নেতাকর্মীদের করোনা আক্রান্ত নিয়ে বিএনপিতে উদ্বেগ

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সম্প্রতি দলের শীর্ষ পর্যায়ের দুজন নেতা মারা গেছেন এবং ১০-১২ জন সিনিয়র নেতাসহ একের পর এক নেতাকর্মী আক্রান্ত হওয়ায় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে বেড়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। এমন পরিস্থিতিতে স্থায়ী কমিটির এক ভার্চুয়াল বৈঠক শেষে গত বুধবার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দলের নেতা-কর্মী সমর্থকদের স্বাস্থ্যসুরক্ষার কথা বিবেচনা করে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক সব কর্মসূচি স্থগিত করে বিএনপি।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রয়োজন ছাড়া নেতাকর্মীদের নিজ নিজ ঘরবাড়িতে যথাযথ নিরাপত্তার মধ্যে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা নিজেরাও নিজ নিজ বাড়িতে থাকার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি দেশবাসীর প্রতি আমাদের আহ্বান করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সতর্ক থাকুন, মাস্ক ব্যবহার করুন।’ 

বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সেলের প্রধান ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা দেশে করোনায় আক্রান্ত নেতাকর্মীদের সংখ্যা জানতে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই তারা তাদের বিভাগের আওতাধীন জেলাগুলোর নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে করোনায় আক্রান্ত নেতাকর্মীদের তালিকা করে তা কেন্দ্রে পাঠাবে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে তা জানিয়ে দেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি দলের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) রুহুল আলম চৌধুরী ও পররাষ্ট্রবিষয়ক উপকমিটির সদস্য খন্দকার আহাদ আহমেদ মৃত্যুবরণ করেছেন। এ ছাড়া সারা দেশে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা একের পর এক আক্রান্ত হওয়ার খবর পাচ্ছি।’

দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকায় গত বছর ২৫ মার্চ সব ধরনের সাংগঠনিক কার্যক্রম এক মাসের জন্য স্থগিত করেছিল বিএনপি। এরপর কয়েক দফায় তার মেয়াদ বাড়িয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করা হয়। পাঁচ মাস বন্ধ থাকার পর গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে দলটি সাংগঠনিক কার্যক্রম, সাংগঠনিক গঠন ও পুনর্গঠন কার্যক্রম পুনরায় শুরু করে।

দেশে দ্বিতীয় দফায় করোনাভাইরাস সংক্রমণের মাত্রা বাড়ার প্রেক্ষাপটে গত ২৪ মার্চ বিএনপির স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের বছরব্যাপী কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। রাজধানীর গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘দেশে করোনা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে দলের সুবর্ণজয়ন্তীর সকল কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে।’ এরপর গত বুধবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির এক ভার্চুয়াল সভা শেষে দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও বিএনপির ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। করোনায় আক্রান্ত হয়ে রাতেই সস্ত্রীক রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। 

প্রিন্স স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘সরকারের উদাসীনতার ফলশ্রুতিতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। এ অবস্থায় সাধারণ জনগণ, দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিবেচনায় সমাগম ঘটে এ ধরনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম আপাতত স্থগিত করা হয়েছে।’

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘তবে ফোন, সামাজিক গণমাধ্যম ও অ্যাপস ব্যবহারের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। বিএনপি জনগণ এবং দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকদের প্রতি করোনাভাইরাসের ক্রমবর্ধমান অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়া, মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের উদাসীনতায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জনগণের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিধানে দ্রুত কার্যকর ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করার আহ্বান জানাচ্ছে।’

করোনায় আক্রান্ত বিএনপির যেসব নেতা : গতকাল বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইং সদস্য শায়রুল কবির খান সাংবাদিকদের জানান, বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও তার স্ত্রী বিলকিস আক্তার হোসেন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া দলের অপর স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান গত ১১ মার্চ করোনা আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি আছেন। ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও তার স্ত্রী রিফাত হোসেন ২৯ মার্চ থেকে করোনা আক্রান্ত হয়ে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ডা. এ কে এম আজিজুল হক করোনা আক্রান্ত হয়ে বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ ১৭ মার্চ থেকে করোনা আক্রান্ত। তিনি স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি আছেন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে বিএনপি গঠিত মিডিয়া কমিটির সদস্য সাংবাদিক আতিকুর রহমান রুমন করোনা আক্রান্ত হয়ে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে গঠিত মিডিয়া কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুল করোনা আক্রান্ত হয়ে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ ছাড়া দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা ছাড়াও সারা দেশে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের অসংখ্য নেতাকর্মী করোনাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন।

তিনি আরও জানান, করোনা ছাড়া অন্য শারীরিক সমস্যা নিয়ে অসুস্থ হয়ে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরেছেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য প্রফেসর ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার। পুলিশের গুলিতে আহত যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেল দীর্ঘদিন হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বুধবার বাসায় ফিরেছেন।

বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক মুনির হোসেন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, নেতাকর্মীদের সুস্থতা কামনায় গত বুধবার রাতে মোহাম্মদপুরে ঢাকা-১৩ আসন বিএনপির উদ্যোগে এক মিলাদ ও দোয়া মাহফিল হয়। দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আগে এতিম শিশুদের দিয়ে কোরআনখানি অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া এতিম শিশুদের মাঝে মাস্ক ও স্বাস্থ্যসুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আব্দুস সালাম।