কর্মক্ষেত্রে নারী নির্যাতন রোধ জরুরি

স্বাধীনতার পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অনেক অর্জন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি শিল্পায়ন, গৃহায়ন, নগরায়ণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, দারিদ্র্য বিমোচন, বিদ্যুতায়ন, গ্রামীণ অবকাঠামো প্রভৃতি ক্ষেত্রে যেমন বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে তেমনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য তথা শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু, গড় আয়ু, ইপিআই, নারীর স্বাস্থ্য ও নারী শিক্ষাসহ নারীর ক্ষমতায়নে অগ্রগতির কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। এর মধ্যে সার্বিক বিচারে বিগত পাঁচ দশকে দেশে নারীর অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে নারীর উত্তরোত্তর সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে ঘরে-বাইরে নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের মহামারীতে। চলমান করোনা মহামারীর কালেও নারীর প্রতি এই সহিংসতা তো কমেইনি বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। এর মধ্যে বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছেবাংলাদেশে কর্মক্ষত্রে ৩৬ শতাংশ নারীকর্মী যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়। যার উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই ঘটে থাকে তৈরি পোশাক খাতে। ওই গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে নারীরা ব্যাপকহারে যৌন নিপীড়নের শিকার। যার ৮৬ শতাংশ ঘটে থাকে কারখানাগুলোর পুরুষ সুপারভাইজারের মাধ্যমে। যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার ৬৭ শতাংশ নারী কারখানার সহিংসতা দমন কমিটির কোনো সাহায্য পায় না। অথবা বেশিরভাগ কারখানায় এই কমিটিও নেই। লক্ষ করবার মতো বিষয় হলো, পোশাক খাতে নিয়োজিত নারীদের ৬৪ শতাংশ এই কমিটি সম্পর্কে জানে না। আর নির্যাতনের শিকার নারীদের বেশিরভাগই ভয়ে কারও কাছে মুখ খোলে না। মঙ্গলবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি আয়োজিত এক সংলাপে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের এই গবেষণা প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হয়। কর্মক্ষেত্রে নারীদের ওপর সহিংসতার মাত্রা ব্যাপক হলেও এ বিষয়ে আইনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে কর্মক্ষেত্রে নারীর ওপর যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতা নির্মূল বিষয়ক আইএলও কনভেনশন-১৯০ জাতীয় সংসদে অনুসমর্থনে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন শ্রম খাত সংশ্লিষ্টরা।

দেশের অন্ততপক্ষে ২ কোটি নারী সরাসরি কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতসমূহে শ্রম দিচ্ছেন। দেশের রপ্তানি আয়ের বৃহত্তম উৎস তৈরি পোশাক খাতে কাজ করছেন ৩৫ লাখের বেশি নারী। এর পাশাপাশি সারা দেশের সব নারীই প্রাত্যহিক গার্হস্থ্য শ্রমে নিয়োজিত। কিন্তু গার্হস্থ্য শ্রমের যেমন অর্থমূল্য নিরূপণ হয় না, তেমনি তা জাতীয় উৎপাদনের কোনো সূচকেও অন্তর্ভুক্ত নয়। এ কারণেই আজকাল বলা হচ্ছে সব নারীই কর্মজীবী নারী। সম্প্রতি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য শামসুন্নাহার ভুঁইয়া জানিয়েছেন, দেশের শ্রম খাতে ১ কোটি ২০ লাখ নারী সরাসরি নিয়োজিত। এর বাইরেও নারীরা নানা পেশায় নিয়োজিত থেকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে নারীরা আজও কর্মক্ষেত্রে সমমর্যাদা পাচ্ছে না। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ শ্রমজীবী হলেও জাতীয় সংসদে এই জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব খুবই কম। বলা যায়, সংসদে শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের পক্ষে দাবি তোলা সংসদ সদস্য একেবারেই সীমিত। সন্দেহ নেই যে, জাতীয় সংসদে শ্রমজীবীদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এই সদস্যের মন্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। কিন্তু এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে শ্রম খাতের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সবার আগে নজরদারি ও তদারকির মধ্যে আনা প্রয়োজন।

নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধে কঠোরতম শাস্তির বিধান রেখে ২০০০ সালে প্রণীত হয়েছিল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন। এ আইনে দ্রুত সুবিচারের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু গত ২০ বছরে নারীর প্রতি সহিংসতা তো কমেইনি, বরং বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদন বলছে, নানারকম নির্যাতনের ভয়াবহতা দিন দিন প্রকটতর হচ্ছে। খেয়াল করা দরকার, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে ২০০৯ সালে একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছিল উচ্চ আদালত। এক দশক আগে দেওয়া ওই রায়ে যৌন নিপীড়নের সংজ্ঞাসহ তা রোধে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছিল আদালত। কিন্তু বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মস্থলে এই রায়ের আলোকে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়নি। অথচ ওই রায়ে বলা হয়েছিল, জাতীয় সংসদে যৌন হয়রানি রোধে আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উচ্চ আদালত নির্দেশিত এই নীতিমালাই বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর থাকবে। এমতাবস্থায় উচ্চ আদালতের নির্দেশনা আমলে নিয়ে দেশের তৈরি পোশাক খাতসহ সব কল-কারখানা ও কর্মস্থলে  ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করে সেগুলোকে সক্রিয় করতে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।