দুই মেয়ে, জামাতা ও দুই নাতি-নাতনিকে একসঙ্গে হারালেন রংপুরের পীরগঞ্জের বড় রাজারামপুর গ্রামের বাসিন্দা আবদুল করিম সরকার। গত শুক্রবার রাজশাহীর কাটাখালীতে সড়ক দুর্ঘটনায় যে ১৭ জন নিহত হন, তাদের মধ্যে পাঁচজনই ৭০ বছর বয়সী এ বৃদ্ধের স্বজন। তারা হলেন বড় মেয়ে কামরুন্নাহার (৩৭), ছোট মেয়ে শামসুন্নাহার (২৫), তার স্বামী মো. সালাহউদ্দিন (৩৬), তাদের ছেলে সাজিদ (৮) ও মেয়ে সাফা (২)। একসঙ্গে সবাইকে হারিয়ে এখন শোকে পাথর হয়ে গেছেন আবদুল করিম।
গতকাল শনিবার সকালে রামেক হাসপাতালে লাশ নিতে আসেন তিনি। বেশিরভাগ সময় চুপচাপ ছিলেন। এ প্রতিবেদককে আবদুল করিম বলেন, ‘এত শোক সইব কী করে! জীবনে কখনো এত শোক পাইনি। এভাবে কী সবাই একসঙ্গে চলে যায়! আমার আদরের মেয়েরা নাই। আমার নাতি-নাতনিরা নাই, এটা কীভাবে সম্ভব!’
গতকাল দিনভরই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিহতদের স্বজনরা ভিড় করেন। নানা প্রক্রিয়া শেষে বিকেলে তাদের কাছে ১৭টি লাশ হস্তান্তর করা হয়। শহীদুল ইসলামের লাশ নিতে এসেছেন ছেলে নাজমুল হুদা। কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের এ ছাত্র বলেন, ‘উপজেলা সদরে ব্যবসার সুবাদে বাবার সঙ্গে সবার বন্ধুত্ব। তারা সবাই প্রতি বছর একসঙ্গে কোথাও না কোথাও বেড়াতে যান, করোনাকালে যা হয়নি। এজন্য তারা রাজশাহীতে পিকনিক করতে গিয়েছিলেন।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আব্বুকে ফোন দেই, নম্বর বন্ধ। তাদের গাড়িতে থাকা অন্য কয়েকজনকে ফোন করেও বন্ধ পাই। মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। সত্যটা জেনে নিজেকে ধরে রাখতে পারছি না।’
ফুলু মিয়ার কাছের কেউ রইল না : দুর্ঘটনায় ফুলু মিয়াসহ পরিবারের পাঁচ সদস্য নিহত হয়েছেন। তাদের লাশ নিতে এসেছেন নুর মোহাম্মদ, ফুলু মিয়ার ছোট বোনের জামাই তিনি। নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘ফুলু মিয়ার কাছের মানুষ বলতে কেউ রইল না। রইল শুধু বয়স্ক মা সাহিদা বেগম। বুকে পাথর চেপে তিনি বাড়িতে ছেলে, নাতি-নাতনির লাশ দেখার অপেক্ষায় আছেন।’ সাহিদা বেগম ছেলের সঙ্গে পুত্রবধূ নাজমা বেগম, নাতি ফয়সাল ও দুই নাতনি সুমাইয়া ও সাবিহাকে হারিয়েছেন।
নিহত তাজুল করিম ভুট্টোর বড় ভাই জুয়েল মিয়া বলেন, ‘ও আমাকে বলেছিল রাজশাহী যাব, একটু বাসাটা দেখে রাখিস। এরপর শুক্রবার সকালে অন্যদের সঙ্গে রাজশাহী যান। কিন্তু ভাই তো আর ফিরে এলো না। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে তার স্ত্রী এবং একমাত্র আদরের ভাতিজাকেও হারালাম।’
ডিএনএ সংগ্রহ করে লাশ হস্তান্তর : ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল বিকেলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল মর্গ থেকে লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর লাশবাহী দুটি ট্রাক ও একটি অ্যাম্বুলেন্স রংপুরের পীরগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হয়।
পুড়ে অঙ্গার হওয়ায় আটজনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এদের নম্বর দিয়ে ডিএনএ সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে। তাদের রক্তের সম্পর্কের স্বজনদেরও নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ডিএনএ প্রোফাইল মেলানোর জন্য। স্বজনরা নম্বর অনুযায়ী দাফন করে কবরে চিহ্ন দিয়ে রাখবেন। ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল এলে এ নয়জনের সঠিক পরিচয় জানা যাবে।
পুলিশ জানায়, মাইক্রোবাসের ভেতরে ১১ জন পুড়ে মারা যান। এদের মধ্যে মাত্র দুজনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। তবে ১৭ জনেরই নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য।
৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি : এদিকে দুর্ঘটনার কারণ জানতে রাজশাহী জেলা প্রশাসন ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) আবু আসলাম জানান, তারা কাজ শুরু করেছেন। দ্রুত তদন্ত শেষ করা হবে।
বাসচালক গ্রেপ্তার : হানিফ পরিবহনের যে বাসের ধাক্কায় এতগুলো প্রাণ ঝরে যায়, তার চালক আবদুর রহিমকে (৩৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ বিষয়ে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র গোলাম রুহুল কুদ্দুস জানান, দুপুর ২টার দিকে আরএমপির বেলপুকুর থানার মাহিন্দ্র বাইপাস এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর আগে গত শুক্রবার রাতে চালককে একমাত্র আসামি করে মামলা করেন কাটাখালী থানার এসআই নূর মোহাম্মদ। তিনি দাবি করেন, ‘কেটিসি হানিফ বাসের চালক (অজ্ঞাত) বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে ঢাকা যাওয়ার পথে মাইক্রোবাসটিতে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে ১৭ জন নিহত হয়। চালককে শনাক্তের পর গ্রেপ্তার করা হয়।’
শোকে মুহ্যমান পীরগঞ্জ : রংপুরের পীরগঞ্জ এখন শোকে স্তব্ধ। গতকাল দিনভর পাঁচটি গ্রামে চলে কবর খোঁড়ার কাজ। কোথাও একই পরিবারের সদস্যদের জন্য খোঁড়া হয় পাশাপাশি পাঁচটি কবর, কোথাও চারটি, আবার কোথাও তিনটি। স্মরণকালে কখনো এ রকম শোক নেমে আসেনি পীরগঞ্জবাসীর জীবনে।
শুধু বেঁচে আছেন পাভেল : কাটাখালীর দুর্ঘটনায় মাইক্রোবাসের ১৮ যাত্রীর মধ্যে একমাত্র বেঁচে আছেন পাভেল (১৭)। তিনি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ডারিকাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। একই দুর্ঘটনায় তার বাবা মোখলেসুর রহমান ও মা পারভিন বেগম মারা গেছেন। পাভেল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।
রামেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস বলেন, ‘পাভেলের অবস্থা আগের থেকে ভালো। তার মাথার অবস্থা নিশ্চিত হতে সিটি স্ক্যান করা হয়েছে।’
গত শুক্রবার দুপুর পৌনে ২টার দিকে রাজশাহীর কাটাখালীতে বাস ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে ১৭ জন নিহত হন। রাজশাহী থেকে হানিফ পরিবহনের একটি বাস ঢাকার দিকে যাচ্ছিল। একই সময় মাইক্রোবাসটি রাজশাহীর দিকে আসছিল। কাটাখালী থানার সামনে কাপাশিয়া এলাকায় দুটি গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এরপর হানিফ বাসটি রাস্তার পাশের একটি গাছে ধাক্কা লেগে থেমে যায়। মাইক্রোবাসটির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হলে আগুন ধরে যায়।