বঙ্গবন্ধু নবম বাংলাদেশ গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাফ বলে দিলেন দূর থেকে এত বড় ক্রীড়াযজ্ঞের উদ্বোধন করে তিনি মোটেই তৃপ্ত নন। ক্রীড়ামোদী প্রধানমন্ত্রী করোনার কারণে সশরীরে হাজির হতে পারেননি উদ্বোধনস্থল বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। গণভবন থেকে ডিজিটালি যুক্ত হয়েছেন। তবে মনটা ঠিকই তার পড়ে ছিল মাঠে হাজারো ক্রীড়াবিদের মাঝে। করোনাকালে সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে গেমস আয়োজনের নির্দেশনা দিয়ে শেখ হাসিনা সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় ৩১ ডিসিপ্লিনের প্রায় আট হাজার ক্রীড়াবিদ-কর্মকর্তার এই আসরের উদ্বোধন ঘোষণা করেছেন। তবে তিনি ডিজিটালি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যুক্ত হন পৌনে ৭টায়। তার যুক্ত হওয়ার পর জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টাব্যাপী বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। যার শেষটা হয়েছে দৃষ্টিকাড়া লেজার শো আর আতশবাজিতে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এর মধ্য দিয়ে আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে ৩১টি খেলার ৩৭৮টি ইভেন্টের ১২৭১টি পদকের লড়াই। দেশে ক্রমবর্ধমান করোনা নিয়ে চিন্তিত প্রধানমন্ত্রী বারবার আয়োজকদের নির্দেশনা দিয়েছেন স্বাস্থ্যবিধি যাতে কঠোরভাবে মানা হয়। একই সঙ্গে ক্রীড়াবিদদের ক্রীড়া দক্ষতা প্রদর্শনের তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দেন, ভবিষ্যতে কয়েকটি বিশেষ খেলাকে বাছাই করে সর্বোচ্চ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার, যাতে অলিম্পিকের মতো আসরে অংশগ্রহণের জন্য যোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী না এসেও ছিলেন। করোনার কারণে পুরো এক বছর পিছিয়ে যাওয়ায় বাজেটও কাটছাঁট হয়েছে। তারপরও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন ও দেশের সুবর্ণজয়ন্তীর বছরটাকে স্মরণীয় করে রাখতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটিকে বর্ণাঢ্য করতে আয়োজক বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের চেষ্টার কমতি ছিল না। সেনাবাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুটা হয়েছে বিকেল সাড়ে ৫টায় পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মাধ্যমে। এরপর প্রায় আধা ঘণ্টার একটি অডিও ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমে বাংলাদেশের খেলাধুলার উল্লেখযোগ্য সাফল্যগাথা তুলে ধরা হয়। মাগরিবের নামাজের বিরতির পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্ত হন অনুষ্ঠানে। জাতীয় সংগীতের পর আরেকটি অডিও ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমে প্রদর্শিত হয় এক ঝলকে খেলাধুলায় বাংলাদেশ শীর্ষক ডকুমেন্টারি। এরপর শুরু হয় ক্রীড়াবিদদের মার্চপাস্ট। ছোট ছোট পতাকা হাতে একে একে প্রবেশ করেন আট বিভাগের ক্রীড়াবিদরা। তাদের অনুসরণ করে মাঠে আসেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ জেল পুলিশ, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপির ক্রীড়াবিদরা। এরপর অংশগ্রহণকারী ক্রীড়াবিদদের পক্ষে শপথ গ্রহণ করান আরচার রোমান সানা এবং সব বিচারকের পক্ষে শপথ পাঠ করান সাবেক জুডোকা কামরুন্নাহার হিরু। এরপর স্বাগত বক্তব্য দেন বিওএ মহাসচিব ও সাংগঠনিক কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহেদ রেজা। বিওএ সভাপতি ও সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ তার বক্তব্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে খেলা আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেন। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল তার বক্তব্যে করোনাকালে বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী ট্রাস্ট ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দুস্থ ক্রীড়াবিদদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধন ঘোষণার পর আসে মশাল প্রজ¦ালনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আগের দিন বঙ্গবন্ধুর জন্মভিটা টুঙ্গিপাড়া থেকে প্রজ্জ্বলিত মশাল ১৮ জন ক্রীড়াবিদের হাতবদল হয়ে ঢাকায় এসেছিল। কাল সেই মশাল নিয়ে গলফার সিদ্দিকুর রহমান ও সাঁতারু মাহফুজা খাতুন শীলা দুই প্রান্ত দিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন। মাঠ প্রদক্ষিণ করে দুজন মূল মশালের কাছে গিয়ে অগ্নিশিখা প্রজ¦ালন করেন, যা গেমসের জানান দিতে জ্বলবে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত। মশাল প্রজ¦ালনের পর গেমসের মাসকট কপোত মাঠ প্রদক্ষিণ করে তারুণ্য, গতি, উচ্ছলতা ও শান্তির প্রতীক হয়ে। এরপর তরুণ চার শিল্পীর সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মনোমুগ্ধকর স্টেজ শো। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে নিয়ে নৃত্যালেখ্য পরিবেশনা করে নৃত্যাঞ্চল। যার নেতৃত্ব দেন দেশের প্রখ্যাত দুই নৃত্যশিল্পী শামীম আরা নিপা ও শিবলী মহম্মদ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের পরিবেশনা কিছু সময়ের জন্য ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন সময়ে। সুললিত কণ্ঠে বিপ্লবী গান পরিবেশন করেন তিমির নন্দী, বুলবুল মহলানবিশ, রফিকুল ইসলাম, শাহীন সামাদ ও ডালিয়া নওশিন। এরপর এক এক করে মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করেন প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন ও রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শেষটা হয়েছে চোখধাঁধানো লেজার শো, পাইরো এবং আতশবাজির জেল্লার মাধ্যমে।
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রের রাতের আকাশের এই ঝলমলে আলো আজ থেকে ছড়িয়ে পড়বে ঢাকাসহ সারা দেশের ২৯টি ক্রীড়া ভেন্যুতে। যেখানে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেবেন ক্রীড়াবিদরা। আর এদের মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসবে ভবিষ্যতের তারকারা। যারা দেশকে এনে দেবেন আন্তর্জাতিক সাফল্য। করোনাকালে অনেক ঝুঁকির মধ্যেও এই একটা লক্ষ্য নিয়েই যে হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ গেমস।