মিয়ানমারে গুলি করে ৯১ বিক্ষোভকারীকে হত্যা

সশস্ত্র বাহিনী দিবস উদযাপনের মধ্যে গতকাল শনিবার মিয়ানমারজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ৯১ জনের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। গত ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে শুরু হওয়া টানা বিক্ষোভে গতকালই সবচেয়ে বেশি রক্ত ঝরেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এদিকে গতকাল দেশটির সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে রাজধানী নেপিদোতে সেনাবাহিনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং দেশটির জনগণকে সুরক্ষা এবং পুনরায় নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।

এছাড়া গণতন্ত্রপন্থি বিক্ষোভকারীদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যার প্রতিশোধ নিতে মিয়ানমারের আদিবাসী বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গ্রুপগুলো ফুঁসে উঠছে। ‘দ্য কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন’ নামের একটি সশস্ত্র গ্রুপ থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছে সেনাপোস্টে হামলা চালিয়ে একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেলসহ ১০ সেনা সদস্যকে হত্যার দাবি করেছে। তবে এ বিষয়ে রয়টার্স থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করেনি।

গত শুক্রবার মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বিক্ষোভকারীদের হুমকি দিয়ে বলা হয়, বিক্ষোভ বন্ধ না করলে তারা ‘মাথায় ও পিঠে গুলিবিদ্ধ’ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন। আগের ভয়ংকর মৃত্যুগুলোর দুঃখগাথা থেকে জনগণকে শিক্ষা নেওয়ার কথাও বলা হয়। কিন্তু গতকাল ইয়াঙ্গুন, মান্দালয়সহ বিভিন্ন শহরে ‘মাথায়, পিঠে গুলিবিদ্ধ’ হওয়ার হুমকি উপেক্ষা করে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমে এলে নিরাপত্তা বাহিনী চড়াও হয়। গুলি, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছুড়লে ব্যাপক প্রাণহানি হয়।

এর মধ্যে ইয়াঙ্গুনে দালা শহরতলির একটি থানার বাইরে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে অন্তত চারজন নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যম মিয়ানমার নাও খবর দিয়েছে। বাণিজ্যিক এ রাজধানীর উত্তর দিকের জেলা ইনসেইনে একটি বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তিনজন নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে স্থানীয় একটি অনূর্ধ্ব-২১ ফুটবল দলের এক খেলোয়াড়ও রয়েছেন বলে জানিয়েছেন এক প্রত্যক্ষদর্শী।

স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো মিয়ানমারের পূর্বাঞ্চলীয় শহর লাসিওতে তিনজন এবং ইয়াঙ্গুনের কাছে বাগো অঞ্চলে চারজন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে। ইয়াঙ্গুনে সব মিলিয়ে অন্তত ২৪ বিক্ষোভকারীকে হত্যা করা হয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হোপিন শহরেও নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে এক বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে।

মান্দালয়ে বিভিন্ন ঘটনায় ২৯ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে মিয়ানমার নাও। নিহতদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী একটি শিশুও রয়েছে। রক্ত ঝরেছে মান্দালয়ের কাছে অবস্থিত সাগাইং এলাকাসহ আরও কিছু অঞ্চলে।

মিয়াঙ্গন কেন্দ্রীয় শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে দুজন নিহত হয়েছে। এখানকার বিক্ষোভকারী থু ইয়া জও বলেন, ‘তারা (জান্তা) আমাদের মুরগি ও পাখির মতো গুলি করে মারছে, এমনকি ঘরে ঢুকে হত্যা করছে। এরপরও আমরা আমাদের প্রতিবাদ চালিয়ে যাব। জান্তার পতন না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে।’ সব মিলিয়ে গতকাল মিয়ানমারে অন্তত ৯১ জন নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে মিয়ানমার নাও। তবে রয়টার্স নিহতের এ সংখ্যা সঠিক কি না, তা যাচাই করতে পারেনি। সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্রের কাছে এ প্রসঙ্গে জানতে চেয়ে ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।

তবে ক্ষমতাচ্যুত আইনপ্রণেতাদের জান্তাবিরোধী গোষ্ঠী সিআরপিএইচের মুখপাত্র ড. সাসা বলেছেন, ‘আজ সশস্ত্র বাহিনীর জন্য লজ্জা দিবস। ৪শ’র বেশি নিরপরাধ বেসামরিক মানুষকে হত্যার পর সামরিক বাহিনীর জেনারেলরা সশস্ত্র বাহিনী দিবস পালন করছেন।’

মিয়ানমারে গত ১ ফেব্রুয়ারির অভ্যুত্থানের পর থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে মোট নিহতের সংখ্যা এখন ৪শ’ ছাড়িয়েছে। গত শুক্রবার পর্যন্ত এ সংখ্যা ৩২৮ জনে ছিল বলে জানিয়েছে ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণকারী গোষ্ঠী অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স (এএপিপি)।

মিয়ানমারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধি বলেছেন, ‘মিয়ানমারের ইতিহাসে ৭৬তম সশস্ত্র বাহিনী দিবস সন্ত্রাস ও লজ্জা হিসেবে আখ্যায়িত হবে। শিশুসহ নিরস্ত্র মানুষ হত্যা কখনো ন্যায়সংগত কাজ হতে পারে না।’

এদিকে গতকাল সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে রাজধানী নেপিদোতে সামরিক কুচকাওয়াজে সভাপতিত্ব করার পর মিয়ানমারের শীর্ষ জেনারেল মিন অং হ্লাইং নির্বাচন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে কবে তিনি এ প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন, তা নির্দিষ্ট করে বলেননি।

সেনাপ্রধান বলেন, ‘গণতন্ত্রের সুরক্ষায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী পুরো জাতির সঙ্গে হাতে হাত রেখে কাজ করতে চায়। যে দাবিতে নৃশংস কর্মকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে, দেশের স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা বিনষ্ট হচ্ছে, সেটা সঠিক দাবি নয়।’

এ সময় সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতা অং সান সু চি এবং তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির বেআইনি কার্যকলাপের কারণে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে।’

সেনা অভ্যুত্থানের প্রতিক্রিয়ায় এরই মধ্যে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সেনা পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।