অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় সরকার নির্বাচন কতদূরে

নির্বাচন এলে সবার মনে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা জাগে। কিন্তু ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছানো এবং নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়া কতটা দুরূহ হয়ে গেছে সেটা আমরা গত কয়েক বছরের নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় বুঝতে সক্ষম হয়েছি। এখন যত দিন পার হচ্ছে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠছে। জোর করে ফলাফল নিজের অনুকূলে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ক্ষমতাবান প্রার্থীর কোনো রাখঢাক নেই। আগে যে বিষয়গুলো গোপনে ঘটত, সেটাই এখন নির্লজ্জভাবে প্রকাশ্যে ঘটছে।

গত ১৮ মার্চ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ছিল। সেদিন পত্রিকার রিপোর্টে দেখা যায়, ‘পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে নৌকায় ভোট নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের একটি প্রস্তুতি সভায় বর্তমান চেয়ারম্যান এ ঘোষণা দেন।’ (সূত্র : দৈনিক যুগান্তর, ১৯ মার্চ, ২০২১)।

অন্যদিকে অন্যতম বিরোধী দল বিএনপি পৌর নির্বাচনগুলোতে ঘটা অনিয়মের প্রতিবাদে এই নির্বাচন বয়কট করলেও প্রথম ধাপে ৩৭১টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ২০ হাজারের বেশি প্রার্থী হয়েছেন। তাদের মধ্যে চেয়ারম্যান পদে এক হাজার সাতশর বেশি, সাধারণ সদস্য (মেম্বার) পদে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ জন ও সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে চার হাজার তিনশর বেশি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। এসব প্রার্থীর মধ্যে বেশিরভাগই চাইবেন নির্বাচন যেন সুষ্ঠু হয়। ভোটাররাও চাইবেন নিরাপদে ভোট দিতে। কারণ, আমরা জানি গণতন্ত্রের সূতিকাগার হচ্ছে স্থানীয় সরকার। গণতন্ত্রের ধ্রুপদী অনুশাসন বলা হয় এই ব্যবস্থাকে। বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের তৃতীয় স্তরের প্রতিনিধিত্বকারী এ স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে আমরা অংশগ্রহণ,  প্রতিদ্বন্দ্বিতা, স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিয়ে জনমনে হতাশা, উদাসীনতা ও অনাস্থা লক্ষ করছি। স্থানীয় সরকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য শক্ত সাহায্যের কাঠামো তৈরি করে। একে তৃণমূলের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হলে তৃণমূলের গণতন্ত্র আগে শক্তিশালী হওয়া দরকার। এজন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হওয়া আবশ্যক। অথচ স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সেই স্বচ্ছতার কোনো বালাই নেই।

গত জানুয়ারি মাসে ৬০ পৌরসভায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ৪৬টি মেয়র পদে এবং বিএনপি প্রার্থীরা ৪টিতে জয়ী হন। এর আগে প্রথম দফায় অনুষ্ঠিত ২৬টি পৌরসভার ১৬টিতে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ আর ২টিতে বিএনপি। কোনো প্রার্থীর জনপ্রিয়তা থাকলে তিনি জয়লাভ করবেন এ নিয়ে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নির্বাচন কি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছিল? সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো প্রচার-প্রচারণা অর্থাৎ নির্বাচনের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত সব প্রার্থীর জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা। তা নির্বাচন কমিশন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। পৌর নির্বাচনগুলোতে আমরা প্রত্যক্ষ করলাম নির্বাচনী অনিয়মের ভয়াবহতা।

চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের মন্তব্য এক্ষেত্রে ভেবে দেখা দরকার। তিনি বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনিয়মের নির্বাচনের একটা রোল মডেল।’  তিনি বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে এ মডেল অনুসরণ করা হলে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বসভায় আত্মমর্যাদা অক্ষুণœ রাখা যাবে না। মাত্র সাড়ে ২২ শতাংশ ভোট গণতন্ত্রের নিয়ামক হতে পারে না।’ তিনি মূলত এখানে ভোটার অনুপস্থিতির বিষয়টাতে জোর দিয়েছেন। অন্যদিকে নির্বাচনের নামে যে অনিয়ম ও সহিংসতা হয়, তা আরও ভয়াবহ। একটু ক্ষতিয়ে দেখলে দেখা যায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে প্রতিযোগিতা করতে দেওয়া হয় মূলত কাউন্সিলর প্রার্থীদের। মেয়র নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে বেশিরভাগ এলাকাতেই প্রার্থী একজন, অন্য একজন থাকলেও বুথে অবস্থানকারী ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা প্রকাশ্যে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারকে ভয় দেখিয়ে বাধ্য করে বা কখনো কখনো ভোটারকে লাইনেই দাঁড়াতে দেওয়া হয় না। আর এর আগে তো আছেই নানা ছুতো ধরে বিরোধী প্রার্থীকে বাদ দেওয়া বা একাধিক মামলা দিয়ে প্রার্থীকে দাবিয়ে রাখা।

নির্বাচনের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত সব প্রার্থীর জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। বিরোধী দলের অনেক প্রার্থীকেই প্রচার থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এবারের স্থানীয় নির্বাচনে রাতের বেলা ভোট কেটে নেওয়া হয়নি তবে ব্যালট পেপার নিয়ে ভোট দিতে হয়েছে সরকার সমর্থকদের সামনে, গোপন বুথে যাওয়া চলবে না। তার মানে হলো এর আগে যে কাজটি রাত জেগে তাদের করতে হতো, সে কাজটি এখন কোনো রাখঢাক না রেখে দিনের আলোতে করা হচ্ছে। ভোটারদের তো অভিযোগ করার কোনো সুযোগ নেই। কেননা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের সামনেই যেখানে এমনটি ঘটছে! এই ধরনের নির্বাচনকে কখনোই অংশগ্রহণমূলক বলা যায় না।

এরপর আছে ইভিএমে ভোট দেওয়া। পৌর নির্বাচনের প্রথম দফায় ভোট পড়েছে ৬৫ শতাংশ আর দ্বিতীয় দফায় ৬১.৯২ শতাংশ। আর ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএমের তুলনায় ব্যালটে ১৪ শতাংশ বেশি ভোট পড়েছে। এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ‘মূলত ইভিএমে ভোট দেওয়ার মাধ্যমে ভোটারের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। এ ভোটিং মেশিনটি আমাদের এখানে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। এ যন্ত্রটির নিয়ন্ত্রণ থাকে নির্বাচন কমিশনের কিছু সীমিতসংখক ব্যক্তির হাতে। তারা ইচ্ছা করলে ভোটের হার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তারা যদি ইভিএমের ফলাফল নিজেদের ইচ্ছেমতো নির্ধারণ করে থাকে এবং যন্ত্রের মাধ্যমে জাল ভোটের ব্যবস্থা করে, তা চেক করার বা এ ঘটনার প্রতিবাদ করার কোনো ব্যবস্থা নেই। অন্যান্য দেশে ইভিএমে ভোট দিলে একটা ব্যালট বেরিয়ে আসে এবং তাতে ভোটারের নাম থাকে না, কিন্তু ভোটের তথ্য দেওয়া থাকে। এর মাধ্যমে অডিট করার সময় ভোটের পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে তিনবার ভোট গণনা করা হয়েছিল। প্রথমবার গণনার পর দ্বিতীয়বার তারা ইভিএম থেকে প্রাপ্ত ব্যালট পেপার গণনা করেছে এবং সর্বশেষ তারা সবকটি ব্যালট আলাদা করে গণনা করেছে। আমাদের দেশে সে সুযোগ নেই।

অন্যদিকে গত কয়েক বছরে নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। তারা আমাদের আমানতের খেয়ানত করছে। যেখানে সুষ্ঠু গণতন্ত্রের চর্চা আজ সর্বত্র অনুপস্থিত। সেখানে প্রথম বলি হয় ভোটের অধিকার। যার ফলে অনির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যখন প্রতিনিধিত্ব করতে যায়, জনগণের তার প্রতি যেমন আস্থা থাকে না, অন্যদিকে ওই ব্যক্তিও পেশি ও ক্ষমতার বলে নিজেকে প্রভাবশালী ভেবে মূলত সমাজে এক ধরনের গুণ্ডাতন্ত্র কায়েম করে। এক্ষেত্রে গণতন্ত্রের সঠিক চর্চার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের উচিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আচরণের মাধ্যমে  নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা ও আগ্রহ ফিরিয়ে আনা।

লেখক কথাসাহিত্যিক

gtanzia@gmail.com