জিগাতলা কাঁচাবাজার সে সময়ে রায়েরবাজার থেকে আসা লিংক রোডটার দিকে একটু সরে এসেছে। আগে তো জিগাতলা স্টাফ কোয়ার্টারের গায়ে বসত, ২০০০ সাল নাগাদ রায়েরবাজারের দিক থেকে আসা রোডটা যেমন আড়ে বাড়ল, একইসঙ্গে পাশে ভেতরের দিকে মাছ ও মাংসের পাকা দোকান, রাস্তায় সবজি ইত্যাদি। একদিন সকাল ১০টা-১১টা নাগাদ, জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডের দিকে যেতে একটু দ্রুতগামী রিকশা ওই কাঁচাবাজারের দুপাশের সবজির দোকানের কাছে গতি কমালে, রাস্তার বাঁ-দিকে দেখি মাহমুদুল হককে। রিকশার গতি কমেছে বলে নিশ্চিত হওয়ার জন্য চোখ বড় করে তাকিয়ে থাকা। সেটি প্রথম দেখা নয়। ততদিনে তার একমাথা চুল প্রায় সাদা। হাতে বাজারের থলে। গায়েও সাদা ফতুয়া, সামনে নিচের দিকে দুটো পকেট। পরনে লুঙ্গি। হাতে থলি আর পরনে লুঙ্গিটাই সে মুহূর্তে আমার জন্য অবাক করা। নিশ্চয়ই কাছাকাছি কোথাও থাকেন। নইলে এই পোশাকে, এখানে, বটুভাই? রিকশা গতি নিয়েছে। আমি বাঁ-দিকে পেছনে তাকিয়েই আছি।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি প্রথম তাকে দেখেছিলাম এলিফ্যান্ট রোডে। মল্লিকার গলিতে। শীত প্রায় যাই-যাই। জামা-গেঞ্জিহীন গায়ে একটা হাফ হাতা সোয়েটার। নাতি কোলে। কোলে যে নাতি তা বিষয়টি পরে বলেছেন হামিদ কায়সার। মাহমুদুল হক, বন্ধুদের মুখে বটু, তরুণদের মুখে বটুভাই, তখন এলিফ্যান্ট রোডে ওই মল্লিকার গলির শুরুতে ডানদিকের একতলা বাড়ির নিচতলায় থাকেন। একদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটি-দুটি বাক্য বিনিময়ও ঘটেছিল। বলেছিলেন, বাড়িতে আসতে। যাওয়া হয়নি। ঠিকরে বেরুনো উজ্জ্বল বড় চোখের লম্বা মানুষটাকে আর ভুলিনি। সেই একদিন কাছ থেকে দেখা তার চুলই যা সাদা হয়েছে, একই মানুষ, চেনায় ভুল নেই। জিগাতলার দিকে যেতে যেতে নিশ্চিত হলাম, তিনিই মাহমুদুল হক। কাঁচাবাজারের ভিড়েও আলাদা করে চোখে পড়ার মতো দেখতে। হয়তো বাসা বদল করেছেন অথবা আশপাশে কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে এসেছেন, তাই ওখানকার বাজারে।
সন্ধ্যায় আজকের কাগজের অফিসে সহকর্মী কাউকে জিজ্ঞাসা করে জানি, সকালে আমার দেখা ঠিকই। মাহমুদুল হক এখন জিগাতলা কাঁচাবাজারের পাশেই চারতলা বাড়ির তিনতলায় থাকেন। তাহলে তিনি বলতে গেলে আমার প্রায় প্রতিবেশী। শামীম রেজার কাছ থেকে তার বাসার ল্যান্ডফোনের নম্বরটাও নেওয়া গেল। কিন্তু সেই ফোন করার কোনো কারণ আর ঘটে না। বরং, রায়েরবাজারের বদলে কখনো জিগাতলায় বাজার করতে গেলে, বাজারেই তাকে দেখি। এমন না যে প্রতিদিন, সারাটা সকাল মাহমুদুল হক বাজারেই কাটান, কিংবা আমিও প্রতিদিন সকালে যেতাম বাজারে। একদিন মাছবাজারের এক কোনা থেকে অন্য কোনায় যেতে যেতে তাকে দেখি। সেখানের ভিড়ে এখন ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে কথা বলা যেতেই পারে। তিনি প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছেন, আমি পাশ থেকে জানতে চাইলাম কেমন আছেন? একটি দুটি কথার পরই খুব অবাক করে দিয়ে তিনি বললেন, এলিফ্যান্ট রোডে থাকতে তোমাকে আসতে বলেছিলাম, কিন্তু আসোনি। এখন এই পাশের বাড়িটাতে থাকি। একদিন সন্ধ্যায় যদি আসি, তাহলে আলাপ করা যাবে। ফোন নম্বরটা বলতে চাইলেন। বললাম, আছে আমার কাছে। সঙ্গে এও জানলাম, মাঝে মাঝে এই বাজারে, সকালের দিকে তাকে বাজার করতে দেখি। সংকোচে কথা বলি না। দেখি, আপনি এখানের বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলেন। হাসলেন। আসলে, ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগে না তার, প্রায়ই সকালে বাজার করার না থাকলেও মানুষ দেখতে কথা বলতে নিচে নামেন। আবার হাসলেন। ইচ্ছে করেই জানতে চাইলাম না, কী লিখছেন কিংবা লিখছেন না কেন? তা বলার জায়গা এটা নয়।
এক অফ ডে’র সন্ধ্যায় সহকর্মী আনোয়ার পারভেজ হালিম আর আমি হাজির হলাম মাহমুদুল হকের বাসায়। কদিন আগে পারভেজ ভাইকে বিষয়টা বলতেই তিনি বললেন, চলেন, অমুক দিন সন্ধ্যায় যাই। পারভেজ ভাইয়ের উৎসাহের কারণ, মাহমুদুল হকের লেখার সঙ্গে তিনি পরিচিত। আর এও জানেন, গত প্রায় বছর বিশেকে লিখেছেন মাত্র একটি গল্প। এর আগে বাংলাদেশের নিয়মিততম কথাসাহিত্যিকদের একজন এই অসাধারণ গদ্যলেখক। সেদিন সন্ধ্যায় মাহমুদুল হক অনেক কথা বললেন। বলেই গেলেন, আমরা মুগ্ধ শ্রোতা। যে বিষয়ই তুলি তা নিয়ে কথা বলেন। জানাশোনার জগৎ, অভিজ্ঞতার এলাকা বিস্তর ও বিপুল। বলেন রসিয়ে। এমনকি নিজের সম্পর্কেও। শুধু আর কেন লিখলেন না? এই প্রশ্নেই মুখে ছায়া পড়ে তার। সেটা দেখতে ভালোও লাগে না। কিন্তু এত বড় কথাসাহিত্যিক লেখা একেবারে থামিয়ে দিয়েছেন, লিখবেনই না আর, এ তো ধনুর্ভঙ্গ পণ। আমরা তরুণরা চেষ্টাই করে চলেছি একটি মোটামুটি পাঠ্যযোগ্য লেখা লিখতে, ওদিকে অনুর পাঠশালা, জীবন আমার বোন, কালো বরফ কিংবা নিরাপদ তন্দ্রার লেখক আর লিখবেন না? সে কথা ভেতরে গুমরায় আর তার মুখে যতটাই ছায়া পড়ুক, কিন্তু অদম্য কৌতূহলে তা জিজ্ঞাসা না করে থাকাও যায় না। এরপর হঠাৎ কোনো সন্ধ্যায় একলা গিয়ে উপস্থিত হই। কোনোদিন সঙ্গে হামীম কামরুল হক। কিছু কথা হয়। বটুভাই বলেন, শুনি। লিখতে অনুরোধ করি বুকে সাহস নিয়ে। দাবড়ানি খাওয়ার ভয়ও থাকে। তা অবশ্য দেন না। কিন্তু, আগেপাছে তার না-লেখা সম্পর্কে শোনা-জানা কথাকেও উলটে দেন তখন। জানান সাহিত্যজগতে এত ধরনের হিংসা পরশ্রীকাতরতা দেখেছেন যে, মনে করেন না লেখাই ভালো। তাই আর লিখতে ইচ্ছে করেনি। লিখলেন না। ভাবি, এও তো এক প্রকার আত্মরক্ষা। হয়তো ভেতরে আছে গূঢ় কারণ। সেটি খুঁজে দেখা যেতে পারে। তা কখনো সরাসরি বলবেন না তিনি।
কিছুদিনের ভেতরেই শামীম রেজার আদেশমাখানো প্রস্তাব, মাহমুদুল হকের একটি সাক্ষাৎকার নিতে হবে। হামীম কামরুল হক আর আমাকে। হামীমের পড়াশোনা অসাধারণ। পৃথিবীর বহু লেখকের জীবনাচরণ থেকে লেখার বিষয়ে খুঁটিনাটি জানে। সঙ্গে থাকায় ভরসা পাওয়া গেল। আমি বলতে গেলে আগে কখনো সাক্ষাৎকার নিইনি। বড়জোর কথোপকথনে শরিক হয়েছি। বললেন মাহমুদুল হক। প্রায় ঝাঁপি খুলে। হামীম পারেও বহু খুঁটিনাটি বিষয় টেনে বের করে আনতে। লেখা ধরে কথা বলতে। প্রসঙ্গক্রমে মহৎ লেখকদের লেখা বা উদ্ধৃতির সঙ্গে তুলনাও দিতে পারে তৎক্ষণাৎ। সেই সাক্ষাৎকারটা এত বড় হলো যে শামীম সাধারণ সংখ্যায় পুরো দুপৃষ্ঠায় ছাপল, তাও পাঁচ ভাগের এক ভাগ। বাদও দিয়েছি অনেক। তারপর, বছর দুয়েক বাদে আগে অনেকখানি বাদ দেওয়ার পরেও যা থাকল, সেই প্রায় দশ-বারো হাজার শব্দের সাক্ষাৎকারটা শামীম রেজা আজকের কাগজের ঈদ সংখ্যায় ছেপে দিল। পুরোটা। এরপরে সেটি গ্রন্থিত হয়েছে আহমাদ মোস্তফা কামাল সম্পাদিত ‘হিরণ¥য় কথকতা’য়। এ বইয়ে মাহমুদুল হকের সব গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার সংগৃহীত হয়েছে।
হামীম কামরুল হক ও আমার নেওয়া সেই সাক্ষাৎকার থেকে দুটো অংশ এখানে উদ্ধৃত করছি। সেখানে মাহমুদুল হকের রসবোধ ধরা পড়ে। একই সঙ্গে কোনোভাবেই মনে হয় না, সেই ১৯৮২ সালের পর সাহিত্য থেকে স্বেচ্ছানির্বাসন নিয়েছেন। আশপাশের বিষয়ে দারুণ ওয়াকিবহাল। উদ্বাস্তুর নিঃসঙ্গতাবোধ ঘিরে ছিল সারাটা জীবন। তাও যেন নিজের লেখায়, সেই লেখার তিরিশ বছর বাদেও তা খুঁজে ফিরতেন। প্রকৃত ঔপন্যাসিকের মৌলিক বোধ ভীষণ টনটনে। ভাষাকে এগিয়ে নেওয়া লেখকের কাজ।
১। ‘কথা হচ্ছে এদেশে কেউ কেউ আছেন ম্যাজিক রিয়ালিজম খুব ভালো বোঝেন। তাই না? কিন্তু বাংলা সাহিত্যে যে ম্যাজিক আছে তারা কি তা বোঝেন? কোথায় ম্যাজিক আছে আমাদের সাহিত্যে তারা কি তা জানেন? জগদীশ গুপ্ত পড়েছেন? মনে হয় পড়েননি। দিবসের শেষের মতো গল্প, আজ আমাকে কুমীরে ধরবে। [...] ভাবটা এমন ল্যাটিন জাদুবাস্তবতা আমরা এত ভালো বুঝি যে, ল্যাটিন আমেরিকার লোকেরাও মনে হয় এত ভালো বোঝে না।’
২। ‘নিঃসঙ্গতাবোধ আমার সব লেখাতেই আছে। একদিন একজন বলল যে, আপনার লেখাতে তো আপনাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। সমস্ত লেখাতেই আপনার উপস্থিতি কম। সেটা আমার নিজেরই মনে হয়। [...] বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, বইটা [অনুর পাঠশালা/যেখানে খঞ্জনা পাখি] নিয়েই সবাই নাচানাচি করছে... আমার মাথায় কিন্তু তখন রয়েছে অন্য জিনিস যে, বাংলাদেশ হয়েছে কিন্তু আমাদের তো ভাষাটাকেও তৈরি করতে হবে? আমার কোনো বই কিন্তু আরেকটি বইয়ের মতো না। জীবন আমার বোন যদি কেউ পড়ে, সে কিন্তু বুঝবে না এই লেখকেরই নিরাপদ তন্দ্রা, প্রত্যেকটা বইয়েরই কিন্তু আলাদা ভাষা। ভাষা আলাদা করতে না পারলে সেই বই আমি লিখিনি।... অনেক বই, প্রায় চারটে বই, চারটে বই হবে, চারটে বই অর্ধেক লিখে ছেড়ে দিয়েছি। দেখি একই রকম হচ্ছে।’ তন্দ্রা মাহমুদুল হকের জন্য মোটেও নিরাপদ ছিল না। জীবনকে তো তিনি শুধু শুধু বোন ডাকেননি!
১৭ চৈত্র ১৪২৭/৩১ মার্চ ২০২১। সিলেট।
লেখক কথাসাহিত্যিক
prasantamridha@gmail.com