হেফাজতের হরতালে হওয়া তান্ডব-সহিংসতার খেসারত দিচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরবাসী। গত রবিবারের ওই সহিংসতার পর বন্ধ রয়েছে পৌরসভার সব ধরনের কার্যক্রম। মোড়ে মোড়ে জমেছে ময়লার বিশাল স্তূপ। ময়লা আবর্জনার দুর্গন্ধে জনজীবন অতিষ্ঠ। অথচ ময়লা অপসারণের ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই সেখানে। সহিংসতার দিন লুটপাটের পাশাপাশি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ১৬০ বছরের প্রাচীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভায় গাড়ি থেকে শুরু করে নানা ধরনের সরঞ্জামাদি। পৌর কর্র্তৃপক্ষ বলছে, তান্ডবে তাদের ক্ষতির পরিমাণ শত কোটি টাকার বেশি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসার আসবাব থেকে শুরু করে ময়লা অপসারণের বেলচাটিও নেই তাদের। স্থানীয় সরকার বিভাগের জরুরি সহায়তা ছাড়া সেবা শুরু করা অসম্ভব।
গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে দেখা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জনবহুল এলাকা কুমারশীল মোড়ে ময়লার বিশাল স্তূপ। নাক চেপে অনেকটা দূর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন জনসাধারণ। চরম দুর্গন্ধে কেউ পাশ দিয়ে হাঁটতে পারছেন না। পাশের সদর হাসপাতাল, সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি গণগ্রন্থাগার, মাতৃসদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব বাণিজ্যিক ভবন ও সরকারি অফিসে উৎকট গন্ধে টেকা দায়। শহরের আরও কয়েকটি মোড়েও দেখা গেছে একই অবস্থা। ময়লা আবর্জনার দুর্গন্ধে পৌরবাসীর জীবন অতিষ্ঠপ্রায়।
গত রবিবার হেফাজতের হরতাল চলাকালে তান্ডব চালানো হয় ১৬০ বছরের প্রাচীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভায়। ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের পর চালানো হয় লুটপাট। এতে পৌরসভার সবকিছু নিঃশেষ হয়ে গেছে। পৌর কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ময়লা যে সরানো হবে সেই বেলচা পর্যন্ত লুট হয়েছে। ঝাড়–, টুকরি, শাবল, ঘামবুট, ব্লিচিং পাউডারের ড্রাম কোনো কিছুই নেই। গার্ভেজ ট্রাক-ট্রলি ভাঙচুর-ধ্বংস করা হয়েছে। ৩০০ পোর্টেবল মোবাইল ডাস্টবিন, ২০০ পোর্টেবল হ্যান্ড ট্রলি এবং ২০টি রিকশাভ্যান পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো কার্যক্রম চালানোর মতো ব্যবস্থাই নেই।
পৌরসভা সূত্র জানায়, স্বাধীনতা দিবসের বিকেলে প্রথম হামলা হয় পৌরসভার বঙ্গবন্ধু স্কয়ারে। সেখানে থাকা বঙ্গবন্ধুর ৩টি ম্যুরাল ভাঙচুর করা ছাড়াও স্কয়ারের ফোয়ারাতে থাকা ৯টি সাবমার্সিবল পাম্প আগুনে পোড়ানো হয়। পৌর মুক্তমঞ্চের গ্রানাইট পাথর, ৫০টি বৈদ্যুতিক খুঁটি, ২০টি ফ্লাড লাইট ভাঙচুর করা হয়। ২৮ মার্চ হরতাল চলাকালে পুনরায় হামলা হয় পৌরভবনে। ভাঙচুর-লুটপাটের পর আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় সেখানে। এতে ৪ তলাবিশিষ্ট পুরো পৌরভবনই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগুনে ছাই হয়ে গেছে সব রেকর্ডপত্র।
পৌরসভার মেয়র নায়ার কবির বলেন, হেফাজতের স্থানীয় কিছু নেতাকর্মী বিএনপি-জমায়াত এবং সদ্য অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে আমার দুই প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিয়ে এই হামলা চালিয়েছে। এতে আমাদের শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তাছাড়া আমার বাসভবনেও হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। সেখানে নিচতলায় থাকা একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মালামাল লুট করে নেওয়া হয়। ফলে পৌরসভার পক্ষ থেকে কোনো রকম নাগরিক সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, কবে নাগাদ নাগরিক সেবা শুরু করতে পারব তা এখনই নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। তবে আমরা চেষ্টা করছি পার্শ্ববর্তী একটি মিলনায়তন খালি করে বসার জন্য। তাও সেখানে বসে সেবা শুরু করতে কমপক্ষে ১০ দিন লাগবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালকের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. রুহুল আমিন বলেন, আমরা পৌর মেয়রের সঙ্গে কথা বলে অচিরেই নাগরিক সেবা শুরুর ব্যবস্থা করব।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংবাদিকের পাশে জাতীয় প্রেস ক্লাব : হেফাজতের হরতাল চলাকালে হেফাজত সমর্থকদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াছমিনসহ ১৯ সদস্যের প্রতিনিধিদল। হামলায় আহত ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাব সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন জামিরের খোঁজখবর নেন। এ সময় জাতীয় প্রেস ক্লাব ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের সাংবাদিকদের মধ্যে সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এসময় ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, একাত্তরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে হামলা হওয়ার পর আর কোনো প্রেস ক্লাবে কখনো হামলা হতে শুনিনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবে ও সাংবাদিকদের ওপর এ হামলা টার্গেট করে হামলা বলেই মনে করছি। এ হামলা মৌলবাদী গোষ্ঠীর অপতৎপরতা। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে জাতির পিতার ম্যুরালে হামলা মানে আমাদের স্বাধীনতার ওপর আঘাতস্বাধীনতার মূলে আঘাত। আর সাংবাদিকদের ওপর আঘাত মানে গণতন্ত্রের ওপর আঘাত। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের ভয় না পেয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পেশাগত কাজের ক্ষেত্রে আমরা এক হয়ে দায়িত্ব পালন করব। ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
হেফাজত তান্ডব হামলা ঠেকাতে আওয়ামী লীগও ব্যর্থ ছিল : হরতালের তান্ডব ঠেকাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগও ব্যর্থ ছিল বলে মন্তব্য করেছেন দলটির কার্যকরী কমিটির ‘বহিষ্কৃত সদস্য’ ও বিগত পৌর নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদুল হক ভূইয়া। গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। দলের কর্মী হিসেবে নিজেও ব্যর্থতার দায় নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা ঢাকার কৌশল উল্লেখ করে মাহমুদুল হক ভূইয়া বলেন, ‘আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় আছে। কিন্তু তান্ডব ঠেকাতে জেলা আওয়ামী লীগ ব্যর্থ ছিল। সেই ব্যর্থতার দায় এড়াতেই বিগত পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমার ও আমার সমর্থকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। শুধু আমি কেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী কেউ এরকম কোনো কর্মকাণ্ডে জড়াতে পারেসেটি আমি বিশ্বাস করতে পারি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কান্দিপাড়া এবং শিমরাইলকান্দি বিএনপি-ছাত্রদল অধ্যুষিত এলাকা। বড় মাদ্রাসাটাও ওই এলাকায়। ঘটনার দিন আমার বাসার গেটের ভেতর থেকে যা দেখার সুযোগ হয়েছে, আমার কাছে মনে হয়েছে হুজুরদের সঙ্গে কান্দিপাড়া-শিমরাইলকান্দির বহুসংখ্যক ছাত্রদলের উচ্ছৃঙ্খল যুবক ঘটনায় জড়িত। আমি নাম বলতে পারব না, কিন্তু ভিডিও ফুটেজ দেখলে তাদের চিহ্নিত করা যাবে।’ তিনি বলেন, ‘যারা সহিংসতা চালিয়েছে, তারা দেশের শত্রু ইসলামের শত্রু। ঘটনার সঙ্গে আমাকে এবং আমার সমর্থকদের জড়িয়ে এমপি মহোদয় যে মিথ্যা বক্তব্য দিয়েছেন, তা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।’
ক্ষতিগ্রস্ত কালীবাড়িতে পূজা উদযাপন পরিষদ : ভাঙচুর-লুটপাটের শিকার আনন্দময়ী কালীবাড়ি মন্দির পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় নেতারা। এসময় তারা স্থানীয় পুরোহিত, পূজা উদযাপন পরিষদ নেতৃবৃন্দ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অপরাধীদের শাস্তি দাবি করেন।