দুদিনের সফরে আজ আসছেন নরেন্দ্র মোদি

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দুই দিনের সফরে আজ শুক্রবার ঢাকায় আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সদলবলে মুজিব কোট পরে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া মোদি ও তার সফরসঙ্গীদের নিরাপত্তায় ইতিমধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই সফর কেবলমাত্র ‘অনুষ্ঠানে’ অংশ নেওয়ার জন্য হলেও থাকতে পারে বেশ কিছু চমক। সফরকালে তিনি সাতক্ষীরা ও গোপালগঞ্জে দুটি মন্দির পরিদর্শন ও  বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। শ্রদ্ধা জানাবেন জাতীয় স্মৃতিসৌধে। এ সময় স্বাক্ষরিত হবে ছয়টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও একটি যৌথ বিবৃতি ঘোষণা হতে পারে।

গত বছরের মার্চে মোদির বাংলাদেশ সফরের কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে তা পিছিয়ে যায়। এর আগে ২০১৫ সালের ৬ জুন দুই দিনের সফরে ঢাকায় এসেছিলেন নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই সফরে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মমতার বিরোধিতায় তা আটকে যায়। এবারও তিস্তা নিয়ে কিছু থাকছে না বলে গণমাধ্যমকে ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। তিনি বলেন, ‘তিস্তা নিয়ে আমাকে সারাক্ষণ প্রশ্ন করা হয়। এ বিষয়ে আমি বলেছি, তিস্তা চুক্তির খসড়ার প্রতিটি পাতায় পাতায় সই হয়েছিল। আর যে খসড়ায় সই হয়, সেটা বাস্তবায়নে বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। কী কারণে চুক্তিটি হয়নি, কারণটা আপনারাও জানেন। আমরাও জানি। আমরা তিস্তা নিয়ে ভারতকে প্রেশারে রেখেছি। আপনারাও রেখেছেন।’

মোদির গত সফরে বেশ কয়েকটি যৌথ প্রকল্প ও সীমান্ত হাটের উদ্বোধন করা হয়। তবে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল ছিটমহল বিনিময় দলিল হস্তান্তর। এর মাধ্যমে দুই দেশের লক্ষাধিক মানুষের কয়েক দশকের কষ্টের লাঘব হয়। ছিটমহল বিনিময় চুক্তি অনুযায়ী, ভারতের মধ্যকার অংশের জনগণ ভারতের ও বাংলাদেশের মধ্যকার অংশের জনগণ বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করে। মোদির গত সফরে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেও এবারের সফরসূচিতে তা থাকছে না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে অভ্যর্থনা জানাবেন। বিমানবন্দরে তাকে লাল গালিচা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। সেখান থেকে সরাসরি সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য যাবেন। বিকেলে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি। সেখানে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) বঙ্গবন্ধু-বাপু ডিজিটাল প্রদর্শনী পরিদর্শন করবেন। দুটি অনুষ্ঠানেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত থাকবেন। পরের দিন সকালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। এরপর সেখানকার একটি মন্দির পরিদর্শন করবেন। সেখান থেকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ^রীপুর গ্রামে অবস্থিত যশোরেশ^রী কালীমন্দির পরিদর্শন করবেন তিনি। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ^াস অনুযায়ী সেখানে শক্তির দেবী সতীর দেহাবশেষ পড়েছিল বলে মনে করা হয়।

২৭ মার্চ বিকেলে গণভবনে শেখ হাসিনা-মোদির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নসহ সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বৈঠকের পর দুই প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে পৃথক দুটি স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করা হবে। বৈঠকের পর ঢাকা-দিল্লির মধ্যে একটি যৌথ ঘোষণা বিবৃতির মাধ্যমে প্রকাশ করা হতে পারে। দুই প্রধানমন্ত্রী ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ি রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন সার্ভিস উদ্বোধন করবেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে বিধানসভা নির্বাচন চলছে। নির্বাচনি আচরণবিধির কারণে কেবল বাংলাদেশ অংশে ট্রেন চালিয়ে এর উদ্বোধন করা হবে।

মোদির সফরে কমপক্ষে ৫টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রে মৎস্য আহরণ সহযোগিতা, পরিবেশগত সুরক্ষা সহযোগিতা, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ও কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের মধ্যে সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক সহযোগিতা। উদ্বোধন করা হবে বাংলাদেশ-ভারত স্বাধীনতা সড়কের। মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকার এই সড়ক দিয়ে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় শপথগ্রহণের জন্য আসে। সড়কটি মেহেরপুরের মুজিবনগর হয়ে কলকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত। মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছেন, তাদের স্মরণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে একটি সমাধিসৌধ স্থাপন করা হয়েছে। মোদির এই সফরে এটিরও উদ্বোধন করা হবে। করোনা মহামারীর কারণে সবগুলো উদ্বোধনই ভার্চুয়ালি হবে বলে নিশ্চিত করেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ৫০ বছর পালন উপলক্ষে ১৮ দেশে যৌথভাবে কর্মসূচি উদযাপন করবে বাংলাদেশ ও ভারত। এই ১৮ দেশের নাম ঘোষণা করা হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর ভারতের বাজারে বর্তমান সুবিধাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। নতুন করে তখন চুক্তি করতে হবে দুই দেশকে। ইতিমধ্যে নতুন চুক্তির ধরন নিয়ে ‘কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট’ (সেপা) প্রস্তাব করেছে ভারত। এ বিষয়ে একটি ঘোষণা আসতে পারে মোদির এই সফরে। বাংলাদেশের ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট ও ভারতের একটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে সেপা নিয়ে গবেষণা করবে বলে জানা গেছে।