লকডাউনের প্রথম দিনে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত

লকডাউন ঘোষণার প্রভাবে বড় দরপতনের পরদিন সোমবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের পুঁজিবাজার। তবে রবিবারের দরপতনে প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৮১ পয়েন্ট হারালেও গতকাল পুনরুদ্ধার হয়েছে ৮৮ পয়েন্ট। আগের দিনের পতনের তুলনায় সূচকের বৃদ্ধি অনেক কম হলেও খুশি পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা। মূলত শেয়ার কেনায় মার্জিন ঋণসুবিধা বাড়ানো ও কয়েক দিনের দরপতনে বেশিরভাগ শেয়ার বিনিয়োগ অনুকূল দরে থাকায় উত্থানে ফিরেছে পুঁজিবাজার।

বড় দরপতনের পরদিন ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়ে বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, রবিবারের ব্যাপক দরপতনই সোমবার বাজার ঘুরে দাঁড়াতে বেশি সহায়তা করেছে। এর ব্যাখ্যায় তারা জানান, আতঙ্কে থাকা বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ আগেরদিন তাদের শেয়ার বিক্রি করেছেন। তাছাড়া লকডাউনের গুঞ্জনে গত দুই সপ্তাহ ধরে দরপতন হচ্ছিল। ফলে আতঙ্কে গতকাল শেয়ার বিক্রির পরিমাণ কম ছিল। উপরন্তু লেনদেন সময় অর্ধেকের বেশি কমিয়ে আনায় বিনিয়োগকারীদের ভাষায় ‘দীর্ঘ সময় বাজারকে বিশেষ সাপোর্ট’ দেওয়ার দরকার হয়নি। তাছাড়া মার্জিন ঋণের হার বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে ইতিপূর্বে মার্জিন ঋণে কেনা শেয়ার ফোর্সড সেল (বাধ্যতামূলক বিক্রি) করতে হয়নি ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংককে। ইতিপূর্বের দরপতনের ক্ষেত্রে মার্জিন ইস্যুটিও বড় কারণ ছিল।  দিনের শেষে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩২১ শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৩১টির দর বেড়েছে, দর হারিয়েছে ১৪টি এবং অপরিবর্তিত বা ফ্লোর প্রাইসে কেনাবেচা হয়েছে ৭৬টি শেয়ার। তবে ৫১ শেয়ারের কোনো লেনদেন হয়নি। অধিকাংশ শেয়ারের দর বৃদ্ধি পাওয়ায় ডিএসইএক্স ৮৮ পয়েন্ট বেড়ে ৫১৭৭ পয়েন্ট ছাড়িয়েছে। সূচক বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আগের দিন বড় পতনে সবগুলো খাত বাজার মূলধন হারালেও গতকাল ঠিক উল্টো চিত্র দেখা গেছে। ডিএসইর সবগুলো খাতের বাজার মূলধন বেড়েছে। এরমধ্যে সূচকের উত্থানে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে ব্যাংক, এনবিএফআই, টেলিযোগাযোগ, প্রকৌশল, জ¦ালানি, সিমেন্ট, বিবিধ, সেবা ও নির্মাণ খাত। এরমধ্যে ৪ শতাংশের বেশি বাজার মূলধন বেড়েছে সিমেন্ট এবং সেবা ও নির্মাণ খাতের।

অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) ১৮৫ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড কেনাবেচা হয়েছে। এর মধ্যে ১২২টির দর বেড়েছে, কমেছে ২৭টির এবং অপরিবর্তিত থেকেছে ৩৬টির দর। এ বাজারের প্রধান সূচক সিএসসিএক্স ১৫০ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেড়ে ৯০২৮ পয়েন্টে উঠেছে।

তবে শেয়ারদর বাড়লেও কমেছে লেনদেনের পরিমাণ। ডিএসইতে রবিবার ৫২১ কোটি ১৭ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা হলেও গতকাল তা নেমে আসে ২৩৬ কোটি ৬০ লাখ টাকায়। সিএসইতে কেনাবেচা হওয়া শেয়ারের বাজারমূল্য ছিল মাত্র ১৬ কোটি টাকা। লেনদেন কমার প্রধান কারণ লকডাউনের কারণে পুঁজিবাজারের লেনদেন আগের সাড়ে চার ঘণ্টার পরিবর্তে মাত্র দুই ঘণ্টায় নামিয়ে আনা হয়। তাছাড়া লকডাউনের কারণে ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোতে বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি ছিল হাতেগোনা। এর বাইরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কেউ কেউ সতর্ক বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আছেন।

গতকালের বাজারের উত্থান প্রসঙ্গে মার্চেন্ট ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, লকডাউন ঘোষণার পর রবিবারের দরপতন ছিল অনেকের কাছে কাক্সিক্ষত। এর আগেও লকডাউন গুজবে বেশ কয়েক দিন পতন হয়েছে বাজারে। ফলে বর্তমান অবস্থায় দরপতনের সুযোগ কমে গেছে। কারণ লকডাউনের কারণে মূল অর্থনৈতিক কর্মকা- বন্ধ হচ্ছে না। সব শিল্প-কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে। বিশেষত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কোনো তথ্য নেই। বরং অন্য ক্ষেত্রে ব্যবসা সংকুচিত হওয়ার কারণে মানুষের কাছে থাকা অলস টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আসার সম্ভাবনা আছে। এ কারণে শেয়ারদর বৃদ্ধির আশা করা যায়।

গতকাল বেশিরভাগ শেয়ারের দর বাড়লে শীর্ষে ছিল দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলো। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, লেনদেনের পরিমাণ কমে এলে দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ারে একশ্রেণির বিনিয়োগকারীর আগ্রহ দেখা যায়। গতকাল এমন চিত্রই দেখা গেছে।  

রবিবার ৪২ কোম্পানির শেয়ার ৯ শতাংশের ওপর দর হারালেও গতকাল মাত্র ছয় কোম্পানির শেয়ারদর ৯ শতাংশের ওপর বেড়েছে, যদিও এসব কোম্পানির সিংহভাগই ছিল দুর্বল মৌলভিত্তির। শেয়ারগুলো হলো- বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, এমারেল্ড অয়েল, অ্যাপোলো ইস্পাত, জুট স্পিনার্স, কেয়া কসমেটিক্স এবং তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ। গত কয়েক মাসের মতো গতকালও যথারীতি লেনদেনের শীর্ষে ছিল বেক্সিমকো লিমিটেড। এ কোম্পানির কেনাবেচা হওয়া শেয়ারের মূল্য ছিল ৩২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা রবির প্রায় ১৮ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে।