নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ‘রয়েল রিসোর্টে’ এক নারীকে নিয়ে অবস্থানকালে হেফাজতের নেতা মামুনুল হককে অবরুদ্ধ ও হেনস্তা করার প্রতিবাদে সোনারগাঁজুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছে হেফাজতে ইসলামের একদল নেতাকর্মী। মামুনুল হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগরীর সাধারণ সম্পাদক। মামুনুল ওই নারীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করলেও একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত একটি অডিও ক্লিপে স্ত্রীর উদ্দেশে তাকে বলতে শোনা যায়, পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে তিনি ওই কথা বলেছেন।
প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর হেফাজত নেতাকর্মীরা তাণ্ডব চালিয়ে তাকে মুক্ত করার পর মাইক্রোবাসে করে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়। মামুনুলকে অবরুদ্ধ করার ঘটনায় হেফাজতের কর্মীরা সোনারগাঁয়ের ‘রয়েল রিসোর্টে’ ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ ও বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে। বিক্ষুব্ধ হেফাজতকর্মীরা পুলিশের দুটি গাড়ি ভাঙচুর করে ও আগুন দেয় উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় এবং উপজেলা যুবলীগ সভাপতির শ্বশুরবাড়িতে। রাত ১০টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সোনারগাঁ এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দাঙ্গা পুলিশসহ অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে সোনারগাঁ এলাকায়।
রাত ১০টার দিকে ফেইসবুক লাইভে এসে মামুনুল হক দাবি করেন, ওই নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। শরিয়তসম্মত উপায়ে তার এক সহকর্মীর সাবেক স্ত্রীকে তিনি বিয়ে করেছেন। বিষয়টি একান্ত পারিবারিকভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। ঘটনাস্থলে তিনি পুলিশ কর্মকর্তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলেছেন এবং তাতে ওই কর্মকর্তা সন্তুষ্টও হন। টানা কয়েক দিন পরিশ্রমের পর বিশ্রাম নিতে স্ত্রীকে নিয়ে তিনি সোনারগাঁয়ের ওই রিসোর্টে যান বলেও ফেইসবুক লাইভে বলেন।
রয়েল রিসোর্টে গিয়ে জানা গেছে, হেফাজত নেতা মামুনুল হক এক নারীসঙ্গী নিয়ে পঞ্চম তলার ৫০১ নম্বর কক্ষে উঠেছেনএ খবর জেনে সোনারগাঁ উপজেলা যুবলীগ সভাপতি রফিকুল ইসলাম নান্নু ও পৌর ছাত্রলীগ সভাপতি মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ-যুবলীগের একদল নেতাকর্মী মারমুখী অবস্থায় রিসোর্টে প্রবেশ করে। তারা মামুনুল ও ওই নারীকে অবরুদ্ধ করে জেরা শুরু করে। খবর পেয়ে স্থানীয় সাংবাদিকরা সেখানে যান। সাংবাদিকসহ কয়েকজন বিষয়টি ফেইসবুকে লাইভে তুলে ধরেন। অনলাইনের মাধ্যমে খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সোনারগাঁ ও নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে সোনারগাঁ ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হেফাজতের শত শত নেতাকর্মী রিসোর্টে আসে। তারা প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। হেফাজতকর্মীরা রিসোর্টের নিচতলা, দোতলা ও লবির বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। এসময় বাইরে সোনারগাঁও থানার দুটি গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। স্থানীয়দের সঙ্গে হেফাজতকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। এতে কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়। পরে হেফাজতকর্মীরা রিসোর্টের সামনের সড়ক অবরোধ করে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। এরপর মামুনুলকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
মামুনুল হককে হেফাজতকর্মীদের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পিএম মোশাররফ হোসেন জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কায় মামুনুলকে হেফাজত ইসলাম কর্মীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপরও তারা মহাসড়ক অবরোধ ও ভাঙচুর করে।
মামুনুলকে হেনস্তা করার প্রতিবাদ জানিয়ে হেফাজতকর্মীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে। তারা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে এবং বেশকিছু গাড়ি ভাঙচুর করে। এতে ওই সড়কে এক ঘণ্টার মতো যান চলাচল বন্ধ ছিল। আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়েছেন, হেফাজতকর্মীরা উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ভাঙচুরের পর অগ্নিসংযোগ করে। এছাড়া রয়েল রিসোর্টের কাছে যুবলীগ নেতা নান্নুর শ্বশুরবাড়িতে আগুন দেয়। এছাড়া নান্নুর ব্যক্তিগত গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। অবরুদ্ধ অবস্থায় ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণ করায় মামুনুল হক গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছেন।
মামুনুলকে স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা যায় মামুনুল দাবি করেছেন, ওই নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী, দুই বছর আগে বিয়ে করেছেন। উত্তেজিত জনতার ক্রমাগত প্রশ্নের মুখে মামুনুল প্রায়ই নীরব থাকেন। তবে মামুনুল নারীটির যে নাম বলেছিলেন, মেয়েটির দেওয়া পরিচয়ে তার মিল পাওয়া যায়নি।
এদিকে হেফাজতের নেতাকর্মীরা ছাড়িয়ে নেওয়ার পর মামুনুল হক স্থানীয় হাবীবপুর ঈদগাহ মাঠে তাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সোনারগাঁয়ে ঘুরতে আসি। স্থানীয় রিসোর্টে আগে থেকেই রুম বুকিং দিয়ে এখানে এসেছি। আমি যেখানে যাই লোকজনের ভিড় জমে যায়। তাই কাউকে না জানিয়ে এখানে আসি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে স্থানীয় প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে লাঞ্ছিত করে। আমাকে চ্যালেঞ্জ করে। আমি কোনো অন্যায় করিনি।’
এরপর রাত সাড়ে ৮টায় সোনারগাঁ উপজেলার কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়, ‘হুজুর (মামুনুল) ঢাকায় চলে যাচ্ছেন। আপনারা সবাই শান্ত হয়ে যার যার বাড়িতে ফিরে যান।’ এ ঘোষণার পর লাঠি হাতে একটি মিছিল পূর্ব দিকে চলে যায়। ঘোষণার পরপরই একটি মাইক্রোবাসে করে মামুনুল ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতিকুল ইসলাম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) গোলাম মোস্তফা মুন্না, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোশাররফ হোসেন, থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তবিদুর রহমানসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তৎপর থাকতে দেখা যায়।
মামুনুল ও স্ত্রীর ফোনালাপ : মামুনুল ও তার স্ত্রীর ফোনালাপের একটি অডিও ক্লিপস বেসরকারি একটি টেলিভিশন স্টেশন প্রচার করে। ৫৮ সেকেন্ডের ওই ক্লিপসে মামুনুল তার স্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘আমার সঙ্গে যে মহিলা ছিল সে হলো জাফর শহীদ ইসলাম ভাইয়ের ওয়াইফ। সেখানে অবস্থা এমন হয়ে গেছে যে, একথা বলা ছাড়া আর উপায় ছিল না। আমাকে সেখানে তারা ইয়ে করে ফেলছিল।’ স্ত্রী বলেন, ‘বাসায় আসেন তার পর যা বলার বইলেন।’ ‘শুননা কিছু কথা তুমি অন্যদের বলতে হবে, তোমাকে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে বইলো আমি সব জানি, সেভাবে বইলো।’ স্ত্রী বলেন, ‘ঠিক আছে আপনি বাসায় আসেন।’
পারিবারিকভাবে দ্বিতীয় বিয়ের দাবি ভাগ্নের : হেফাজত নেতা মামুনুল হকের দ্বিতীয় বিয়ে প্রসঙ্গে গতকাল রাতে ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন তার ভাগ্নে এহসানুল হক। রাজধানীর জামিয়া রহমানিয়া মাদ্রাসার এই শিক্ষক লিখেছেন, ‘আমার মামা মামুনুল হক ও তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে (আমার মামি) নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী সন্ত্রাসীরা রিসোর্টে আক্রমণ করেছে। এ বিয়ে কোনো লুকোচুরির বিষয় নয়। এটি পারিবারিকভাবে হয়েছে।’