বাংলাদেশ-নেপাল সম্পর্কে সম্ভাবনার দিগন্ত

বাংলাদেশ ও নেপাল দক্ষিণ এশিয়ার দুই নিকটতম বন্ধুপ্রতিম ও শান্তিপ্রিয় প্রতিবেশী। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দুদেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফর বিনিময় হয়েছে। ২০১৯ সালে নেপাল সফর করেছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে গুরুত্বপূর্ণ অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ সফর করে গেছেন নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারি।

বাংলাদেশ-নেপালের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় নেপাল নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু ১৯৭১-এ নেপালের পাকিস্তান দূতাবাসের এক কর্মকর্তা পদত্যাগ করলে নেপাল তাকে আশ্রয় দিয়েছিল। বিশে^র সপ্তম দেশ হিসেবে ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় নেপাল। এর ফলে পাকিস্তান নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল কিন্তু নেপাল বাংলাদেশের পক্ষে অটল ছিল।

১৯৭৬ সাল থেকে ছয়টি রুটে নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ার পর থেকে দুদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। ১৯৭৮ সালে নেপালের রাজা বীরেন্দ্রের ঢাকা সফরের মাধ্যমে সম্পর্ক আরও সমৃদ্ধ হয়। বর্তমানে দুদেশই জাতিসংঘ, ডব্লিউটিও, সার্কসহ বেশ কয়েকটি ফোরামের সদস্য। নেপাল ও বাংলাদেশ উভয় দেশই এলডিসি থেকে বের হওয়ার পথে রয়েছে। নেপাল সরকার ‘সুখী নেপাল, সমৃদ্ধ নেপাল’ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারও রূপকল্প ২০২১ এবং রূপকল্প ২০৪১ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও জোরদারের সম্ভাবনা ব্যাপক।

২০১৯ সালে বাংলাদেশ থেকে হিমালয়কন্যা নেপালে পর্যটক গেছে ৪০ হাজার। বর্তমানে চার-পাঁচ হাজার নেপালি শিক্ষার্থী বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পড়ছে। নেপালে কর্মক্ষেত্রে যোগ দিয়ে এসব ডাক্তার প্রেসক্রিপশনে লিখছেন বাংলাদেশি কোম্পানির ওষুধ। ফলে বাংলাদেশের ওষুধের ভালো একটা বাজার তৈরি হয়েছে নেপালে। বর্তমানে আটটি কোম্পানি নেপালে ওষুধ রপ্তানি করে। দুঃখজনকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কাক্সিক্ষত সাফটা চুক্তি না হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য সম্ভাবনা নানাভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে দেশগুলো দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে যাচ্ছে। ভারতের সঙ্গে নেপাল ও ভুটানের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে এটা আলোচনাধীন। অন্যদিকে, বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য নেপাল বাংলাদেশের সঙ্গে অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি বা পিটিএ স্বাক্ষর করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। গত বছর থেকে এই আলোচনা ব্যাপক মাত্রায় শুরু হলেও এখনো চুক্তিটি সম্পন্ন না হওয়ায় নেপালের পক্ষে হতাশা রয়েছে। নেপালের কাঠমান্ডু পোস্ট এ নিয়ে কয়েকবার প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে। নেপাল কাছের দেশ হওয়ায় নেপাল থেকে আমরা সহজেই ফল, হারবাল ও মসলা আমদানি করতে পারি। অন্যদিকে নেপালের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ বহুমাত্রিক সম্ভাবনার। নেপাল ৯০ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর।

নেপাল ২৯ মিলিয়ন জনসংখ্যার এবং ৩০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ। অনেকে মনে করেন নেপালের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কম। কিন্তু নেপালিরা বেশ শৌখিন জাতি। ফলে বাংলাদেশের ইলেকট্রনিকস পণ্য, সিরামিক পণ্য, গার্মেন্টস পণ্য, ফার্নিচার ও দেশীয় পোশাক ব্র্যান্ডের ভালো বাজার হতে পারে নেপাল। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সে পথে বহুদূর এগিয়েছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ নেপালে ৫.২৯ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করেছে আর নেপাল রপ্তানি করেছে ৯৫৪ মিলিয়ন ডলার। কাক্সিক্ষত পিটিএ চুক্তি সম্পন্ন হলে দুদেশের বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত সূচিত হবে। ভুটানের সঙ্গে পিটিএ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ভুটান-বাংলাদেশ বাণিজ্য দ্বিগুণ হয়েছে। কাঠমান্ডু পোস্ট সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলছে, নেপাল এরই মধ্যে পিটিএ নিয়ে তাদের ড্রাফট পাঠিয়েছে, এখন তারা বাংলাদেশের সাড়ার জন্য অপেক্ষা করছে।

দুদেশের মধ্যে সম্পর্কের আরেক দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বিদ্যুৎ আমদানি। প্রাকৃতিকভাবে নেপাল প্রায় ৪২ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ রপ্তানি করার সক্ষমতা রাখে। দ্রুত শিল্পায়নের পথে চলা বাংলাদেশ নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারে। এরই মধ্যে ভারত এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।

নেপাল-বাংলাদেশের ভৌগোলিক দূরত্ব মাত্র ২২ কিলোমিটার। বাংলাদেশের বাংলাবান্ধা থেকে নেপালের কাকঁরভিটা পর্যন্ত সড়কপথের দূরত্ব ৩৯ কিলোমিটার। এটা অনেকটা রাজধানী ঢাকার নগরকেন্দ্র থেকে কোনো শহরতলির দূরত্বের মতো। তবে রেলপথও সম্ভাবনা জোগাচ্ছে। বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের রোহনপুর থেকে ভারতের সিঙ্গাবাদ হয়ে যে রেল যোগাযোগ তাতে যুক্ত হতে চাইছে নেপাল। এই রেলপথে কাঠমান্ডুর দূরত্ব হয় ২১৭ কিলোমিটার। অন্যদিকে, চীন তিব্বতের লাসা থেকে নেপালের সীমান্ত শহর খাসা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ করছে। নেপাল সেই রেলপথ কাঠমুন্ডু পর্যন্ত আনতে চায়। ফলে চেষ্টা ও ইচ্ছা থাকলে বাংলাদেশ কাঠমান্ডু হয়েও চীন যাওয়ার রেল যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে।

বর্তমানে কাঠমান্ডুর সঙ্গে ঢাকার আকাশপথে যোগাযোগ রয়েছে। নেপাল সেটাকে সিলেট ও চট্টগ্রামের সঙ্গেও প্রসারিত করতে চায়। উভয় দেশের সম্পর্কে আরেকটি বাঁক হতে পারে বাংলাদেশের সৈয়দপুর থেকে নেপালের বিরাটনগর বিমানবন্দরের যোগাযোগ স্থাপন। এই যোগাযোগে মাত্র ১৫ মিনিটে সৈয়দপুর থেকে নেপালে পৌঁছানো যাবে। দুদেশের পর্যটনশিল্প বিকাশ ও ব্যবসায়িক সম্পর্কের উন্নয়নে যারা সড়কপথের ট্রানজিট ভিসার ঝামেলা এড়াতে চান, তাদের জন্য এই আকাশ যোগাযোগ এনে দেবে এক স্বস্তির নিঃশ্বাস। উভয় সরকার এই সৈয়দপুর-বিরাটনগর আকাশ যোগাযোগের আন্তর্জাতিক শুল্ক প্রত্যাহার করতে পারে। সেটা হলে নেপালে বাংলাদেশি পর্যটক কয়েক লাখে পৌঁছাবে।

দুদেশের সম্পর্কে আরেকটি সম্ভাবনা ক্রিকেট। নেপালে এখন দেশটির প্রধান খেলা ফুটবলকে ছাড়িয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ক্রিকেট। ২০১৪টি টোয়েন্টিতে নেপাল হংকংকে হারিয়ে তাক লাগিয়ে দেয়। নেপালি ক্রিকেটার সন্দীপ লামিচান ঢাকার বিপিএলে খেলে গেছে। নেপালের ক্রিকেট উন্নয়নে বাংলাদেশ হতে পারে নেপালের কাক্সিক্ষত বন্ধু।

অনেকে মনে করে নেপালে পণ্য পাঠানো অনেক কঠিন কাজ। কিন্তু বাংলাবান্ধার নেপাল ওয়্যার হাউজে পণ্য দিয়ে আসলে সেটা সহজেই নেপাল পৌঁছে যায়। ফলে নেপালে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্ভাবনাময়। অবশ্য এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে হবে।

বর্তমানে রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে সারা বিশ্বব্যাপী শোরগোল। এ কারণে মধ্যমসারির দেশসমূহ উন্নত ও প্রভাবশালী দেশের বিনিয়োগ নিতে সতর্ক থাকছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিনিয়োগকে সাদরে গ্রহণ করবে নেপালিরা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দুদেশের মৈত্রীর সম্পর্কও এতে কাজে লাগবে। দুদেশই শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

লেখক : শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ

সাউথ এশিয়ান (সার্ক) বিশ্ববিদ্যালয়, নয়াদিল্লি