ব্রাহ্মণবাড়িয়া পরিদর্শনে গিয়ে আইজিপি

রাজনৈতিক আলেম বাড়ছে, রুহানি আলেম বাড়ছে না

দেশে রুহানি আলেম নয়, রাজনৈতিক আলেমের সংখ্যা বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ। তিনি বলেছেন, ‘আগে হুজুররা রিকশায় চলতে পারতেন না। এখন বড় হুজুরদের গাড়ি আছে। কেউ কেউ হেলিকপ্টার হুজুর নামে পরিচিত হচ্ছেন। এখন রাজনৈতিক আলেমের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু রুহানি আলেমের সংখ্যা বাড়ছে না।’ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের তাণ্ডবে ক্ষতবিক্ষত ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শনে গিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন আইজিপি।

তিনি আরও বলেন, ‘যারা মাদ্রাসার এতিম শিশু ও দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করে তা-ব চালায় তারা রাজনৈতিক শক্তি, আধ্যাত্মিক শক্তি নয়। রাজনীতি করার অধিকার সবার আছে, কিন্তু রাজনীতির নামে জনগণের ধন-সম্পদ ধ্বংস করে কেন? এসব বিদেশে ভিন্নভাবে প্রচারিত হয়। বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হতে দেব না।’

হেফাজতি তা-বে ক্ষতবিক্ষত ও ধ্বংস্তূপে পরিণত হওয়া বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শনে গতকাল হেলিকপ্টারে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসে দুপুর ১২টার দিকে প্রথমে বিশ্ববিশ্রুত সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিধন্য দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন পরিদর্শন করেন বেনজীর আহমেদ। এ সময় সংগীত প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক নাট্যজন মনজুরুল আলম তার সামনে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার বর্ণনাসহ ক্ষয়ক্ষতি তুলে ধরেন। তখন আইজিপি তিতাসপাড়ের ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানের সর্বত্র তা-ব আর ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহ দৃশ্য দেখে অনেকটা বিমর্ষ হয়ে পড়েন। এরপর তিনি সদর উপজেলা ভূমি অফিস ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাব পরিদর্শন করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবে এলে সেখানে উপস্থিত প্রেস ক্লাব সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন জামি তার ওপর হামলার বর্ণনা করেন। সাধারণ সম্পাদক জাবেদ রহিম বিজন ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে হেফাজতি তা-বের বর্ণনা তুলে ধরেন। এ সময় রিয়াজ উদ্দিন জামি ২৮ মার্চ হরতালের দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তা-ব চলাকালে প্রশাসন ও পুলিশের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘ওইদিন প্রশাসন-পুলিশের সমন্বয়হীনতা ছিল।’ এ সময় আইজিপি বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে তা-ব চলেছে তা অত্যন্ত ভয়াবহ ও নৃশংসতম। এ তা-বের ঘৃণা জানানোর ভাষা নেই। নারায়ণগঞ্জের এক সাংবাদিকের নাম শুনে হরতালকারীরা তাকে চারবার কলেমা পড়িয়ে নিশ্চিত হয়েছে যে সে মুসলমান। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে আমাদের চার কলেমা পড়ে প্রমাণ দিতে হয় মুসলমানের, সেখানে কি একাত্তরেই থেকে গেলাম?’

তিনি আরও বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ ইসলামের স্বার্থে, দ্বীনের খেদমতে ৫৭৪টি মাদ্রাসা বানাল। সেখানকার এক লক্ষাধিক মাদ্রাসা ছাত্রের জন্য প্রতিদিন খাবারের জন্য এক কোটি টাকার খরচের জোগান দেয়। সেখানেই ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর ওপর বারবার হামলা হচ্ছে, মার খাচ্ছে, জনগণের সম্পদ নষ্ট হচ্ছে, ২০০ বছরের পুরনো রেকর্ড নষ্ট হচ্ছে। মাদ্রাসা ছাত্ররা কি ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীকে কালেকটিভ পানিশমেন্ট দিচ্ছে।’

দেশের মানুষ ধর্মভীরু-ধর্মপ্রাণ উল্লেখ করে পুলিশপ্রধান বলেন, ‘সর্বধর্মের সমন্বয় শিক্ষা আমরা নবী (সা.)-এর কাছ থেকেই পেয়েছি। লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা-ভাঙচুর করে তারা কোন দ্বীনের খেদমত করেন? এটাও ভাবতে হবে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হামলা জঙ্গিবাদ থেকে কোনো অংশে কম নয় উল্লেখ করে বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘জঙ্গিবাদ দমনে সাধারণ মানুষ যেভাবে সহায়তা করেছে, তা-বকারীদের বিরুদ্ধেও সাধারণ মানুষই আমাদের সহায়তা করবে। যারা আমার টাকা খেয়ে আমার ঘর পোড়াবে তাদের শনাক্ত করতে হবে।’

এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা, সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ পৌর মিলনায়তনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করেন আইজিপি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সার্কিট হাউজ মিলনায়তনে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করে বেলা ৩টায় প্রেস ব্রিফিংয়ে আসেন তিনি। প্রেস ব্রিফিংয়ে আইজিপি বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বারবার আক্রমণ হচ্ছে। আইনের শাসন থাকা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন আক্রমণ চলতে পারে না। প্রত্যেকটি ঘটনার বিচার হওয়া উচিত। আমাদের কাছে সব ঘটনার স্টিল ছবি ও ভিডিও ফুটেজ আছে। ভিডিও ফুটেজ ও স্টিল ছবি দেখে অপরাধীদের শনাক্ত করা হচ্ছে। তদন্তে ও শনাক্তে যাদের নাম বেরিয়ে আসবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় আইজিপি হেফাজতি তা-বে ক্ষতিগ্রস্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবকে ৫ লাখ এবং সুর সম্রাট দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন কর্র্তৃপক্ষের হাতে ২ লাখ টাকার চেক তুলে দেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পরিদর্শনকালে আইজিপির সঙ্গে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন র‌্যাব মহাপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন ও পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান মনিরুল ইসলাম।