স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

১৯৭১ থেকে ২০২১ সাল। সময়ের হিসাবে ৫০ বছর। বাংলাদেশ পালন করছে সুবর্ণজয়ন্তী। এই ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্জন কম নয়। অনেকেই বলছেন বিস্ময়কর। যদি উন্নতির চিত্র দেখি তাহলে দেখব মাথাপিছু আয় ১১০ ডলার থেকে বেড়ে এখন ২০৬৪ ডলার, জিডিপি ৯ বিলিয়ন ডলার থেকে হয়েছে ৩৩৫ বিলিয়ন ডলার। খাদ্য উৎপাদন ১ কোটি ১০ লাখ টন থেকে বেড়ে ৫ কোটি টনে উন্নীত হয়েছে। অন্তত ১৩টি ক্ষেত্রে উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থানে আছে বলে তথ্যে জানা যায়। ধান উৎপাদনে চতুর্থ, ইলিশ মাছে প্রথম, তৈরি পোশাকে দ্বিতীয়, প্রবাসী আয়ে অষ্টম, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, আলুতে ষষ্ঠ, কাঁঠালে দ্বিতীয়, আমে অষ্টম, পেয়ারায় অষ্টম, পাটে দ্বিতীয়, মিঠাপানির মাছে তৃতীয়, ছাগল উৎপাদনে চতুর্থ আর ছাগলের দুধ উৎপাদনে দ্বিতীয়, আউটসোর্সিং-এ দ্বিতীয় স্থানে আছে বাংলাদেশ। এ ছাড়াও যমুনা সেতু, হাইওয়ে, ফ্লাইওভার এবং সর্বশেষ পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অগ্রগতিকে দৃশ্যমান করেছে।     

স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের পূর্বসূরিরা তাদের বর্তমানকে উৎসর্গ করেছিলেন দেশের ভবিষ্যতের জন্য। সেই যে গানটা আছে “তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে/ আমরা ক’জন নবীন মাঝি হাল ধরেছি...”। বাস্তবেও তাই ছিল। এই দেশকে মানুষের বাসযোগ্য করবার জন্য তারা তাদের জীবন বাজি রেখেছিলেন। নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধে একটা জাতিকে যে পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল তার নজির পৃথিবীতে আর নেই। ৩০ লাখ মানুষের জীবন দান, ২ লক্ষাধিক নারীর সম্ভ্রম, কোটি মানুষের গৃহহারা হয়ে দেশান্তরী হওয়া, গোটা দেশটাই একটা নির্যাতন ক্যাম্পে পরিণত হওয়ার ঘটনা যেমন বিশ্ববাসী জানে, তেমনি জানে কী অপরিসীম সাহস ও দেশপ্রেমের বলে বলীয়ান হয়ে ৮/১০/১২ সপ্তাহ ট্রেনিং নিয়ে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেছিল বাংলার দামাল ছেলেমেয়েরা।  

দেশের প্রতি এই ভালোবাসা আর সাহসের উৎস কী ছিল? তা ছিল মুক্তি অর্জন ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আকুতি।  প্রায় দুইশ বছরের ব্রিটিশ শাসনে এই ভূখণ্ডের মানুষ বুকে পরাধীনতার গ্লানি আর চোখে স্বাধীনতার স্বপ্নে সংগ্রাম করেছে । এই বাংলার এমন কোনো জনপদ নেই যেখানে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম ও সংগ্রামীদের স্মৃতিচিহ্ন নেই। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সর্বভারতীয় জাতীয়তাবোধ ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল কিন্তু তা পরিণত রূপ পায়নি নেতৃত্বের দূরদর্শিতার অভাব ও ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্রের কারণে। দ্বিজাতি তত্ত্বের নামে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার যে বীজ বপন করা হয় তার ফলে সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে গড়ে ওঠে পাকিস্তান। পৃথিবীর কোথাও ধর্মের ভিত্তিতে দেশ হয়নি। যদি তা হতো তাহলে এশিয়া আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সব কটি মুসলিম ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত অঞ্চল মিলে একটি মুসলিম দেশ হয়ে যেত। কিন্তু তা হয়নি। ইউরোপের সবগুলো দেশ মিলে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের দেশ হয়নি। চীন, জাপান, কোরিয়া মিলে যেমন বৌদ্ধ ধর্মের দেশ হয়নি তেমনি ভারত নেপাল মিলে হিন্দু বা সনাতন ধর্মের দেশ হয়নি। কারণ দেশ হতে গেলে ভূখণ্ডগত ঐক্য, সাংস্কৃতিক বন্ধন, ভাষা, অর্থনৈতিক জীবনধারা প্রভৃতি দরকার হয়। যে কারণে এক ধর্মের মানুষ হলেও তাদের নিয়ে এক দেশ হয় না। তাই হাজার মাইলের ভৌগোলিক দূরত্ব, ভাষা সংস্কৃতির পার্থক্য নিয়ে শুধু ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান নামের যে দেশ গড়ে তোলা হয়েছিল তা কোনো বিচারেই এক রাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিল না।

পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর তাই মোহভঙ্গ হতে বেশি দেরি লাগেনি। ভাষার ওপর আক্রমণ প্রতিরোধ করতে ৫২, শিক্ষার অধিকার সংকুচিত করার প্রতিবাদে ৬২, সংস্কৃতির ওপর আক্রমণের বিরুদ্ধে ৬৫, ৬ দফার লড়াইয়ে ৬৬, সামরিক শাসক আইয়ুবের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান ৬৯, মানুষের বিপুল অংশগ্রহণে নির্বাচনে ধস নামানো বিজয় ৭০ এবং ৭১ এর সশস্ত্র লড়াই ধারাবাহিকভাবে আমাদের আকাক্সক্ষাকে একটি যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। পাকিস্তান ছিল একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র তার বিপরীতে ধর্মনিরপেক্ষতা, পাকিস্তান ছিল  সামরিক শাসন দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র তার বিপরীতে গণতন্ত্র,  ব্রিটিশ শোষণ ও পাকিস্তানের ২২ পরিবারের শোষণের বিরুদ্ধে শোষণ মুক্তির আকাক্সক্ষা থেকে সমাজতন্ত্র আর দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক ও পাকিস্তানি প্রায়-ঔপনিবেশিক শাসনের বিপরীতে জাতীয়তাবাদ, এই আকাক্সক্ষাগুলো মূর্ত হয়ে উঠেছিল আমাদের চেতনায়। তাই ঘোষণা করা হয়েছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে আমাদের লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে গ্রাম শহরের শ্রমজীবী মানুষ, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, বিভিন্ন পেশায় কর্মরত মধ্যবিত্ত নেমে এসেছিল আন্দোলন, অভ্যুত্থান আর স্বাধীনতার লড়াইয়ে। সব পথ যেন মিশে গিয়েছিল মুক্তির আকাক্সক্ষায়, স্বাধীনতার মোহনায়। 

কিন্তু ৫০ বছরে পদার্পণের এই সময়ে আমরা যদি আকাক্সক্ষা আর প্রাপ্তির হিসাব মেলাতে চাই তাহলে দেখব বিস্তর ফারাক তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতার জন্য লড়েছিল যারা আর সুফল ভোগ করছে যারা তারা একদেশের মানুষ হয়েও যেন এক জাতের মানুষ নয়। দুজন বাঙালি কোটিপতি নিয়ে যে দেশের যাত্রা শুরু সে দেশে আজ সোয়া লাখের বেশি কোটিপতি। যাদের মধ্যে আবার ২৫০ জন যে কোনো দেশের বিবেচনায় অতি ধনীর পর্যায়ে পড়ে। শ্রমিকের এবং প্রবাসী শ্রমিকের শ্রমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৪৪ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু এর পাশাপাশি যে চিত্র আমাদের পীড়িত করে তা হলো, প্রায় দেশের ৭ কোটি শ্রমজীবী মানুষ যাদের মজুরি বিশ্বের সবচেয়ে কম, এক কোটি ২২ লাখ শ্রমজীবী মানুষ বিদেশে কর্মরত তারা তাদের শ্রম বিক্রি করছেন বিদেশের বাজারে, বেকারত্ব তীব্র, যে কোনো একটা কাজ পাওয়ার জন্য যুবকরা মরিয়া হয়ে  জীবনের ও আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে বিপদসংকুল ও অনিশ্চিত পথে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে।  কৃষক ধান, সবজি, মাছ, ফল চাষ করে ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। অন্যদিকে বাজার সিন্ডিকেটের কারণে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ছেই। শিক্ষা এবং চিকিৎসার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। ব্যাংকের টাকা আত্মসাতের নিত্যনতুন খবর আসছে, প্রতি বছর গড়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার করছে ধনীরা, সে টাকা জমছে বিদেশের ব্যাংকে। মানুষ দেখছে দেশের জিডিপি, প্রবৃদ্ধি, বৈষম্য আর দুর্নীতি সবই বাড়ছে। তখন প্রশ্ন আসে, ৫০ বছর পর এই দৃশ্য আমরা কি দেখতে চেয়েছিলাম?   

ভোটের স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করা ধর্মনিরপেক্ষতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কিন্তু ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার ধর্ম ব্যবসায়ীদের তৎপরতা দুটোই বেড়েছে, ক্ষমতার স্বার্থে এসবের পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রদায়িকীকরণ এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির উন্মাদনা বাড়ছে। সাম্যের পরিবর্তে অসাম্য এখন প্রধান ধারা, ফলে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান আকাশচুম্বী। সামাজিক ন্যায়বিচার এখন মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। মানবিক মর্যাদা যে ভূলুণ্ঠিত তা নারীর লাঞ্ছনা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, সংখ্যালঘু জাতিসত্তার ওপর আক্রমণের চিত্র দেখলে বুঝা যায়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং চর্চা এখন সবচেয়ে নিম্নস্তরে পৌঁছে গেছে। নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ না করে গণতান্ত্রিক অধিকার ও মূল্যবোধ ধ্বংসের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে। টাকা, পেশিশক্তি, প্রশাসন ও সাম্প্রদায়িকতা ব্যবহার করে নির্বাচনকে কলুষিত করার কাজ তো ধারাবাহিকভাবেই চলছিল কিন্তু বিজয়ের মাসে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচন, সংসদের উপ-নির্বাচন, স্থানীয় পরিষদের নির্বাচন সব যেন ক্রমাগত খারাপ নজির সৃষ্টি করে চলেছে।

স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের প্রাক্কালে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল এবার তারা মুক্তি পাবে শোষণ ও লুণ্ঠন থেকে, আর মাথা নিচু করে থাকা নয়, মর্যাদা নিয়ে বাঁচার মতো পরিবেশ পাবে। তা এখনো অর্জিত হয়নি। এর কারণটা খুঁজে বের না করলে হতাশা গ্রাস করবে এবং ছড়িয়ে পড়বে সর্বত্র। স্বাধীনতার পর যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং যা ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে তার ফলেই শোষণ ও বৈষম্য এত প্রকট রূপ নিয়েছে। এ কারণেই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, কিন্তু শোষকদের প্রাপ্তি ঘটেছে ব্যাপক। শোষণ ও লুণ্ঠনকে অব্যাহত রাখতেই নিপীড়ন যেমন বাড়ছে, শোষণকে আড়াল করতে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনাও তেমনি প্রশ্রয় পাচ্ছে। ফলে উন্নয়নের এই প্রবল জোয়ারেও গণতন্ত্র ও নৈতিকতার ভাটার টান মানুষ প্রত্যক্ষ করছে। পেছন ফিরে তাকালে তাই স্বপ্ন আর প্রতিজ্ঞার কথা মনে পড়ে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, প্রাপ্তি ঘটেনি এ কথা বলাই শুধু যথেষ্ট নয়, অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের সংগ্রামটাও খুব জরুরি। আর যে শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে এত বিপুল আত্মত্যাগেও মানুষের মুক্তি এলো না সেই ব্যবস্থা বহাল থাকলে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। ৫০ বছরে অর্জিত এই শিক্ষা নিয়ে শোষণ মুক্তির লড়াই অব্যাহত রেখেই আজ মানবিক মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।  

বাংলাদেশের জনগণ যতদিন ধরে পাকিস্তানি প্রায়-ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে লড়েছে তার চেয়ে দ্বিগুণ সময় পার করেছে স্বাধীন দেশে। এই ৫০ বছরে বাংলাদেশের পরিবর্তন দেখতে দেখতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা মৃত্যুবরণ করেছেন আবার মুক্তিযুদ্ধের পর পর যারা জন্মগ্রহণ করেছিলেন তারা বার্ধক্যের পথে যাত্রা করেছেন। তাদের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে সেদিনের সেই সংগ্রাম আর স্বপ্নের দিনগুলো। কিন্তু আজ ঝলমলে দালানকোঠা, হাইওয়ে, রাস্তা, ফ্লাইওভার, ব্রিজ দেখে, মাথাপিছু আয়, জিডিপি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের কথা শুনে খুশি হলেও বৈষম্য, গণতন্ত্রের বেহাল দশা আর নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র দেখে তারা দুঃখ পাচ্ছেন। তাই অর্থনৈতিক উন্নতি ও গণতান্ত্রিক বিকাশ দুটোই ঘটুক সমানতালে সুবর্ণ জয়ন্তীর প্রত্যাশা এটাই।

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

rratan.spb@gmail.com