‘তুমি আসবে ব’লে হে স্বাধীনতা/সাকিনা বিবির কপাল ভাঙল,/সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর।/তুমি আসবে ব’লে হে স্বাধীনতা’ কত শত সাকিনা, হরিদাসীর কপাল ভাঙল তার কোনো ইয়ত্তা নেই। অবশেষে স্বাধীনতা মিলল ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে। ব্রিটিশরাজ কায়েম হয়েছিল প্রায় সোয়া দুইশো বছর আগে। তারপর ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসন-শোষণ-জুলুম-নির্যাতন।
সশস্ত্রযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা স্বশাসিত হওয়ার ক্ষমতা পেয়েছিলাম। বাংলাদেশ ভূখণ্ড শাসনের ক্ষমতা। জন্ম হয়েছিল এমন এক রাষ্ট্রের, যে রাষ্ট্র সম্পর্কে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবে সেই ভূখণ্ডজাত মানুষ। সুদীর্ঘ সংগ্রাম ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের লড়াকু মানুষ এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছিল, আমাদের দেশ আমরাই শাসন করতে চাই। এরই নাম স্বাধীনতা।
১৯৭১ থেকে ২০২১। আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। পঞ্চাশ বছর আগে আমরা পাকিস্তানি শাসন-শোষণ-জুলুম-নির্যাতনের নাগপাশ ছিন্ন করে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। এ স্বাধীনতা নিছক ঘরে বসে পাওয়া যায়নি। পেতে হয়েছে দীর্ঘ লড়াই করে। হারাতে হয়েছে বাংলা মায়ের অনেক বীর সন্তানকে। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় লেগে রয়েছে লাখো মানুষের ত্যাগ, সংগ্রাম ও আত্মদানের উজ্জ্বল চিহ্ন। স্বাধীনতার এই সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে কয়েকটি প্রশ্ন মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে, স্বাধীনতার প্রকৃত মানে আসলে কী? স্বশাসিত হওয়ার ক্ষমতাই কী ‘স্বাধীনতা’? আমরা কি সেদিন দেশ সম্পর্কিত বোধ, স্বাধীনতার ধারণা, ন্যায়-নৈতিকতা বিষয়ে উত্থাপিত প্রশ্নগুলো নির্দিষ্ট গ্রহণযোগ্য উপসংহারে পৌঁছাতে পেরেছিলাম? সদ্যস্বাধীন দেশের প্রতিটি কোনায় গর্ব, আবেগ এবং দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে যখন পতাকা উড়ছিল তখন শরণার্থীশিবির থেকে কোটি কোটি মানুষ নিঃসম্বল অবস্থায়, চোখের জলে ভাসতে ভাসতে যখন স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন, তাদের সেই ভেঙে যাওয়া স্বপ্নগুলোর পুনর্নির্মাণে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল কী?
স্বাধীন হওয়ার পর পঞ্চাশ বছরে আমরা কী অর্জন করলাম? আমরা কতটুকু এগোলাম? দেশের সব মানুষ দুবেলা দুমুঠো খেতে পাচ্ছে? সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে? পাকিস্তানিরা এ দেশ থেকে চলে গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু বঞ্চনা কি বন্ধ হয়েছে? দেশের দুর্বলতর শ্রেণির অধিকারকে প্রতিষ্ঠা কী সম্ভব হয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের সবারই জানা। আর এটাই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের হতাশাব্যঞ্জক দিক। এ কথা ঠিক যে, আর্থিক ও উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে আমরা অনেক দিক থেকেই এগিয়েছি। কিন্তু আরও যেসব ক্ষেত্রে যেভাবে অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল, আমরা সেখানে সেভাবে অগ্রগতি অর্জন করতে পারিনি। যদিও অগ্রগতির কোনো অন্ত হয় না। অগ্রগতি বহাল রাখতে চাইলেই বহাল রাখা যায়। বহাল রাখাটা জরুরিও। দেশের অগ্রগতি বা নাগরিকের অগ্রগতি বলতে সাধারণভাবে যা বোঝানো হয়, শুধু সেই বস্তুগত অগ্রগতি হলেই কিন্তু চলে না। মূল্যবোধ, চিন্তাধারারও অগ্রগতি জরুরি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। সেটা করতে আমরা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছি।
আসলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা এসেছে ঠিকই, এখনো সামাজিক স্বাধীনতা আসেনি। আমাদের সংবিধান বাকস্বাধীনতা দিয়েছে, কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও আমাদের দেশে সেই বাকস্বাধীনতা অনেকটাই ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের ইচ্ছাধীনে পরিণত হয়েছে। এ দেশের সংখ্যালঘুদের এখনো নির্যাতিত হতে হচ্ছে এবং প্রতিনিয়তই দেশপ্রেমের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। স্বাধীনতার অর্থ দেশকে একটি সুদৃঢ় ভিতের ওপরে দাঁড় করানো; দেশের মানুষের ন্যূনতম প্রয়োজন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বস্ত্র ও বসবাস যোগ্য স্থানের চাহিদা পূরণে সক্ষম করে তোলা। মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা করা, বিজ্ঞান ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে দেশকে স্বনির্ভর করে তোলা।
স্বাধীনতার অর্থ এটা নয় যে মানুষের দ্বারা তৈরি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সিঁড়ি বানিয়ে ক্ষমতা দখল আর সিংহাসনে বসে তার অপব্যবহার করা। স্বাধীনতা মানে দায়িত্বশীল হওয়া, কর্তব্যপরায়ণ হওয়া। নিয়মনীতি মেনে চলা। অন্যের কল্যাণে পরিচালিত হওয়া। স্বাধীনতার অর্থবহ হতে পারে দেশের জনগণের ন্যূনতম প্রকৃত শিক্ষাদানের অঙ্গীকারে ব্রত হওয়া। শিক্ষাই পারে সব পরাধীনতা থেকে মুক্ত করতে অন্ধকারে আলো জ্বালাতে। দেশের মানুষের মধ্যে প্রকৃত শিক্ষার আলো জ্বালাতে না পারলে সব স্বাধীনতাই অর্থহীন হয়ে যায়। আমাদের মধ্যে স্বাধীনতার বোধও খুব একটা স্পষ্ট নয়। স্বাধীনতা কোনো মাটির পুতুল, কাঠের চেয়ার বা দলের পতাকা নয়। একে হাত দিয়ে ধরা যায় না। ঘরে এনে সাজিয়ে রাখা যায় না। একে কাঁধে তুলে মিছিল করা যায় না। স্বাধীনতা আসলে একটা মানসিকতা। জীবনযাপনের একটা বহিঃপ্রকাশ। কারও কাছে সেটা রাজনৈতিক হতে পারে, কারও কাছে সামাজিক আবার কারও কাছে সেটা হতেই পারে একান্ত ব্যক্তিগত একটা ব্যাপার।
পঞ্চাশ বছর আগে আমরা পাকিস্তানি দুঃশাসন থেকে মুক্ত হয়েছিলাম। আজ কিন্তু অন্য অনেক কিছু থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রয়োজন অনুভূত হয়। সমাজ জীবনের সব ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চার অভাব, অসহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মের নামে হিংসা, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ এ রকম একের পর এক সামাজিক বিষ আজ আমাদের গিলে খেতে চাইছে। পাকিস্তানি শাসনকালের মতোই, দেশে অন্যায়-অবিচার ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তৈরি হচ্ছে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। ‘স্বাধীনতা’ শব্দের অবমাননা করা হচ্ছে। বর্তমানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিসর অদ্ভুতভাবে পালটে যাচ্ছে! যারা শক্তিশালী, ক্ষমতাবান তারাই ঠিক করে দিচ্ছে মানুষের আচার-আচরণ কী হবে! তাদের মতের সঙ্গে না মিললেই তারা বের করে ফেলছে দাঁত-নখ। মানুষকে ভয় দেখিয়ে তার কণ্ঠ রুদ্ধ করে দেওয়াটা যেন ক্রমশ একটা প্রচলিত ধারা হয়ে উঠছে!
আমাদের দেশ আধুনিক যন্ত্রপ্রযুক্তির ব্যবহারে এগিয়ে যাচ্ছে। ইন্টারনেট ব্যবহার করে শিক্ষা, তথ্য আদান-প্রদান, ব্যবসা-বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন বাড়ছে। লাখ লাখ মানুষ লেখাপড়া, জীবিকা, চিকিৎসা কিংবা বেড়ানোর উদ্দেশ্যে বাইরের দেশে যাচ্ছে। উন্নত সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। কিন্তু তার পাশাপাশি ধর্মবিশ্বাস, গুজব, গণপিটুনি, আইন লঙ্ঘনের প্রবণতাও সমান তালে বাড়ছে। ‘ডার্ক সাইড অব দ্য মুন’-এর মতো আমরা ক্রমশ ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রতি হিংস্র হয়ে উঠছি। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের যদি নিজের মতো থাকার অধিকার খর্ব হয়, তাহলে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে দেশের ভবিষ্যতের জন্য চিন্তা হবেই। কারণ আমরা একসময় চলে গেলেও আমাদের সন্তান-সন্ততিরা এ দেশেই থেকে যাবে। তাদের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত ও স্বাধীন করার কথাও আমাদেরই ভেবে যেতে হবে।
স্বাধীনতা শুধু স্বশাসন নয়, নয় পতাকা কিংবা ইট-কাঠ-পাথর, স্বাধীনতা একটা জীবন দর্শন, একটা বাঁচার ভঙ্গিমা! সেটার সার্বিক পুনরুজ্জীবন একান্ত দরকার। যে বিরুদ্ধ মত পোষণ করছে সে-ও যে দেশের ভালো চায়, নানা কাজের ত্রুটিবিচ্যুতি ধরে দিয়ে তা শোধরাতে চায়, সেটা বোঝার মতো মনের প্রসারতা থাকা দরকার! অন্যের মতকে গুরুত্ব দেওয়া, তাকে ‘না’ বলতে দেওয়ার মতো পরিসর তৈরি করাই তো আসলে স্বাধীনতা! সেটা না হলে, যতই মহাকাশে স্যাটেলাইট যাক আমরা কিন্তু সেই মধ্য যুগের অন্ধকারের দিকেই পিছিয়ে যাব।
বর্তমান প্রজন্ম পাকিস্তানি দুঃশাসন বা পাক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লড়াই দেখেনি। শুধু শুনেছে বা পড়েছে। তাতে মহান স্বাধীনতা দিবস বর্তমান প্রজন্মের কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে, এমন নয়। কিন্তু দিনটা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক থাকতে পারে, যদি প্রত্যেক নাগরিককে এই দিনে নতুন কোনো অসমাপ্ত লড়াইয়ের দিশা দেখানো যায়।
লেখক : লেখক ও কলামনিস্ট
chiros234@gmail.com