হাটহাজারীতে গুলিতে নিহত ৪, বায়তুল মোকাররম এলাকা রণক্ষেত্র

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গতকাল শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশসহ কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে গুলিতে চারজন নিহত হয়েছে। ঢাকার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম এলাকায় ‘মুসল্লি’ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনার প্রতিবাদে হাটহাজারী মাদ্রাসার ছাত্ররা জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হন। তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চারজন মারা যান।

ঢাকার বায়তুল মোকাররম এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরজুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছে কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা। এ সময় এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামের পটিয়ায় হেফাজতের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে থানায় হামলা চালায়।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতেও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় স্থানীয় কয়েকটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। এ সময় গুলিবিদ্ধ ৬ জনসহ ৮ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে আনা হয়। পরে গতকাল রাতে যাত্রাবাড়ী জামেয়া মাদানিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ অন্তত ৫০ জনকে আটক করেছে বলা জানা গেছে। 

এদিকে হাটহাজারীতে সংগঠনের নেতাকর্মী হতাহতের প্রতিবাদে আজ শনিবার সারা দেশে বিক্ষোভ এবং আগামীকাল রবিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী এসব কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

হাটহাজারীর সংঘর্ষে চারজন নিহত ছাড়াও পুলিশ ও সাংবাদিকসহ কমপক্ষে ২৬ জন আহত হয়। গতকাল জুমার নামাজের পর হাটহাজারী বড় মাদ্রাসা থেকে হেফাজতের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে থানায় হামলা চালালে এ সংঘর্ষ শুরু হয় বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তারা জানান, হেফাজতকর্মীরা হাটহাজারী মডেল থানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। এ সময় পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এ সময় সাংবাদিক ও দুই পুলিশ সদস্যসহ আরও অনেকে আহত হন। প্রথমে আহতদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাদের মধ্যে গুরুতর আঘাত পাওয়া ১২ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসক চারজনকে মৃত ঘোষণা করেন। তারা হলেনকুমিল্লার রবিউল ইসলাম (২৬), মাদারীপুরের হাফেজ মিরাজুল ইসলাম (৩২), ময়মনসিংহের জামিল এবং হাটহাজারীর বাসিন্দা মো. আব্দুল্লাহ। চারজন নিহতের খবরে হেফাজতের নেতাকর্মীরা আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে হাটহাজারী-খাগড়াছড়ি ও হাটহাজারী-রাঙ্গামাটি মহাসড়ক অবরোধ করে।

সংঘর্ষের বিষয়ে জানতে চাইলে হেফাজতের কেন্দ্রীয় সহকারী সাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইদ্রিস বলেন, ‘বায়তুল মোকারম এলাকায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অতর্কিত পুলিশি হামলার প্রতিবাদে হাটহাজারী বড় মাদ্রাসা থেকে মিছিল বের হয়। মিছিলটি থানার কাছাকাছি যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ অতর্কিত হামলা চালায়। এসময় গুলিবিদ্ধ চারজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।’

চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই আলাউদ্দিন তালুকদার জানান, গুলিবিদ্ধ চারজন মারা গেছেন। এছাড়া বাকি আহতদের অর্থোপেডিক সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এএসএম ইমতিয়াজ হোসাইন বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৬ জনকে আহত অবস্থায় আনা হলে চারজনকে চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। ২২ জনের আঘাত গুরুতর হওয়ায় তাদের চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়।’

হাটহাজারী সহকারী কমিশনার (ভূমি) শরীফ উল্যাহ বলেন, ‘বিক্ষোভকারীরা ভূমি অফিসের প্রধান ফটক ও অফিস ভাঙচুর করে। এ সময় অফিসের গুরুত্বপূর্ণ নথি ও গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। তাছাড়া ডাকবাংলোও ভাঙচুর করে তারা।’

সংঘর্ষের বিষয়ে বক্তব্য জানতে হাটহাজারী থানার ওসি মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) শাহাদাত হোসেনকে কল করেও তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মছিউদ্দৌল্লাহ রেজা বলেন, ‘হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে বিনা উসকানিতে হেফাজতকর্মীরা থানায় হামলা চালায়। ইটপাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি তারা থানা কম্পাউন্ডে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে।’

সংঘর্ষের সময় আহত সাংবাদিক খোরশেদ আলম শিমুল জানান, তিনি ভূমি অফিসে হামলার ছবি তুলতে গেলে বিক্ষোভকারীরা তার ওপর হামলা চালায়।

বাযতুল মোকাররম এলাকা রণক্ষেত্র : নরেন্দ্র মোদির সফরের প্রতিবাদে গতকাল জুমার নামাজের পর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে আসা ‘মুসল্লি’, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও পুলিশের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুই শতাধিক ব্যক্তিকে ঢামেক হাসপাতালে ও বেশ কিছু ব্যক্তিকে রাজধানীর অন্যান্য হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা ৭টি মোটরসাইকেলে আগুন দেয়। তারা মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ গেটে বাঁশ ও কাঠসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দেয়।

পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) সৈয়দ নূরুল ইসলাম বলেন,  ‘বায়তুল মোকাররম এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই কিছু সংগঠন বিক্ষোভ মিছিল বের করে। তারা এসব মিছিল থেকে কালো পতাকা, জুতা, ঝাড়– প্রদর্শনসহ নানা ধরনের ব্যঙ্গাত্মক আচরণ করে। শুক্রবারও জুমার নামাজের পর বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে মুসল্লিদের একটি অংশ জুতা প্রদর্শন করে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এ সময় মুসল্লিদের আরেকটি অংশ তাদের বাধা দেয়। এতে দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ওপরও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পুলিশ টিয়ার গ্যাস শেল, রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে ও লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মসজিদের ভেতর থেকে এক থেকে দুই ট্রাকের মতো ইটের ভাঙা টুকরা নিক্ষেপ করা হয়েছে। এত ইট কীভাবে মসজিদের ভেতরে গেল বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’

নরেন্দ্র মোদির সফরের প্রতিবাদে কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন বিক্ষোভ করতে পারেএ আশঙ্কায় গতকাল সকাল থেকেই প্রস্তুত ছিল পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন। তারা অ্যান্টি পার্সোনাল কার (এপিসি), রায়টকার, জলকামান, কাঁদানে গ্যাস শেলসহ প্রস্তুত ছিল। সকাল থেকে বায়তুল মোকাররম উত্তর ও দক্ষিণ গেট, পল্টন মোড়, মুক্তাঙ্গন, স্টেডিয়াম, দৈনিক বাংলা, মতিঝিল, কাকরাইল, ফকিরাপুলসহ আশপাশে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে রাখে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, জুমার নামাজের পরপরই ‘এক দল মুসল্লি’ জুতা হাতে ভারতবিরোধী স্লোগান দিতে শুরু করে। খানিক পরই লাঠিসোঁটা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের কিছু সমর্থক মসজিদের উত্তর পাশের ফটকে তাদের ওপর হামলা চালায়। প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে তারা মিছিলকারীদের মারধর করে। এতে বিক্ষোভকারীরা পিছু হটে মসজিদের ভেতরে ঢুকে যায়। খানিক পরই বিক্ষোভকারীরা আবার সংগঠিত হয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ওপর পাল্টা হামলা চালান। এ সময় প্রায় ১০ মিনিট ধরে দুপক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মসজিদের দিকে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এসময় বিক্ষোভকারীরা অন্তত চারটি মোটর সাইকেলে আগুন দেয়। এরই মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ গেটে। সেখানে বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পুলিশও পাল্টা রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জ করে। দুপুর পৌনে ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত থেমে থেমে সংঘর্ষ চলে। এসময় অনেকে ফেইসবুক লাইভে বিক্ষোভ ও হামলা পাল্টা হামলার দৃশ্য শেয়ার করে।

যাত্রবাড়ীতে গুলিবিদ্ধ ৬ : যাত্রাবাড়ীতে গতকাল সন্ধ্যায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে কয়েকটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। এতে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ আশপাশের এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রাত সাড়ে ৮টার দিকে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ এবং রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস শেল নিক্ষেপ করে। যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম কাজল জানান, নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরে আসার প্রতিবাদে সন্ধ্যায় যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী মাদ্রাসার সামনে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা রাস্তা অবরোধ করে। সেখানে আরও কয়েকটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এসে যোগ দেয়। ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের পরিদর্শক মো. বাচ্চু মিয়া জানান, যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় আহত ৮ জনকে হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ ছিলেন ৬ জন। সংঘর্ষের পর রাতে

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদ্রাসাছাত্রদের তা-ব : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তান্ডব চালিয়েছে কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রতিবাদে বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায় বিক্ষোভে হামলার প্রতিবাদে এ তা-ব চালায় তারা। গতকাল দুপুর আড়াইটায় শহরের প্রধান সড়ক টিএ রোডে জামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসা, ভাদুঘর জামিয়া সিরাজিয়া মাদ্রাসা ও পশ্চিম মেড্ডা দারুল আরকাম মাদ্রাসার কয়েকশ মাদ্রাসাছাত্র বিক্ষোভ শুরু করে। এ সময় তারা প্রধান সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে শহরের সমস্ত দোকানপাট বন্ধ হয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধরা সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে টায়ারে আগুন লাগিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। এসময় পুরো সড়কের বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি সংবলিত পোস্টার-ফেস্টুন ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর তারা পর্যায়ক্রমে বঙ্গবন্ধু স্কয়ারে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল, ছবি ভাঙচুর করে। পরে বিক্ষুব্ধরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে রেল স্টেশনে গিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেখানে স্বেচ্ছাসেবক লীগের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর চিত্র প্রদর্শনী তছনছ করে। রেল স্টেশনের সিগন্যাল, মাস্টার রুম, কন্ট্রোল রুমসহ অন্য কর্মকর্তাদের কক্ষ ভাঙচুর করে। রেল লাইনের সিøপার তুলে ফেলে তারা। বিক্ষোভকারীরা স্টেশনের সিগন্যাল বক্স ভেঙে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে ঢাকার সঙ্গে সিলেট ও চট্টগ্রামের ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকাগামী কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে প্রবেশ করার সময় বিক্ষুব্ধরা পাথর নিক্ষেপ করলে ট্রেনটি ফিরে যায়। এরপর বিকেল সোয়া ৫টায় জেলা পরিষদ কার্যালয়ে হামলা হয়। একই সময়ে কাউতলী এলাকায় সিভিল সার্জন অফিস, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়। শহরের কাউতলী, ভাদুঘরে দিগন্ত পরিবহনের কয়েকটি বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাও ভাঙচুর করা হয়। একই সময়ে মাদ্রাসাছাত্ররা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানায় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে থানা থাকায় পুলিশ সদস্যরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এসময় ছবি তুলতে গেলে ডেইলি স্টারের জেলা প্রতিনিধি মাসুক হৃদয়কে মারধর ও ক্যামেরা-মোবাইল ছিনিয়ে নেয় তারা। শহরের জেলা পরিষদ, পৌর মুক্তমঞ্চ, পৌর মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভেঙে ফেলে। এছাড়া বিক্ষুব্ধরা জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা জজের বাসভবনের মূলফটকে হামলা চালায়। তারা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে গ্যারেজে থাকা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা ভবনের নিচতলার জানালা। এছাড়া শহরের ভাদুঘর, কাউতলী, পীরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে মাদ্রাসাছাত্ররা পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিভিন্ন স্থানে টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে।

এদিকে মাদ্রাসাছাত্রদের তান্ডব চলাকালে আশিক (২৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। সে পৌর এলাকার দাতিয়ারা গ্রামের সাগর মিয়ার ছেলে। গতকাল বিকেলের দিকে গুরুতর আহত অবস্থায় জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে  কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। একই ঘটনায় শহরের ২নং ফাঁড়ির ইনচার্জ নূরে আলম, ভাদুঘর গ্রামের ইব্রাহিমসহ (২২) পুলিশ, মাদ্রাসাছাত্রসহ আরও ২০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক রানা নূরুস শামস বলেন, ‘তাকে আহত অবস্থায় আনার পরই কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করে। এরপরই মাদ্রাসার ছাত্ররা তাকে নিয়ে যায়। আমরা বুঝতেই পারিনি কীভাবে সে মারা গেছে। ময়নাতদন্ত হওয়ার পর বলতে পারব।’

পটিয়ায় থানায় হামলা হেফাজত কর্মীদের : চট্টগ্রামের পটিয়ায় গতকাল বিকেলে হেফাজতের নেতাকর্মীরা মিছিল থেকে পটিয়া থানায় হামলা চালায়। তারা পটিয়া থানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। তবে পুলিশ এ হামলার পাল্টা জবাব দেয়নি। এ ঘটনার পর বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ছাত্রসেনা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও তাৎক্ষণিক পাল্টা বিশাল মিছিল বের করেন। পাল্টাপাল্টি এই বিক্ষোভ মিছিলকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে প্রায় আধা ঘণ্টা গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আশপাশের দোকানগুলো বন্ধ হয়ে যায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।

৩০ জন ২ দিনের রিমান্ডে : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় ৫১ জনকে আসামি করে মামলা করেছে পুলিশ। তবে মামলায় ডাকসুর সাবেক ভিপি নূরকে আসামি করা হয়নি। পল্টন থানার এসআই মিন্টু কুমার বাদী হয়ে করা মামলায় ৩১ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩০ জনকে দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল শুক্রবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বেগম ইয়াসমিন আরার আদালত শুনানি শেষে রিমান্ডের এ আদেশ দেন।

আজ বিক্ষোভ, আগামীকাল হরতালের ডাক : বাংলাদেশে নরেন্দ্র মোদির আগমনের প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভে হামলায় নেতাকর্মী নিহত ও আহত হওয়ার প্রতিবাদে আজ শনিবার সারা দেশে বিক্ষোভ এবং আগামীকাল রবিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

এ সময় হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মামুনুল হকসহ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে আব্দুর রব ইউসুফী বলেন, ‘অবিলম্বে নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশ থেকে চলে যেতে হবে। নেতকার্মীদের ওপর হামলাকারী পুলিশ ও সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘হেফাজত নেতাকর্মীসহ সাধারণ মুসল্লিরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলেও সরকারি দলের সন্ত্রাসীরা হামলা ও বাধা দিচ্ছে।’