয়ে সাব-জজ (যুগ্ম জেলা জজ নামকরণ হয়েছে ২০০১ সালে) হলাম ঠিকই কিন্তু, ফৌজদারি শুরুর বেলায় হয়ে গেলাম সহকারী দায়রা জজ (যুগ্ম দায়রা জজ নামকরণ হয়েছে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর)।

এক দিন এক আসামির মেয়ের বিয়ের দাওয়াত কার্ড পেলাম এজলাসে। নিমন্ত্রণ নয়, জামিন চাইছে। মেয়ের বিয়ের আসন্ন অনুষ্ঠানে বাবা হিসেবে তার থাকা দরকার, সেই ‘গ্রাউন্ডে’। আইনজীবীর নিবেদন, সেই ‘হুজুরের হাত লম্বা’, ইচ্ছে করলেই মঞ্জুর করতে পারেন। পিপি (‘পাবলিক প্রসিকিউটর’) সাহেবের নিরপেক্ষ বক্তব্য, ‘হুজুর যা ভালো মনে করেন’! নথি খুঁটিয়ে দেখলাম অপরাধের মাত্রা কত বড়, জড়িত বলে মনে করার ভিত কতটা শক্ত, কত দিন হাজতে আছে, কয়টা সাক্ষী হয়েছে, বাকি সাক্ষী শেষ করতে আর কত দিন লাগবে এসব। দেখলাম ছাড়া যায়, জামিন মঞ্জুর করলাম। দিন কয়েক পরে আরেক মামলার আসামির মেয়ের বিয়ের দাওয়াত কার্ড এসে হাজির। বুঝে গেছে ‘হুজুরের হাত লম্বা’! ভারি মুশকিল! আসামি হাজতে থাকলেই মেয়ের বিয়ে লাগে এখানে! শুনলাম। আগের মতো করেই নথি দেখলাম। নিমন্ত্রণপত্রটা বাদ গেলে আর জামিনে ছাড়ার গ্রাউন্ড মিলছে না এবারে। নামঞ্জুর করলাম। তারপরে যত দিন ছিলাম সেখানে মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র দিয়ে আর কেউ জামিন চায়নি। নথির বাইরে ঈদ গ্রাউন্ড, ভ্যাকেশন গ্রাউন্ড কোনো গ্রাউন্ডই বিবেচনা করতে পারিনি। দরখাস্তে লেখা নাম নথির সঙ্গে মেলাতে হয়েছে। দরখাস্তে লেখা নাম দেখেই জামিন মঞ্জুর বা নামঞ্জুর করতে পারিনি। ধরা খেয়ে পেশকার, পিপি সাহেবের ওপর দায় চাপাতেও পারিনি। পিপি সাহেবের আপত্তি আছে কি না লিখেছি, তার আপত্তি-অনাপত্তি আমার আদেশের ভিত্তি হয়নি। দায় আমার নিজের। নথির বাইরের এক গ্রাউন্ডে ‘লম্বা হাত’ দেখিয়ে একবার পড়েছিলাম বিপদে। রক্ষা পেয়েছি অল্পের জন্য। ২০০৭ সালে ম্যাজিস্ট্রেসি ‘সেপারেশন’-এর (আদিখ্যেতা করে অনেকে এটাকেই ‘সেপারেশন অব জুডিশিয়ারি’ বলেন) শুরুতে অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ছিলাম নভেম্বরের ১ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত। পুরো জেলার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসির শুরু মাত্র তিনজনে একজন চিফ, একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আর অতিরিক্ত আমি। কগনিজেন্স কেবল আমার আর চিফের। প্রতিদিন গাদা গাদা নথি আসে নির্বাহী বিভাগের ম্যাজিস্ট্রেসি থেকে। ছোট্ট এজলাসে আইনজীবী, তাদের সহকারী, মামলার পক্ষ-বিপক্ষ আর তাদের লোকজনের ঠাসাঠাসিতে দাঁড়ানোরও জায়গা হয় না আইনজীবীদেরই। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত কাজ করেও কূল পাওয়া যায় না।

এই হট্টগোলের মধ্যে এক দিন দুই আসামি আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন করবে বলে জামিন চায়। অপরাধ দণ্ডবিধির ১৮৬ ধারার (সরকারি কাজে বাধা দেওয়া)। ১৯৯১ সালের ঘটনা, ২০০৫ সালে বিচার শেষে মাসখানেকের কারাদণ্ড। দায়রায় আপিল করে আসামিরা ছিল জামিনে, শুনানিতে আইনজীবী হলেন গরহাজির। আপিল খারিজ হয়ে সাজা বহাল। বিচারে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড পেয়ে আপিলে যেতে চাইলে সেই বিচার-আদালত সিআরপিসির ৪২৬ (২-এ) ধারায় জামিন মঞ্জুর করতে পারে। আপিল থেকে সাজা নিয়ে ঘুরে এসে রিভিশনে যেতে চাইলে বিচার-আদালত জামিন মঞ্জুর করতে পারবে কি না বলা নেই স্পষ্ট করে। উকিল সাহেব আইনের হাত না দেখিয়ে শুধুই দেখান ‘হুজুরের হাত লম্বা’। গাদাগাদির হট্টগোলে আগপাছ ভাবার অবকাশ নেই। দেখলাম ১৯৯১ সাল থেকে এই এক মামলা নিয়ে ভুগছে। জেলে পুরে দিলে রিভিশন শেষ করে আসার আগেই তাদের সাজা খাটা শেষ হয়ে যাবে। ১৫ দিনের জামিন মঞ্জুর করলাম।

রিভিশনে হাইকোর্ট থেকে আসামিরা পেল জামিন; আর আমি পেলাম শোকজ, তাদের জামিন দিলাম কোন ধারায়? তাদের ১৫ দিন শেষ হওয়ার আগেই জামিন আদেশটা পেয়েছিলাম ম্যাজিস্ট্রেসিতে থাকতেই। শোকজ আদেশটা পেলাম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে পদোন্নতির বদলিতে ১৫ দিনের ম্যাজিস্ট্রেসি ছেড়ে অন্যখানে গিয়ে। মাস না পুরোতেই পদোন্নতির সুখ যায়! ম্যাজিস্ট্রেট-আদালতে তখনকার ওইসব চিত্র তুলে ধরে নিজের মতিভ্রমের জন্য করুণাধারায় (আইনের ধারা না পেয়েও অধস্তন আদালতে কৃপা পেতে এ ধারাই দেখানো হয় কি না!) মাফ চেয়ে জবাব পাঠিয়েছিলাম দায়রা জজ ও রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে। সেকালে এটাই ছিল অধস্তন আদালতের বিচারকের কাছে জবাব চাওয়ার এবং উচ্চ আদালতে দেওয়ার নিয়ম। এতেই ব্যাপারটা মিটেছে। আমারও আক্কেল হয়েছে। সেকাল গেছে। একালে স্পষ্ট রুলিং এসে গেছে, আপিলে কারাদণ্ড হলে (কম-বেশির প্রশ্ন নেই) বিচার-আদালতে জামিনে আর ‘হুজুরের হাত’ নেই মোটে।

শেষ আর একবার ‘লম্বা হাত’ দেখাতে হয়েছিল। ডিসেম্বর মাস (১৯৮৯ সালের আগে পর্যন্ত ছিল অক্টোবর) অধস্তন আদালতের ছুটি, ‘সিভিল কোর্ট ভ্যাকেশন’। এ সময় জরুরি বিষয় (আসলে জামিন) শুনানির জন্য একজন জেলা ও দায়রা জজ কিংবা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজকে কয়েকটি জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘ভ্যাকেশন জজ’ (অবকাশকালীন জজ) হিসেবে। জেলা ও দায়রা জজ হওয়ার পরে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ভ্যাকেশন ডিউটি করি একটি বিভাগের চারটি জেলায়। একটি জেলায় ডিউটির প্রথম দফার শেষ দিনে খুনের মামলার এক আসামির জামিনের দরখাস্ত এলো। তার বাবা মারা গেছে আগের রাত্রে, হিন্দু পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে পিতার শেষকৃত্যাদিতে তার থাকা দরকার, সেই গ্রাউন্ডে। একটু আগেই জামিন-আবেদন পত্রপাঠ নামঞ্জুর করেছেন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব। আদেশের নকল নেওয়ার সময় নেই, এফিডেভিটযুক্ত দরখাস্ত নিয়ে উকিল সাহেব ছুটে এসেছেন ভ্যাকেশন হুজুরের লম্বা হাতের আশায়। জরুরি তলব দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের নথি আনালাম। খুনের ঘটনা মাত্র কয়েক দিন আগের, গ্রেপ্তারও হয়েছে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। তদন্তের সবে শুরু। নথির বিচারে জামিনের গ্রাউন্ড নেই। আসামির বাড়ি সেই শহরেই, তার পিতার আকস্মিক মৃত্যুর সত্যতা অন্য আইনজীবীরাও নিশ্চিত করলেন। পিপি সাহেবও জামিনে আপত্তি নেই জানালেন। ‘লম্বা হাতে’ দুদিনের জামিন মঞ্জুর করি আইনজীবীর জিম্মায়। দুদিন পরে হাজির না হলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের নথি ফেরত দিয়ে আমার মিস কেসের দিন রাখলাম পরের দফার প্রথম দিনে। এবার গিয়ে নথিতে ম্যাজিস্ট্রেটের রিপোর্ট পেলাম আসামি ঠিক সময়ে হাজির হয়ে আবার হাজতে গেছে।

আর কখনো আমার কাছে কেউ পিতার আকস্মিক মৃত্যুর গ্রাউন্ডে জামিন চায়নি। তবে, ‘হুজুরের হাত অনেক লম্বা’ শুনতে হয়েছে নানা গ্রাউন্ডে। শেষটায় এক দিন আমার গাউনের আজানু লম্বা হাতা এজলাস-টেবিলে বিছিয়ে দিয়ে বলি দেখুন, ‘হুজুরের লম্বা হাতের’ আদত হাল! যতই লম্বা করেছে ততই সরু করতে করতে আগায় ফিতা বানিয়ে দিয়েছে, সুতা হতেই শুধু বাকি! এমন হাতে চাইলেই কি সব করা যায়! করতে হয় সেটাই যেটা করা যায়।

লেখক প্রবন্ধকার ও আইন গ্রন্থকার; অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

moyeedislam@yahoo.com