ঢাবিতে প্রগতিশীল ছাত্র জোটের কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের হামলা

মুজিব শতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমনের প্রতিবাদ জানিয়ে তার কুশপুত্তলিকা দাহ করার সময় প্রগতিশীল ছাত্র জোটের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হামলায় দেশ রূপান্তরের ফটোসাংবাদিক রুবেল রশিদ ও মানবজমিনের ফটোসাংবাদিক জীবন আহমেদসহ ছাত্র জোটের ১৫ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, নরেন্দ্র মোদির আগমনের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে গতকাল বিকেলে প্রগতিশীল ছাত্র জোটের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি ছিল। তবে সকাল থেকে রাজু ভাস্কর্য এলাকায় অবস্থান নেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ছাত্র জোটের ৩০ থেকে ৪০ নেতাকর্মী টিএসসি চত্বর থেকে মিছিল নিয়ে শহীদ মিনার হয়ে আবার টিএসসি ফিরে এসে ডাসের সামনে নরেন্দ্র মোদির কুশপুত্তলিকা দাহ করতে থাকেন। তারা ভারতবিরোধী বিভিন্ন সেøাগানও দিতে থাকেন। এ সময় ছাত্রলীগের কয়েক কর্মী কুশপুত্তলিকার আগুন নেভানোর জন্য দূর থেকে পানি ছুড়তে থাকেন। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের কর্মীরা ছাত্র জোটের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। জোটের নেতাকর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে দু’পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ছাত্রলীগের কর্মীরা বাঁশ, লাঠি ও হেলমেট নিয়ে হামলা চালান। এছাড়াও রাস্তার পাশের ডাবের দোকান থেকে ডাব ছিনিয়ে নিয়ে ছাত্রলীগের কর্মীরা জোটের নেতাকর্মীদের দিকে নিক্ষেপ করতে থাকেন। এতে দেশ রূপান্তরের ফটোসাংবাদিকসহ জোটের অন্তত ১৫ জন আহত হন। পরে আহতদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

হামলায় আহতদের মধ্যে রয়েছেনছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাসুদ রানা, কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাশেদ শাহরিয়ার, ঢাবি শাখার সহ-সভাপতি সাদিকুর রহমান সাদিক, ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক তমা বর্মন, ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সুমাইয়া সেতু, কেন্দ্রীয় নেতা আসমানী আশা, ঢাবি শাখার নেতা মেঘমল্লার বসু ও বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর ঢাবি শাখার সভাপতি জাবির আহমেদ জুবেল।

হামলায় আহত সাংবাদিক জীবন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ক্যামেরাকে লক্ষ্য করে হেলমেট দিয়ে আঘাত করা হয়। ক্যামেরা রক্ষা করতে গিয়ে বা হাতে মারাত্মক আঘাত পেয়েছি।’

হামলার পর সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি আল কাদেরী জয় সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের ওপর ছাত্রলীগ নির্মম হামলা চালিয়েছে। আমরা মনে করি এ ধরনের হামলার বিচার হওয়া দরকার। হামলায় আমাদের অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৭ থেকে ৮ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।’

ছাত্রলীগের হামলার বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংগঠনটির সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ের মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে রাজু ভাস্কর্যে হামলা-পরবর্তী এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘নামসর্বস্ব কিছু ছাত্র সংগঠন, যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ২০ থেকে ৩০ জন নিয়ে এসে আন্দোলন করে। যাদের প্রত্যেকের বয়স ৩০ থেকে ৪০-এর ওপর। এরা পাকিস্তানের কাছ থেকে টাকা এনে পাকিস্তানের রাজত্ব কায়েম করবেন, ষড়যন্ত্র করবেন, তা হতে দেওয়া হবে না। আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ উদযাপন করছি, যখন বাংলাদেশকে বিশ্ব নতুনভাবে চিনছে, তখন তাদের চুলকানি শুরু হয়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজকে যখন আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় উপস্থিত হবেন। তার আগ মুহূর্তে তারা বিভিন্ন ধরনের চক্রান্ত শুরু করেছেন। চক্রান্ত করার কোনো সুযোগ আমরা তাদের দেব না।’

এদিকে গতকাল প্রগতিশীল ছাত্র জোটের কর্মসূচিতে হামলার আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা নরেন্দ্র মোদির কুশপুত্তলিকা বানিয়ে তা দাহের আগেই ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী এসে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা জানায়, বেলা সাড়ে ১১টার সময় টিএসসির সঞ্জীব চত্বরে ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা কর্মসূচি পালনের জন্য নরেন্দ্র মোদির কুশপুত্তলিকা বানিয়ে দাহের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় ছাত্রলীগের ২৫ থেকে ৩০ নেতাকর্মী এসে কুশপুত্তলিকা ছিনিয়ে নিয়ে মোটরসাইকেলে দ্রুত সেখান থেকে চলে যান। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে টিএসসি থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা। মিছিলটি শুরুর আগে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. রইছ উদ্দিন তাদের ক্যাম্পাসের মধ্যে থেকেই কর্মসূচি শেষ করার অনুরোধ জানান।

ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশে আগমনের প্রতিবাদে কুশপুত্তলিকা দাহের আগেই সেটা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। আমরা এর নিন্দা জানাই।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদি কোনো ব্যক্তি নন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী। বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য এ ধরনের কর্মসূচি পালন করলে ছাত্রলীগ তাদের বাধা দেবে, এটাই স্বাভাবিক।’