মিয়ানমারে সামরিক শাসনবিরোধী প্রায় দুই মাসের বিক্ষোভে মৃত্যুসংখ্যা সাড়ে ৫০০ ছাড়িয়েছে। প্রতিদিনই বিক্ষোভকারীদের মৃত্যু হচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে। এরপরও দমে যায়নি গণতন্ত্রপন্থিরা। সাধারণদের এই বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দিতে শুরু করেছে দেশটির বিভিন্ন সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন। গত শনিবার এমন ১০টি শীর্ষ বিদ্রোহী সশস্ত্র সংগঠন চলমান সেনাবিরোধী বিক্ষোভে তাদের সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশটিতে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে। সে কারণে দেশটির প্রায় ১২টির বেশি সংখ্যালঘু জাতিসত্তা আছে চরম ঝুঁকির মুখে। গৃহযুদ্ধ শুরু হলে এদের অবস্থাও হয়তো রোহিঙ্গাদের মতোই হবে বলে মনে করছেন অনেকে।
টানা দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা জান্তাবিরোধী বিক্ষোভ ও সহিংসতার কারণে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা আগেই দেশটিতে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা প্রকাশ করেন। দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের সাংবাদিক ক্রিস ব্যারেট কয়েকদিন আগে এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। এরপরে জাতিসংঘও একই আশঙ্কা প্রকাশ করে যত দ্রুত সম্ভব সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিল। গত সপ্তাহে মিয়ানমারে নিযুক্ত জাতিসংঘের বিশেষ দূত ক্রিসটিন স্ক্র্যানার বার্গেনার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে ক্রমবর্ধমান সংকটের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নিরাপত্তা পরিষদে। তিনি মিয়ানমারের চলমান সংকটের কারণে গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এছাড়া গত রবিবার ব্যাংকক পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার মিয়ানমারের ১০টি বিদ্রোহী সংগঠন ভার্চুয়াল বৈঠকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে। তারা বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তারক্ষীদের গুলি চালানোর নিন্দা করে। তাদের এক নেতা জানান, তারা দৃঢ়ভাবে জনগণের সঙ্গে রয়েছেন এবং দেশে স্বৈরশাসনের অবসান চান।
সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটিতে দীর্ঘদিন থেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে জাতিগত বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর সংঘাত চলছে। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর বিস্তৃত এলাকা এসব বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিদ্রোহী সংগঠন তাদের সমর্থনের কথা ঘোষণা করায় মিয়ানমারে সেনাবিরোধী বিক্ষোভ আরও বিস্তার লাভ করতে পারে।
এর মধ্যেই গতকাল সোমবার তুরস্কভিত্তিক ডেইলি সাবাহ এক প্রতিবেদনে বিদ্রোহী ওইসব গোষ্ঠীসহ সংখ্যালঘুদের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সংবাদমাধ্যমটি বলছে, সামরিক জান্তা শুধু গুলি করে মানুষ হত্যা করছে এমন নয়, তারা একইসঙ্গে আকাশ থেকে বোমা হামলা চালাচ্ছে থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে। এর ফলে ওইসব গ্রামের ভীতসন্ত্রস্ত লোকজন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে যাচ্ছেন থাইল্যান্ডে। কিন্তু থাই কর্র্তৃপক্ষ তাদের আশ্রয় না দিয়ে পুশব্যাক করছে। নিরুপায় এসব মানুষ দেশে ফিরে বাংকার খুঁড়ে তাতে অবস্থান নিচ্ছেন।
অন্যদিকে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের মধ্যবর্তী স্থানে কয়েক হাজার মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। তারা দেশ থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু থাইল্যান্ড তাদের ফিরিয়ে দিয়েছে। এখন তাদের খাবার নেই। পানি নেই।
ফলে এখন তাদের জন্য একটাই পথ খোলা- সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ। চারদিকে এক গৃহযুদ্ধের দামামা। সামরিক জান্তা হত্যাসহ দমন-পীড়ন নৃশংসতা অব্যাহত রাখার ফলে দেশটির নিরীহ জনগণ এখন গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার হুমকিতে আছে।
মিয়ানমারে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে বিক্ষোভের পাশাপাশি ধর্মঘট-অসহযোগের মতো আন্দোলন চলছে। ব্যাংক-বীমা, হাসপাতাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন কলকারখানার শ্রমিকরা কাজ বাদ দিয়ে নেমেছেন রাস্তায়। চ্যানেল নিউজ এশিয়া নামে একটি সংবাদমাধ্যম এইসব অসহযোগ আন্দোলনকে নীরব বিপ্লব হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
গত ১ ফেব্রুয়ারি অং সান সু চি’র নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। এরপর থেকে সেখানে অভ্যুত্থানবিরোধী আন্দোলন করে আসছেন গণতন্ত্রকামীরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে হত্যা, আটক ও নির্যাতনের মাধ্যমে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করছেন নিরাপত্তারক্ষীরা। স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে সেনাবিরোধী বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ৫৫০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।