করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ঠেকাতে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক সপ্তাহ লকডাউনের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষকে যাতে সুরক্ষা দিতে পারি সেই ব্যবস্থাপনার ফাইলে কিছুক্ষণ আগে সই করে এসেছি। জানি, সবার একটু কষ্ট হবে। তারপরও বলব জীবনটা বড়, জীবনটা আগে। জীবন যদি না বাঁচে তাহলে আর অর্থনীতিই কী, রাজনীতিই বা কী।’
গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদের দ্বাদশ অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
করোনার নতুন ধরন প্রসঙ্গে সরকারপ্রধান বলেন, ‘এবারের ভাইরাসটা কতটুকু ক্ষতি করল তা চট করে বোঝা যায় না। কিন্তু হঠাৎ অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। এজন্য সাবধান থাকতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানার অনুরোধ জানাচ্ছি। কাজেই স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। মাস্ক পরতে হবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। বিয়েসহ সব অনুষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে। পর্যটন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিদেশ থেকে এলে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে।’ তিনি আরও জানান, শপিং মল বন্ধ থাকবে। তবে পণ্য অনলাইনে কেনাবেচা ও লোক মারফত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা তারা করতে পারবে। ১১ এপ্রিল নির্বাচন ছিল, তা স্থগিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু করার পরই মানুষ যেন ডেসপারেট (মরিয়া) হয়ে গেছে। তারা মনে করছে কিছুই হবে না। সবাই অবাধে চলাফেরা শুরু করে দিয়েছে। এই অবাধ চলাফেরা বন্ধ করতে হবে। আগে দেখেছি বয়স্করা সংক্রমিত হয়। এবার দেখছি তরুণ, এমনকি শিশুরাও সংক্রমিত হচ্ছে। তাদেরও সুরক্ষিত রাখতে হবে।’
সবাইকে সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসা, টিকা, ভ্যাকসিন সব ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি। এক দফা টিকা দিয়েছি। দ্বিতীয় ডোজ শুরু করব। আরও টিকা নিয়ে আসার ব্যবস্থা করব।’
কোথাও বের হলে ঘরে ফিরে গরম পানির ভাপ নেওয়ার পরামর্শও দেন প্রধানমন্ত্রী, ‘গারগল করবেন। এতে খুবই উপকার হয়। ভাইরাসটা নাকের ভেতর সাইনাসের ওখানে বাসা বাঁধে। নাকে ভাপ নিলে ও গারগল করলে ওটা দুর্বল হয়ে যায়।’
এছাড়া গতকাল আরেকটি অনুষ্ঠানে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যা যা করণীয় সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এনএসআইর নবনির্মিত প্রধান কার্যালয় ভবনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এ কথা বলেন তিনি।
এনএসআই সদস্যদের শেখ হাসিনা বলেন, ‘একটা বিষয় আপনাদের খেয়াল রাখতে হবে যে আমরা জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদক, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছি এবং এসব ব্যাপারে আপনাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে, যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। জনগণের জানমাল রক্ষা করা, জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যা যা করণীয় সেটা আপনাদের করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমি চাই এনএসআইর প্রতিটি সদস্য দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সততা, নিষ্ঠার সঙ্গে কর্তব্য পালন করবেন। আপনাদের কর্তব্য পালনের সময় যথাযথ শৃঙ্খলা বজায় রেখে আপনারা যদি আপনাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেন, অবশ্যই বাংলাদেশ আজকে উন্নয়নশীল দেশ, ইনশাআল্লাহ ২০৪১ সালের মধ্যে এই বাংলাদেশ হবে উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ।’ এনএসআইয়ের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
এনএসআই সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও কর্মকাণ্ডের কারণে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে রয়েছে’ এবং তার ফলে দেশে ‘অব্যাহত উন্নয়নের পরিবেশ বিরাজ’ করছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। মহামারী যে এখন বিশ্বব্যাপী একটি বিরাট সমস্যা, সে কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আবার নতুন করে দ্বিতীয় দফায় এ করোনা দেখা দিয়েছে। এ করোনা ব্যবস্থাপনাতেও আপনারা অতীতে অত্যন্ত পরিশ্রম করেছেন। বর্তমানে এখন যে অবস্থাটা হচ্ছে, সেখানেও আপনাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
তিনি বলেন, মহামারীর মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলেও বাংলাদেশ তার এখনো অর্থনীতির গতি সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে। প্রবৃদ্ধি অর্জনেও অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে অনেক এগিয়ে আছে। করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সরকার যেসব নির্দেশনা দিয়েছে, সেগুলোর কথা তুলে ধরে বলেন, ‘এসব নির্দেশ যাতে যথাযথভাবে পালিত হয়, সেদিকেও সবার দৃষ্টি দিতে হবে।’
দেশের মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেন সচল থাকে, সেজন্য সরকার যথেষ্ট সচেতন রয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষের জীবনটা আগে। কারণ জীবন যদি না বাঁচে তাহলে আর অর্থনীতিই কি, রাজনীতিই বা কি। কাজেই মানুষের জীবন আগে বাঁচাতে হবে। কাজেই স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং নিয়ম নীতিগুলো মেনে চলা এবং সেভাবে নিজেকে সুরক্ষিত করে অন্যকে সুরক্ষিত করা। এটা অবশ্যই সবাইকে করতে হবে।’
স্বাধীনতার পর জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এনএসআই গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থা ছিল মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার পর মার্শাল ল জারি করা হয় এবং একের পর এক সামরিক শাসকরা ক্ষমতায় আসে এবং এই সংস্থাটির গুরুত্বও অনেকটা হারিয়ে যায়। যার ফলে সংস্থাটাকে অন্যভাবে ব্যবহার করা হতো। সেটা হচ্ছে রাজনৈতিক নেতাদের দমন করা বা অন্য ধরনের কর্মকাণ্ডে। কিন্তু দেশের নিরাপত্তা বা জাতির নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই সংস্থার যে দায়িত্ব, সেটা অনেকটা সীমিত হয়ে পড়ে।’
গণভবনের অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস। গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকও যুক্ত ছিলেন অনুষ্ঠানে। এনএসআইর প্রধান কার্যালয় প্রান্তে সংস্থার মহাপরিচালক মেজর জেনারেল টিএম জোবায়েরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।