সংসদে শোক প্রস্তাব গৃহীত

বারবার দল বদলাতে পছন্দ করতেন মওদুদ : প্রধানমন্ত্রী

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মৃত্যুতে সংসদে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মওদুদের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, মওদুদ আহমদ মেধাবী ছিলেন, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি এ মেধা দেশপ্রেমের কাজে লাগালে ভালো হতো।

গতকাল সংসদে সিলেট-৩ আসনের এমপি মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর মৃত্যুতে আনা শোক প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য দেওয়ার সময় মওদুদ আহমদকে নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। তুলে ধরেন তার রাজনৈতিক জীবনের নানা ঘটনা। মওদুদের মৃত্যুতে শোক জানানোর প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি মারা যাওয়ার পর আমি নিজে হাসনার সঙ্গে কথা বলি। কারণ হাসনার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। সিঙ্গাপুরে ওর সঙ্গে কথা বলি। তাকে আমার শোকবার্তাও জানিয়েছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ কখনো ছাত্রলীগ করেননি। তিনি সবসময় সরকারঘেঁষাই ছিলেন। ব্যারিস্টারি পাস করে ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশে আসেন। তিনি কবি জসীমউদ্দীনের মেয়ের জামাই বলে তার প্রতি একটা সহানুভূতি ছিল। কিন্তু তার কিছু কাজ একটু ভিন্ন ধরনের ছিল। যার কারণে ’৭৩ সালে তাকে একবার গ্রেপ্তারও করা হয়। বাংলাদেশের কিছু গোপন তথ্য পাচার করছিলেন তিনি। জসীমউদ্দীন সাহেব নিজে এসেছিলেন আমাদের বাসায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কাছে অনুরোধ করলে তখন তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।’

ব্যারিস্টার মওদুদ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুর আইনজীবী ছিলেন বিএনপির হারুনুর রশীদের এমন বক্তব্য ও মওদুদ আহমদের জীবনীতে লেখা ওই দাবির জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দি করা হয়, তখন যে মামলা চলছিল, এখানে অবশ্য তার জীবনীতে (মওদুদ) লেখা আছে তিনি আইনজীবী ছিলেন। আসলে তিনি অ্যাপয়েনটেড আইনজীবী ছিলেন না। তিনি ড. কামাল হোসেন সাহেব এবং বঙ্গবন্ধুর পিএস মোহাম্মদ হানিফের সঙ্গেই ঘুরতেন। তিনি সেই গ্রুপের সঙ্গে সবসময় ছিলেন। বিশেষ করে ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামের সঙ্গে তার খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল। দুজন সবসময় একসঙ্গেই চলতেন।’

তিনি বলেন, ‘আমার এখনো মনে আছে যখন আইয়ুব খান গোলটেবিল বৈঠক ডাকল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে আগরতলা মামলায় বন্দি অবস্থায় প্যারোলে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব হলো, তখন আমার মা এ বিষয়ে কঠিন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মামলা প্রত্যাহার করে মুক্ত মানুষ হিসেবে যেন তিনি (বঙ্গবন্ধু) যান। তিনি প্যারোলে যাবেন না। তথ্যটি আমি মায়ের কাছ থেকে নিয়ে বাবাকে পৌঁছে দিয়েছিলাম। যেখানে বন্দি রাখা হয়েছিল সেই ক্যান্টনমেন্টের ভেতর। সেখানে তখন আমাদের অনেক নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ, তোফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়া, আমিরুল ইসলাম, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদসহ আরও নেতারা ছিলেন। তারা বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন এবং সেটাই তারা বলার চেষ্টা করেছিলেন। আমি মায়ের বার্তাটা পৌঁছে দিই। অবশ্য বঙ্গবন্ধু নিজেও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাকে মুক্ত মানুষ না করলে তিনি যাবেন না। মায়ের বার্তাটা পৌঁছে বাসায় ফিরে আসার পর দোতলার বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে আছি। আমিরুল ইসলাম ও মওদুদ আমার কাছে আসেন। এসে আমিরুল ইসলাম সাহেব একটা কথা বলেছিলেন, আর মওদুদ তাতে সায় দিয়েছিলেন। বলেছিলেন যে তুমি কেমন মেয়ে! তুমি চাও না তোমার বাবা কারাগার থেকে ফিরে আসুক? জবাবে আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ, আমার বাবা সম্মান নিয়েই ফিরে আসবেন। আপনারা এ সমস্ত বিভ্রান্তি ছড়াবেন না। এ ধরনের কিছু কিছু কাজ তার (মওদুদ) করা... । কিন্তু তিনি মুখে যাই বলুন, লেখার মধ্যে অনেক বিতর্কিত কথা তিনি মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখেছেন।’

মওদুদ আহমদের দলবদলের প্রসঙ্গ টেনে সরকারপ্রধান বলেন, ‘সবসময় তিনি দলবদল করতে পছন্দ করতেন। যখন আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ হলো, সেই ’৬৯ সালে আমাদের সঙ্গে মিশে গেলেন। পঁচাত্তরের পর বিএনপিতে যোগ দিলেন। তিনি সাজাপ্রাপ্ত একজন আসামি ছিলেন। জেনারেল এরশাদ সাহেব তাকে ক্ষমা করে দিয়ে মন্ত্রিপরিষদে আইনমন্ত্রী করলেন। আবার তিনি বিএনপিতে যোগ দিলেন। তারপরও বলব, তিনি মেধাবী ছিলেন। তার দেশপ্রেম কাজে লাগালে হয়তো দেশকে অনেক কিছু দিতে পারতেন। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা।’