রাজশাহীর কাটাখালীতে যাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাসে বেপরোয়া গতির বাসের ধাক্কায় আগুন লেগে ১৭ জন নিহত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার দুপুরে কাটাখালীর কাপাশিয়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের সবাই মাইক্রোবাসের যাত্রী ছিলেন। তাদের মধ্যে ১১ জনের আগুনে পোড়া মরদেহ মাইক্রোবাসটির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়। আহত অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর বাকি ৬ জনের মৃত্যু হয়।
নিহত ১৭ জনের বাড়িই রংপুরের পীরগঞ্জ পৌর এলাকায়। তাদের মধ্যে দুই পরিবারের পাঁচজন করে আর একটি পরিবারের তিনজন রয়েছেন। তারা একসঙ্গে মাইক্রোবাসে চড়ে শাহ মখদুম (র.)-এর মাজার জিয়ারত করতে রাজশাহীতে আসছিলেন। কাটাখালীর ওই দুর্ঘটনায় চারজন আহত অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
এদিকে গতকাল দেশের পাঁচ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিশুসহ আরও নয়জন নিহত হয়েছে।
রাজশাহীর দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন পীরগঞ্জের দাড়িতপাড়ার আফছার আলীর ছেলে মোখলেছার রহমান (৪৫), তার স্ত্রী পারভীন (৩৫), ছেলে পাভেল (১৯), বড় মজিদপুর এলাকার প্রয়াত জোনাব আলীর ছেলে ফুলু মিয়া (৪০), তার স্ত্রী নাজমা বেগম (৩৫), মেয়ে সাবিয়া (৪), সুমাইয়া (৮) ও ছেলে ফয়সাল (১৩), চৈত্রকোল রাঙ্গামাটি এলাকার ইয়াসিন আলীর ছেলে সালাউদ্দিন (৩৫), তার স্ত্রী সামছুন্নাহার (২৫), ছেলে সাজিদ (৮) ও মেয়ে সাফা (২), বড় রাজারামপুর এলাকার প্রয়াত শাজাহান আলীর স্ত্রী কামরুন্নাহার, প্রজাপাড়ার প্রয়াত সামছুল বাদশার ছেলে তাজুল ইসলাম ভুট্টু (৪৫), তার স্ত্রী মুক্তা বেগম, ছেলে ইয়াসিন (১৪) এবং দুরা মিঠিপুর এলাকার মজিবর রহমানের ছেলে শহিদুল ইসলাম।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল দুপুর পৌনে ২টার দিকে রাজশাহী থেকে হানিফ পরিবহনের একটি বাস ঢাকার দিকে যাচ্ছিল। একই সময় একটি মাইক্রোবাস রাজশাহীর দিকে আসছিল। এ সময় কাটাখালীর কাপাশিয়া এলাকায় ওই দুটি গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের পর হানিফ পরিবহনের বাসটি রাস্তার পাশের একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে থেমে যায়। অন্যদিকে মাইক্রোবাসটির সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে রাস্তার ওপরেই সেটিতে আগুন ধরে যায়। খবর পেয়ে দমকল বিভাগের কর্মীরা ছুটে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, বাস-মাইক্রোবাসের সংঘর্ষের আগমুহূর্তে একটি বাঁশভর্তি ব্যাটারিচালিত রিকশাভ্যান ও এক কিশোর সাইকেল চালিয়ে রাজশাহী শহর অভিমুখে আসছিল। একই দিক থেকে দ্রুতগতিতে দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাসটিও আসছিল। আর বিপরীত দিক থেকে হানিফ পরিবহনের বাসটি যাচ্ছিল ঢাকার দিকে। মাইক্রোবাসটি বাঁশবাহী ভ্যান ওভারটেক করার মুহূর্তে বাসটি ঢুকে পড়ে এবং মাইক্রোবাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার গোলাম রুহুল কুদ্দুস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার খবর শুনে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাও দুর্ঘটনাকবলিত এলাকায় গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ততক্ষণে মাইক্রোবাসের ভেতরে থাকা ১১ যাত্রীর সবাই পুড়ে মারা যায়।’
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, দুর্ঘটনাস্থল থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় ১০ জনকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে নেওয়ার পর ছয় যাত্রী মারা যায়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন চারজন। তাদের তিনজন বাসের ও একজন মাইক্রোবাসের যাত্রী বলে জানা গেছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের রাজশাহী সদর স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আবদুর রউফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুপুরে রংপুর থেকে একটি হায়েস মাইক্রোবাস রাজশাহী আসছিল। পথে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কের কাটাখালী থানার সামনে বিপরীত দিক থেকে আসা হানিফ পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ সময় মাইক্রোবাসটির গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যায়। দমকল বিভাগের কর্মীরা গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।’
এদিকে দুর্ঘটনার পর রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাসটি সরানো হলে প্রায় ২ ঘণ্টা পর এই সড়কে আবারও যান চলাচল শুরু হয়।
দুটি গাড়িই চলছিল বেপরোয়া গতিতে : কাটাখালীর দুর্ঘটনায় আহত চারজন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তারা হলেন সাজেদুর, আবুল হোসেন, তার স্ত্রী হিরা ও অজ্ঞাতপরিচয় একজন। আবুল হোসেনের ছেলে রাকিবুল হাসান তুষার জানান, তিনি তার বাবা-মায়ের সঙ্গে হানিফ পরিবহনের বাসে চড়ে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। তারা তিনজনই বাসের সামনের আসনে ছিলেন। বাবা-মা আহত হলেও তার তেমন কিছু হয়নি।
তুষার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুর্ঘটনা আমি সরাসরি দেখেছি। হানিফ বাসটি টার্মিনাল থেকে ছাড়ার পর থেকেই বেপরোয়া গতিতে চলছিল। দুপুরে রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা ছিল। কাটাখালীতে বিপরীত দিক থেকে আসা মাইক্রোবাসটিও খুবই দ্রুতগতিতে আসছিল। মুখোমুখি হওয়ার সময়ও দুটি গাড়ির কোনোটিরই গতি তেমন কমেনি। মুহূর্তের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ বেধে যায়। এ দৃশ্য দেখে আমি মুহূর্তের জন্য মনে হয় জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। চোখ খুলে দেখি আমাদের বাস রাস্তার ধারে। আর মাইক্রোবাসটি রাস্তার ওপরেই আগুনে জ্বলছে।’
সড়কে দুই শিশুসহ নিহত আরও ৯ : গতকাল দেশের পাঁচ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিশুসহ আরও নয়জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে এক শিশুসহ চারজন নিহত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাত ৭টার দিকে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের কালুগোট্টা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন চন্দ্রঘোনা কদমতলী গ্রামের আবদুল করিমের ছেলে মো. আকবর হোসেন (২৫), চন্দ্রঘোনা হিন্দুপাড়া গ্রামের জনি সোমের সাত মাস বয়সী ছেলে আদৃশ সোম আয়ান, ডেইজি দত্ত (৩৫) ও আবুল কালাম (৬৮)। রাঙ্গুনিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মাহাবুব মিলকি এ তথ্য জানিয়েছেন।
নরসিংদীর পলাশে ট্রাকচাপায় মোস্তফা কামাল (৩৮) নামে এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ভাগপাড়া প্রাণ গেট এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত মোস্তফা কামাল পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপসহকারী মেডিকেল অফিসার হিসেবে কমর্রত ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল সদর উপজেলার আনাহুলায়। ঘোড়াশাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
সাতক্ষীরার দেবহাটায় বাসের ধাক্কায় সৌমিত রায় ওরফে ভোলা (৬৫) নামে অবসরপ্রাপ্ত এক স্কুলশিক্ষক নিহত হয়েছেন। গতকাল সকাল ৯টার দিকে সাতক্ষীরা-শ্যামনগর সড়কের গাজীরহাটে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত সৌমিত রায় দেবহাটার রামনাথপুর গ্রামের প্রয়াত শিবপদের ছেলে। তিনি সখীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। দেবহাটা থানার ওসি বিপ্লব কুমার সাহা এসব তথ্য জানান।
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে ট্রাক্টরচাপায় মো. রাব্বি (১১) নামে এক মাদ্রাসাছাত্র নিহত হয়েছে। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে চরকলমি গ্রামের বড়পোল এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। রাব্বি ওই গ্রামের বেলাল হোসেনের ছেলে। সে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার ছাত্র। কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মীর জাহিদুল হক রনি জানান, এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বাসচাপায় দুজন নিহত হয়েছেন। গতকাল সকালে উপজেলার ফাঁসিতলা বাজার এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন বগুড়ার সোনাতলা আচারেরপাড়া গ্রামের আবদুল বাকির ছেলে মোহন মিয়া (৩০) ও শিবগঞ্জ উপজেলার বুড়িগঞ্জ গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে ফিরোজ কবির (২৬)। গোবিন্দগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি খায়রুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে।