স্বাস্থ্যবিধি ভেঙে ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা ছাড়ছে মানুষ

ঈদের ছুটির মতো এক সপ্তাহের ‘লকডাউনে’ গ্রামের দিকে ছুটছে মানুষ। করোনার ভয় নেই, স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। গতকাল রবিবার ভোর থেকেই রাজধানীর বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশনে মানুষের ভিড় দেখা যায়। মুখে মাস্ক নেই। শুধু টিকিট চাই। স্বাস্থ্যবিধির কথা বললে বেশিরভাগেরই এক বক্তব্য, আগে গ্রামে যাই। লকডাউন বাড়লে পরে যাওয়া যাবে না। গ্রামে গেলে অন্তত খেয়েপড়ে থাকতে পারব। আর স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে জবাব, কাল (সোমবার) থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে। শান্তিনগরের অস্থায়ী বাসিন্দা আরিফা বেগম বলেন, ‘সব বন্ধের মধ্যে ঢাকায় থেকে কী করব। তাছাড়া সামনে রোজা। যদি এক সপ্তাহ পর আবার “লকডাউন” বাড়ায় তাহলে তো একেবারে আটকা পড়ে যাব। তাই পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশে চলে যাচ্ছি। আর আমার স্বামী একটা দোকানের সেলসম্যান। মালিক বলছে, দোকান বন্ধ থাকলে বেতন হবে না। গতবারের মতো হলে দেশে যেতে আরও কষ্ট হবে। বাড়ি গেলে ছেলেপেলে অন্তত খেলাধুলা করতে পারবে।’

এভাবে ভিড় ঠেলে গেলে করোনা ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন প্রশ্নে আরিফা বললেন, ‘কাল (সোমবার) থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই চলব। বাড়ি গিয়ে সবার সঙ্গে দূরত্ব রেখে চলব।’

গত বছর করোনার কারণে সেলসম্যানের চাকরি চলে যায় দেলওয়ার হোসেনের। লকডাউন শেষ হলে পুনরায় চাকরিতে জয়েন করবেন বলে তিনি ঢাকা ছাড়েননি। পরে চাকরি না পেয়ে বাধ্য হয়ে রেস্তোরাঁয় দিনমজুরের কাজ নিয়েছেন। দেলওয়ার অবশ্য এখনো দিনমজুরের কাজ করছেন। কিন্তু তার সামান্য আয়ে ঢাকায় সংসার চালানো কঠিন। এবারের লকডাউনের ঘোষণায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন দেলওয়ার।

গতকাল রাজধানীর বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে গিয়ে দেখা যায়, দেশজুড়ে সপ্তাহব্যাপী লকডাউনের ঘোষণার পর আরিফা, দেলওয়ারের মতো অসংখ্য মানুষ শহর ছাড়ছেন। দুপুরের পর মানুষের ভিড় দেখা গেছে। টার্মিনাল কর্র্তৃপক্ষ বলছে, সাধারণ সময়ের চেয়ে যাত্রীদের চাপ তিনগুণ বেশি ছিল। এক সপ্তাহের জন্য কার্যত ‘লকডাউন’ ঘোষণা করা হচ্ছে তাই অনেকে বাড়ি চলে যাচ্ছে।

হাতিয়াগামী ‘তাসরিফ-২’ লঞ্চে কথা হয় সরকারি কর্মকর্তা আওলাদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, গত বছর হঠাৎ লকডাউন দেওয়ায় পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকতে হয়েছে। তাই এবার আগেভাগেই পরিবার নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন। সরকার অফিস চালু করলে তিনি চলে এলেও তার পরিবার বাড়িতে থাকবে।

এদিকে ঘরমুখী যাত্রীদের চাপে রাজধানীতে তীব্র যানজট দেখা দেয়। স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই ছিল না কোথাও। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ঘরমুখী প্রচুর মানুষ যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। গাটরি-বোঁচকা, ব্যাগ, লাগেজ প্রভৃতি নিয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়। ফলে অনেকেই হেঁটে টার্মিনালে পৌঁছান।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সদরঘাট কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বছরের অন্যান্য সময় এ টার্মিনাল থেকে দেশের বিভিন্ন রুটে ৮০-৮৫টির মতো লঞ্চ ছেড়ে যায়। স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে আরও ১০ থেকে ১২টি লঞ্চ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

এদিকে গতকাল সদরঘাট থেকে অধিকাংশ লঞ্চই ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি যাত্রী নিয়ে ছেড়ে গেছে। ঘাটে থাকা প্রতিটি লঞ্চও কানায় কানায় পূর্ণ দেখা গেছে। বিআইডব্লিউটিএ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বারবার লঞ্চগুলো ছাড়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলেও তা কেউ মানছে না। একইভাবে বাসেও দ্বিগুণ যাত্রী নিয়ে চলাচল করেছে। রেলস্টেশনে মানুষের ভিড়। সবার একই গন্তব্য যে করেই হোক লকডাউন শুরুর আগেই ঢাকা ছাড়তে হবে।

করোনাভাইরাসের কারণে সরকারের দেওয়া স্বাস্থ্যবিধি মেনে লঞ্চে যাত্রী চলাচলের কথা বলা হলেও প্রথম থেকে তা না মানার প্রবণতা দেখা গেছে। লঞ্চঘাটে দেখা গেছে, বেলা ৩টার পর থেকে একটু একটু করে ভিড় বাড়তে থাকে। বিকেল গড়াতেই লঞ্চগুলোতে দেখা যায় উপচেপড়া ভিড়। প্রতিটি লঞ্চের ধারণক্ষমতার দেড়গুণ যাত্রী ওঠানো হয়। যাত্রী পরিবহনের আগে জীবাণুনাশক স্প্রে ছিটানোর কথা থাকলেও বেশিরভাগ লঞ্চে তা মানা হয়নি। লঞ্চের যাত্রী কিংবা কর্মচারী কেউই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে না। যাত্রীদের স্যানিটাইজ না করে লঞ্চে তুলছে। লঞ্চের কর্মচারীরা যাত্রীদের স্বাস্থ্যবিধি মানানোর ব্যাপারে ছিল না তৎপর।

ঢাকা-ভোলা-বরিশাল-পটুয়াখালী-ভা-ারিয়া রুটের বেশিরভাগ লঞ্চে ছিল না কোনো জীবাণুনাশক টানেল ও থার্মাল স্ক্যানার। ডেকে যাত্রীদের অবস্থান করার জন্য ‘মার্কিং’য়ের ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও তা দেখা যায়নি। উল্টো গাদাগাদি করে এসব লঞ্চে যাত্রী তোলা হচ্ছে। এমনকি লঞ্চের ভেতর যাত্রীদের বেশিরভাগই মাস্ক পরা ছিল না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা-ভোলা রুটের তাফসির লঞ্চের ম্যানেজার জসিম উদ্দিন বলেন, আমরা চেষ্টা করছি যাত্রীদের নিরাপদ দূরত্বে রাখার। যাত্রীদের বারবার মাস্ক পরার জন্য বলা হচ্ছে। অনেকে গুরুত্বই দিচ্ছে না। যাত্রীরা না মানলে আমরা কী করব।

লঞ্চের স্বাস্থ্যবিধি না মানার বিষয়ে জানতে চাইলে নৌবন্দর পুলিশের এসআই আশরাফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিটি লঞ্চে সংক্রমণ ঠেকাতে আমরা মাইকিং করছি। লঞ্চ কর্তৃপক্ষকেও অনুরোধ করেছি যাত্রী হয়ে গেলে যাতে লঞ্চ ছেড়ে দেয়। লঞ্চে যাত্রীদের মাস্ক পরতে অনুরোধ করছি। কিন্তু অনেকে কথা শোনে না।’

দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যমতে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়া ঘাটে গতকাল দিনভর ঘরমুখো যাত্রীদের ঢল নামে। ফেরি, লঞ্চ ও স্পিডবোটে গাদাগাদি করে পদ্মা পাড়ি দিচ্ছেন যাত্রীরা।

গোয়ালন্দ, রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে গতকাল শত শত মানুষ ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরতে শুরু করেছেন।

মাদারীপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মাদারীপুরে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে লকডাউনের ঘোষণায় দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের ছিল উপচেপড়া ভিড়। শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে যেন পারাপারে প্রতিযোগিতায় নেমেছিল হাজার হাজার মানুষ। দক্ষিণবঙ্গের ২১টি জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বাংলাবাজার লঞ্চ ও স্পিডবোট ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, পদ্মা পাড়ি দিচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। তবে লঞ্চে জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়া বাড়ানো হলেও কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না লঞ্চ কর্র্তৃপক্ষ ও যাত্রীরা। নেই কোনো শারীরিক দূরত্ব।

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে ঘরমুখো মানুষ ও যাত্রীবাহী যানবাহনের চাপ ছিল। এই রুটে ছোট-বড় ১৬টি ফেরি দিয়ে যাত্রী ও যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে।