স্ত্রীকে হত্যার পর দুর্ঘটনায় মৃত্যু বলে চালানোর চেষ্টা!

রাজধানীর গুলশানের বাসায় স্ত্রীকে হত্যার পর দুর্ঘটনায় মৃত্যু বলে চালানোর চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে এক শিল্পপতিপুত্রের বিরুদ্ধে। তার নাম সাকিবুল আলম মিশু (৩২)। স্ত্রী ঝিলিক আলমের (২৩) মরদেহ প্রাইভেটকারে তুলে হাতিরঝিলে নিয়ে মিশু দুর্ঘটনার নাটক সাজান বলে অভিযোগ করেছেন ঝিলিকের পরিবারের সদস্যরা। গতকাল শনিবার সকালে মিশুকে ঘটনাস্থল থেকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশ। তাকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আটক মিশু একজন শিল্পপতির ছেলে বলে জানিয়েছেন নিহত ঝিলিকের স্বজনরা।

হাতিরঝিল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মহিউদ্দিন জানান, গতকাল সকাল ৯টার দিকে হাতিরঝিলের আমবাগান এলাকায় একটি প্রাইভেটকার দুর্ঘটনায় পড়ার খবর পান তারা। সেখানে গিয়ে আইল্যান্ডের সঙ্গে ধাক্কা লাগা একটি প্রাইভেটকার থেকে একজন পুরুষ ও একজন নারীকে উদ্ধার করা হয়। দুজনকেই হাসপাতালে নেওয়ার পর বেলা ১১টার দিকে ঝিলিককে মৃত ঘোষণা করা হয়। গাড়িটি মিশু নিজেই চালাচ্ছিলেন। পরে মিশুকে আটক করা হয়। আটক মিশু পুলিশকে বলেছেন, তিনি ডাক্তার দেখাতে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে তার স্ত্রী গুরুতর এবং তিনি সামান্য আহত হন। পরে ঝিলিককে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. বাচ্চু মিয়া জানান, মিশুর আচরণ রহস্যজনক মনে হওয়ায় তাকে আটক করে গুলশান থানায় খবর দেওয়া হয়। গুলশান থানা পুলিশের একটি দল এসে মিশুকে তাদের গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে যান। পরে গুলশান থানা পুলিশ মিশুর গুলশান-২ এর ৩২ নম্বর সড়কের বাসাটির ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসিটিভি) ফুটেজ সংগ্রহ করে। ওই ফুটেজে দেখা যায়, চারজন ব্যক্তি নিহত ঝিলিককে বাসার সিঁড়ি দিয়ে চ্যাংদোলা করে বের করছেন। ঝিলিককে গাড়িতে ওঠানোর পর মিশু নিজেও গাড়িতে ওঠেন।

মিশু পুলিশের জেরায় জানায়, অসুস্থ স্ত্রীকে হাসপাতালে নিতে বাসা থেকে প্রাইভেটকারে করে বের হন। হাতিরঝিল আমবাগান এলাকায় রাস্তার আইল্যান্ডের ওপর গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধাক্কা খেলে তিনি ডান হাতে সামান্য আঘাত পান এবং গাড়িতে থাকা তার স্ত্রী ঝিলিক গুরুতর আহত হন। আহত অবস্থায় পুলিশের সহায়তায় ঢামেক হাসপাতাল নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সকাল সোয়া ১১টায় ঝিলিককে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত ঝিলিকের মা তাহমিনা হোসেন আসমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঝিলিক ও মিশু ভালোবেসে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিয়ে করে। মিশুদের আর্থিক অবস্থা ভালো। তার তুলনায় ঝিলিকের পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা কম। মিশু বাবার টাকায় চলত। সে মাদকাসক্ত ও বেকার জীবনযাপন করত। বাসায় খাওয়া-পরা নিয়ে ঝিলিককে প্রায়ই খোঁটা দিত এবং নানাভাবে নির্যাতন ও মারধর করত। ঝিলিকের মৃত্যু পরিকল্পিত হত্যা। বাসায় স্বামীসহ আত্মীয়রা সবাই ছিলেন। শুক্রবার রাতে ঝিলিককে মারধর করে হত্যা করে দুর্ঘটনার নাটক সাজানো হয়েছে।’

ঝিলিকের মামী ইসমিতা ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঝিলিকের শ্বশুর জাহাঙ্গীর আলম পেশায় ব্যবসায়ী। তিনি একজন শিল্পপতি। গুলশানে তার কয়েকটি বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাসায় শ্বশুর, শাশুড়ি ছাড়াও ঝিলিকের একজন ননদ ও দেবর রয়েছে। এছাড়া বাসায় বেশ কয়েকজন কাজের লোকও আছে।’

ঝিলিকের মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে ইসমিতা আরও বলেন, ‘গরিবের মেয়ে হওয়ায় শ্বশুরবাড়ির লোকজন ঝিলিককে মেনে নিতে পারেনি। বাসায় নির্যাতন করে তাকে হত্যার পর ইংরেজি ছবির শ্যুটিংয়ের মতো হাতিরঝিলে নিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার নাটক সাজিয়েছে। ঝিলিকের শ্বশুরবাড়ির লোকজন দুপুর ১২টা-১টার আগে ঘুম থেকে ওঠে না। তারা বলেছে, সকালে ঝিলিককে নিয়ে বেড়াতে গেছে। বাসায় ৮ মাসের দুধের বাচ্চা রেখে নাইট ড্রেস পরে কেউ সকাল ৯টার দিকে গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বের হবে এমন কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। ঝিলিককে উদ্ধারের সময় তার পরনে ছিল শুধু ম্যাক্সি। একজন শিল্পপতির ছেলের বউ সকালে শুধু ম্যাক্সি পরে দুধের বাচ্চা বাসায় রেখে ঘুরতে বের হবে বিষয়টা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’

নিহত ঝিলিকের দেবর ফাহিম জানান, বাসাতেই ঝিলিকের মৃত্যু হয়েছে। তার বড় ভাই কেন দুর্ঘটনার কথা বলেছেন তা তার জানা নেই। তবে কীভাবে ঝিলিকের মৃত্যু হয়েছে সে বিষয়ে মুখ খোলেননি ফাহিম।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে ঝিলিকের ছোট ভাই জাবের হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই দিন ধরে ঝিলিকের কোনো খোঁজখবর পাওয়া যাচ্ছিল না। তার স্বামী বা অন্য আত্মীয়রাও ফোন ধরছিল না। আজ (গতকাল শনিবার) সকালে ঝিলিকের স্বামী আমার মা আসমা বেগমকে ফোন দিয়ে জানায়, ঝিলিক মারা গেছে। এইটুকু বলেই ফোন রেখে দেয়। এরপর কয়েকটি হাসপাতালে ঘুরেও তার কোনো খোঁজ পাইনি। পরে আমরা ৯৯৯-এ কল দিয়ে বিষয়টি জানাই। ৯৯৯-এ ফোন দেওয়ার পর গুলশান থানা পুলিশ ঝিলিকের শ্বশুরের বাসায় যায়। তখন মিশুর পরিবারের লোকজন জানায়, ঝিলিককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।’

জাবের আরও বলেন, ‘মিশুর পরিবারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তেমন ভালো ছিল না। সপ্তাহখানেক আগে সে পায়ের চিকিৎসা করানোর কথা বলে ভারত যায়। সেখান থেকে দেশে আসার পর ঝিলিক ও মিশুর সঙ্গে সর্বশেষ দেখা হয়। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। গত ২দিন ধরে ফোন দিয়েও ঝিলিককে পাচ্ছিলাম না আমরা কেউ।’ ঝিলিকের শ্বশুর জাহাঙ্গীর আলম শিল্পপতি এটা জানেন, কিন্তু তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের  নাম কী- সেটা জানাতে পারেননি জাবের।

ঝিলিকের চাচা বিল্লাল হোসেন জানান, আরমান আলম সাজিদ নামে ঝিলিকের ৮ মাস বয়সী একটি ছেলে আছে। ঝিলিকের বাবার বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলায়। অনেক আগে থেকেই তারা রাজধানীর মোহাম্মদপুর নুরজাহান রোডের বাসায় থাকেন। ঝিলিকের বাবা আনোয়ার হোসেন গত বছর এপ্রিল মাসে মারা যান। তার মা তাহমিনা হোসেন আসমা গৃহিণী। ৩ ভাই ১ বোনের মধ্যে ঝিলিক তৃতীয়। তিনি মোহাম্মদপুর গার্লস স্কুলের ছাত্রী ছিলেন। 

গুলশান থানা পুলিশ নিহত ঝিলিকের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্ত আগামীকাল সোমবার হবে বলে ঢামেকের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। 

গুলশান থানার ওসি আবুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বাসার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখছি। ঝিলিকের স্বামী মিশুসহ দুজনকে আটক করে জিজ্ঞাসবাাদ করা হচ্ছে। নিহতের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় জখম রয়েছে। এটা হত্যাকাণ্ড না দুর্ঘটনা সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা যায়নি। জিজ্ঞাসাবাদে একটু সময় লাগবে।’