বাসে উঠতে না পেরে যাত্রীরা এবং যাত্রী নিতে না পেরে রাইড শেয়ারিং অ্যাপসের মোটরসাইকেল চালকরা গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কয়েকটি স্থানে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছে। এসময় তীব্র যানজট দেখা দেয় আশপাশের বিভিন্ন সড়কে। গতকাল সকাল থেকে খিলক্ষেতে বাসে উঠতে না পেরে যাত্রীরা বিক্ষোভ করে। এছাড়া উবার, পাঠাও, সহজসহ বিভিন্ন অ্যাপসের মোটরসাইকেল চালকরা জাতীয় প্রেস ক্লাব, শাহবাগ ও ধানমন্ডি এলাকায় সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মুনিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন বন্ধের বিষয়টি সরকারি সিদ্ধান্ত। আমরা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছি এবং সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কাজ করছি। তাছাড়া বাসে দুই আসনে একজন যাত্রী পরিবহনের সিদ্ধান্তও সরকারি। এক্ষেত্রে চালকরা বিক্ষোভ করলে বা যাত্রীরা বাসে সিট না পেলে আমাদের কিছু করার নেই। আমরা সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছি মাত্র।’
এদিকে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের মাধ্যমে মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন চালকরা। গতকাল রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাব, শাহবাগ, ধানমন্ডিসহ বেশ কয়েকটি সড়কে বিক্ষোভ করেন তারা। দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকায় দুই শতাধিক মোটরসাইকেলচালক তাদের মোটরসাইকেল সড়কে রেখে বিক্ষোভ করেন এবং এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান। পরে এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে শাহবাগ, ধানমন্ডিসহ আরও কয়েকটি এলাকায়। বিক্ষোভকারীরা রাস্তা অবরোধ করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। সেই সঙ্গে মোটরসাইকেলের হর্ন বাজিয়ে তারা সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান।
রাইড ব্যবহার করা যাত্রীদের বেশ কয়েকজন দেশ রূপান্তরকে অভিযোগ করে জানান, অফিস- আদালত সবকিছুই খোলা, তারপরও গণপরিবহনে ৫০ ভাগ যাত্রী বহন করার নির্দেশনা দেওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের জন্য অপেক্ষা করে বাসে ওঠা যায়নি। অনেকে আবার মোটরসাইকেলে যাতায়াত করলেও এখন রাইড শেয়ারিং না থাকায় চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। এগুলো যেন দেখার কেউ নেই বলে জানান যাত্রীরা।
রাজধানীর সদরঘাট, গুলিস্তান, শাহবাগ, ধানমণ্ডি, বাংলামোটর, গুলশান, উত্তরা, নর্দা, রামপুরা, পল্টন, ফকিরাপুলসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় সরেজিমন দেখা গেছে, মোটরসাইকেলের চালকদের দেখা নেই। বিভিন্ন সড়কে গণপরিবহন ও বাইকের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাত্রীরা দাঁড়িয়ে আছেন।
রাইড শেয়ারিং বন্ধের সিদ্ধান্ত থাকলেও উবার, পাঠাও, সহজসহ বিভিন্ন অ্যাপস চালু ছিল এবং অনেকেই সেটি ব্যবহার করেছেন। এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভরত মোটরসাইকেল চালক কবির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাইকে তেল ভরে পকেটে মাত্র দুই টাকা আছে। করোনার জন্য চাকরি নেই এক বছর ধরে। কোনোমতে একটি বাইক কিনে পাঠাও চালাই। এখন যদি রাইড শেয়ারিং বন্ধ থাকে পরিবার নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে।’
পুরান ঢাকার লালবাগের বাসিন্দা আকরাম হোসেন সুজন অনেকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার যেখানে হাজার হাজার মানুষের চাকরি দিতে পারছে না, আমরা সেখানে নিজেরা নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছি। সেখানে এই রাইড শেয়ারিং যদি বন্ধ থাকে তাহলে আমরা করব কী?
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মো. অপু বলেন, ‘করোনার শুরুর পর টিউশনি চলে যাওয়ায় কিস্তিতে মোটরসাইকেল কেনা হয়। রাইড শেয়ারিংয়ের আয় দিয়ে লেখাপড়ার খরচ চলছিল। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধির দোহাই দিয়ে আমাদের সড়কে নামতে দেওয়া হচ্ছে না। খরচ আসবে কীভাবে যদি রাইড শেয়ারিং বন্ধ থাকে।’
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) গত বুধবার এক চিঠিতে রাইড শেয়ারিং সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুই সপ্তাহ মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং সেবা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি অন্যান্য মোটরযানে রাইড শেয়ারিং সেবার ক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে বলা হয় চিঠিতে। এ বিষয়ে গতকাল বিআরটিএ’র কর্র্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
খিলক্ষেতে বিক্ষোভ : এদিকে সময়মতো বাস না পেয়ে কর্মস্থলগামী যাত্রীরা গতকাল রাজধানীর খিলক্ষেতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছেন। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে খিলক্ষেত বাসস্ট্যান্ডে রাস্তা আটকে তারা বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা দুপুর একটা পর্যন্ত বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন। সড়ক অবরোধের কারণে রাস্তার দ্ইু পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় অর্ধেক সিট খালি রেখে বাস চলাচলে নির্দেশনা জারি করে সরকার। বুধবার থেকে এই নির্দেশনা কার্যকর হয়। খিলক্ষেত রুটের পরিবহনগুলো উত্তরা কিংবা গাজীপুর বাস স্টপেজ থেকে যাত্রী উঠিয়ে বাসের গেট বন্ধ করে গন্তব্যের দিকে রওনা হয়। এতে করে পরবর্তী স্টপেজে থাকা যাত্রীরা বাসে উঠতে পারেনি।
ভুক্তভোগী এক যাত্রী বলেন, ‘আমরা সকাল থেকে অপেক্ষা করেও কোনো বাসেই উঠতে পারছি না। এই কারণেই আমরা রাস্তায় অবরোধে বাধ্য হয়েছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপস্থিত ট্রাফিক পরিদর্শক লিটন মিয়া বলেন, ‘সকালে আমরা বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রীদের তুলে দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু গণপরিবহনের সিটের তুলনায় যাত্রীর সংখ্যা বেশি। তাই অনেকেই বাসে উঠতে না পেরে বিক্ষোভ করছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিক্ষোভকারীদের সরে যাওয়ার অনুরোধ করছি। কিন্তু তারা সড়ক ছাড়ছেন না। এই সমস্যার সমাধান তো আমাদের হাতে নেই। তাছাড়া আমরা সরকারি সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারি না।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ট্রাফিকের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) বদরুল ইসলাম বলেন, প্রায় আড়াই তিন ঘণ্টা সড়ক বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে আমাদের হিমশিম অবস্থা হয়। যার প্রভাব পড়ে পুরো রাজধানীতে। বিক্ষোভের কারণে রাজধানীর অনেক সড়কই যানজট বেড়ে যায়।