হরতালে বাধা দিলে কঠোর কর্মসূচির হুমকি হেফাজতের

বিভিন্ন ইসলামী দলের মোদিবিরোধী বিক্ষোভে পুলিশ ও সরকার সমর্থকদের বাধার ফলে সৃষ্ট ত্রিমুখী সংঘর্ষে নেতাকর্মী আহত ও নিহত হওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে হেফাজতে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। গতকাল শনিবার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটের সামনে পৃথকভাবে এ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে তারা। বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে আজ রবিবার পূর্ব ঘোষিত হরতাল কর্মসূচি কঠোরভাবে পালনেরও ঘোষণা দিয়েছে সংগঠন দুটি। হরতালে বাধা দিলে লাগাতার কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। এ ছাড়া ৬ দফা দাবি জানিয়ে হরতালের সমর্থনে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশ, র‌্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে রয়েছে।

গতকাল দুপুর ১২টা ১০ মিনিটের দিকে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটের ভেতরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ঢাকা মহানগরের ব্যানারে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন নেতাকর্মীরা। সেখানে হেফাজতের প্রায় এক হাজার নেতাকর্মী জড়ো হন। বিক্ষোভ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবাদী সেøাগান দিতে থাকেন হেফাজতের কর্মীরা। আজ রবিবারের হরতাল কর্মসূচিতে সরকার সমর্থক ‘হেলমেট বাহিনী’কে হুঁশিয়ারি দেন নেতারা। শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারা।

বিক্ষোভ কর্মসূচি শেষে রাজধানীর খিলগাঁওয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হরতাল কর্মসূচি পালনে যদি কোনোভাবে বাধা দেওয়া হয়, সরকার দলের লোকজন ও হেলমেট বাহিনীকে হরতালে দেখা যায়, তবে আগামীতে লাগাতার কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, আগামীকাল (আজ) সরকারি দলের কোনো কর্মসূচি নেই। কাজেই আমাদের হরতালের দিন সরকারি দলের কাউকে রাজপথে দেখতে চাই না। কোনো হেলমেট বাহিনীকেও দেখতে চাই না।

মামুনুল বলেন, স্পষ্ট করে বলতে চাই আমাদের আন্দোলন সরকারের বিরুদ্ধে নয়। এই আন্দোলন নাস্তিক-মুরতাদের বিরুদ্ধে। অথচ সরকার এই আন্দোলনকে প্রভাবিত করে আমাদেরকে তাদের প্রতিপক্ষ বানিয়েছে। এর প্রতিবাদের ভাষা আমাদের জানা নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে মামুনুল হক বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালন করতে চাই। আমাদেরকে সহযোগিতা করুন। কোনো সন্ত্রাসী, হেলমেট বাহিনীকে প্রশ্রয় দেবেন না। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে।

শুক্রবার চট্টগ্রামের হেফাজতের নেতাকর্মীদের আগে পুলিশের ওপর হামলা করেছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মামুনুল হক বলেন, এটা মিথ্যা প্রচারণা। তারপরও আমরা অধিকতর তদন্ত করে দেখব।

এদিকে বেলা আড়াইটায় বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে আরেকটি বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। বিক্ষোভে হাজারখানেক নেতাকর্মী অংশ নেন। বিক্ষোভ থেকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির সৈয়দ মো. মুফতি ফয়জুল করিম ৬ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হচ্ছে চট্টগ্রামের হাটহাজারী এবং বি-বাড়িয়ায় যেসব পুলিশ মিছিলে গুলি চালিয়ে হত্যাকা- ঘটিয়েছে তাদেরকে বরখাস্ত করে বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, হাটহাজারী থানার ওসিকে দ্রুত চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে, প্রত্যেক শহীদ পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে, মোদিবিরোধী আন্দোলনে যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের দ্রুত মুক্তি দিতে হবে এবং হয়রানিমূলক সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরকারদলীয় যেসব গুন্ডাবাহিনী সাধারণ মুসল্লিদের ওপর আক্রমণ করেছে, অপমান-অপদস্ত করেছে তাদেরকে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে, সারা দেশে সব মানুষের সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং এবং প্রতিবাদ প্রকাশের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।

সমাবেশ থেকে হেফাজতে ইসলামের ডাকা রবিবারের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচিকে সমর্থন জানানো হয়েছে। এ ছাড়া আগামী ১ এপ্রিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়।     

সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল করেন নেতাকর্মীরা। মিছিলে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করা হয়। ‘রক্তেলাল মাতৃভূমি, সরকার তুই ভারতপ্রেমী, ‘গর্জে ওঠো সবায় রুখে দাও’, পুলিশি রাষ্ট্র নিপাত যাক, জনগণ মুক্তিপাক’। 

সরেজমিনে বায়তুল মোকাররম এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে পল্টন মোড়ে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। এছাড়া বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটের পাশেও রয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি বায়তুল মোকাররমের পাশে পল্টন মোড়ে রায়টকার, জলকামান ও প্রিজন ভ্যান রাখা হয়।

গত শুক্রবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর ঘিরে প্রতিবাদে নেমে পুলিশ ও সরকার সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন ইসলামি দলগুলোর নেতাকর্মীরা। জুমার নামাজের পর বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায় সংঘর্ষ শুরু হয়। এ ঘটনায় অর্ধশতাধিক আহত হন। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়।

ওইদিন বিকেল থেকে যাত্রাবাড়ী এলাকার একটি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে রাতে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়। পরে রাত ৯টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) সৈয়দ নূরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজকে (শনিবার) পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সকাল থেকে দুটি সমমনা ইসলামী দল বায়তুল মোকাররমে সমাবেশ করেছে। একটা ১২টা থেকে ১টা পযন্ত অর্থাৎ জোহরের নামাজের আগ পর্যন্ত তারা মসজিদের উত্তর গেটে কিছুসংখ্যক জমায়েত হয়ে সমাবেশ করেছে। চরমোনাই পীর সাহাবের দল ইসলামী আন্দোলন ২টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে জমায়েত হয়ে বিক্ষোভ করেছে। তারা তাদের দাবিদাওয়া তুলে ধরেছে।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলার অবনতি যেনো না ঘটে সে বিষয়ে আমরা সজাগ ছিলাম এবং আইনশৃঙ্খলার কোনো অবনতি ঘটেনি।

রবিবারে হরতালে পুলিশের প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করার জন্য রাষ্ট্র। আমরা রাষ্ট্রের মাঠপর্যায়ের কর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে আমাদের লক্ষ্য থাকবে জনগণের জানমাল যেনো সুরক্ষিত থাকে, তার যেনো কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হয় সেক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক থাকব।