এবার হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগরীর সাধারণ সম্পাদক মামুনুল হকের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন তার কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীর বড় ছেলে আবদুর রহমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুক লাইভে এসে তিনি তিন মিনিট দুই সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে মামুনুল হক সম্পর্কে ক্ষোভ প্রকাশ করে তার বিচার দাবি করেন। পাশাপাশি আবদুর রহমান তার মা-বাবার বিচ্ছেদ ও তাদের পরিবার ধ্বংসের জন্য সরাসরি মামুনুল হককে দায়ী করে বলেন, তার (মামুনুল) প্রতি আমার বাবার অন্ধ বিশ্বাস ছিল। যা আজ আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এ সময় তিনি মামুনুল হককে মামুনুলকে ‘জানোয়ার’ বললেন কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীর ছেলে ‘মুখোশধারী জানোয়ার’ আখ্যা দেন। এদিকে মামুনুল রয়েল রিসোর্টে কক্ষ ভাড়া করার সময় তার প্রথম স্ত্রীর নাম ব্যবহার করেন বলে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। অন্যদিকে গত শনিবার সোনারগাঁর রয়েল রিসোর্টে মামুন ও তার কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীকে অবরুদ্ধ-পরবর্তী ঘটনার জের ধরে প্রত্যাহার করা হয়েছে সোনারগাঁ থানার ওসি রফিকুল ইসলামকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মামুনুলের পক্ষে সাফাই গাওয়ায় কুষ্টিয়ার ইন সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে কর্মরত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) গোলাম রাব্বানীকেও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
মামুনুল হকের কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাত আরা ঝর্ণার দুই সন্তান আবদুর রহমান ও তামিম তাদের বাবার সঙ্গে খুলনায় থাকেন। ভিডিওতে বক্তব্যরত ছেলেটি আবদুর রহমান বলে জান্নাত আরা ঝর্ণার মা সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন। ঝর্ণার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গার কামারগ্রামে। আবদুর রহমানের নানার নাম ওয়ালিউর রহমান ওরফে ওলি মিয়া আর ঝর্ণার মায়ের নাম শিরিনা বেগম। ঝর্ণার বাবা ওয়ালিউর রহমান সাংবাদিকদের জানান, আবদুর রহমান তার নাতি এবং সে খুলনায় থাকে।
হেফাজত নেতা মামুনুল সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবদুর রহমান বলেন, ‘আমি তো অলরেডি বড় হয়ে গেছি, অনেক কিছু শিখছি, জানছি, ম্যাচুরিটির একটা ভাব আইছে। আমি কিছুটা সহ্য করে নিতে পারি, কিন্তু আমার তো একটা ছোট ভাই আছে, ১৩-১৪ বছর বয়স। কেবল উঠতি বয়স। এই সময়ে মানুষের কত কথা শোনা লাগতেছে। সমাজের সামনে আইসা মুখ দেখাইতে পারতেছি না। আমার ছোট ভাইটা কাল রাতে যখন এই ঘটনাটা ঘটল, কোনোদিন আমি দেখি নাই রাত ৩-৪টা পর্যন্ত জাইগা রইছে। কাল দেখি ওর চোখে কোনো ঘুম নাই। ও বিষয়টা নিয়ে টোটালি মেন্টালি শকড হইছে। ও বাসা থেকে বের হয়ে গেছিল। বাসায় থাকলে কী উল্টা-পাল্টা করব আমি নিজেও জানি না, এইটা বইলা বের হয়ে গেছে।’
আবদুর রহমান এমন ঘটনার জন্য মামুনুল হকের প্রতি তার বাবার অন্ধ বিশ্বাসকে দায়ী করেন বলেন, ‘আমার বাবা মানুষকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে। পাগলের মতো ভালোবাসে। ওই লোকটার কিছুদিন আগে মোল্লারহাটে একটা মাহফিল ছিল। সেখানে পুলিশ তাকে মাহফিল করতে দেবে না। সে একটা জায়গায় লুকিয়ে ছিল। আমার বাবা সেটা দেখে আইসা কীভাবে যে কাঁদছে। তার আগেই বিষয়টা আমি জানছি যে, আমার মায়ের সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক ছিল। আমি তখন হাসতে ছিলাম যে, এই লোকটা যার জন্য অঝোর ধারায় কাঁদতেছে আর ওই লোকটা (মাওলানা মামুনুল হক) এই লোকটার (বাবা শহীদুল ইসলাম) সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতেছে। তারপরে যখন ওনাকে (মামুনুল) জেলে নিল, মাওলানা মামুনুল হককে জেলে নিল, তখন আমার বাবা থানার ওসি কামরুজ্জামানকে বলে যে, আমাকে রেখে ওনাকে ছেড়ে দেন। কতটা ভালোবাসলে একটা মানুষকে এই কথা বলতে পারে। আর সেই লোকটা কীভাবে গাদ্দারি করল।’
আবদুর রহমান তার ভিডিওতে আরও বলেন, ‘আরও আগের ঘটনা যখন ডিভোর্স হয়নি, আমি তখন অনেক ছোট। আমার ছোট ভাই আরও অনেক ছোট, দুগ্ধশিশু ছিল। তখন আমার বাবা বাসায় ছিল না। তখন আমি ছিলাম। আমি ঘুমায়া ছিলাম নাকি বাইরে ছিলাম। আমার মা নাকি আমার ছোট ভাইকে দুগ্ধ পান করাচ্ছিল, তখন উনি আমার মায়ের রুমে ঢুকে আপত্তিকর প্রস্তাব দেয়। কিন্তু আমার মা সেটা প্রত্যাখ্যান করেছিল, না এটা কোনো দিনই সম্ভব না। আপনি তো ঠকাচ্ছেন, আপনার কাছের বন্ধুকে, মানুষটাকে। সে তখন ফিরে এসেছিল।’
আবদুর রহমান আরও বলেন, ‘যখনই সুযোগ পাইছে মামুনুল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ডিসট্যান্স বাড়াইয়া দিছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তো ঝগড়া হবেই। সে তখনই নক করছে। তখন দুজনের মধ্যে আরও ডিসট্যান্স বাড়াইয়া দিছে। এইভাবে করে সে একটা পরিবারের খুশি, ভালোবাসা, একটা পরিবারের মধ্যে যে মিলমিশ সম্পর্ক পুরোপুরি সে ধ্বংস করে দিছে। আরও যে এভাবে কত মানুষের, কত পরিবারের ভালোবাসা যে ধ্বংস করে দিছে এর কোনো ঠিক নাই।’
মামুনুল হকের এমন কাণ্ডে দেশবাসীর কাছে বিচার চান আবদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের মানুষের কাছে আশা করব, এর যেন সঠিক বিচার হয়। আপনারা কারও অন্ধ ভক্ত হয়েন না। কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস কইরেন না। কারণ সবারই আড়ালে আরেকটা চেহারা থাকে। এই লোকটা আলেম নামধারী মুখোশধারী একটা জানোয়ার। তার মধ্যে কোনো মনুষ্যত্ব নেই। সে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে কাকে কীভাবে দুর্বল করা যায়। আমার আর কিছু বলার ভাষা নাই।’
কক্ষ ভাড়ায় প্রথম স্ত্রীর নাম লেখেন মামুনুল : রয়েল রিসোর্টের কক্ষ ভাড়ার সময় মামুনুল হক রেজিস্ট্রারে নিজের নাম-ঠিকানা সঠিক লিখলেও তার কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম লুকিয়েছেন। মামুনুল হকের কথিত সেই দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম জান্নাত আরা ঝর্ণা হলেও মামুনুল রিসোর্টের নথিতে তার নাম উল্লেখ করেছেন আমেনা তাইয়্যেবা। জানা গেছে, আমেনা তাইয়্যেবা মামুনুল হকের প্রথম স্ত্রীর নাম। তিনি চার সন্তানের জননী। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমরা শুনতে পেরেছি তার (মামুনুল) আসল স্ত্রীর নাম আমেনা তাইয়্যেবা। বিষয়টির তদন্ত করছি।’
সোনারগাঁ থানার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, শনিবার বেলা ২টার দিকে সাদা রঙের একটি গাড়ি নিজেই চালিয়ে রিসোর্টটিতে যান মামুনুল। ভাড়া করেন এক্সিকিউটিভ ডিলাক্স (সেমি সুইট) কক্ষ। এই কক্ষগুলোর ভাড়া এমনিতে ১০ হাজার টাকা। সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আর ১০ শতাংশ সার্ভিস চার্জ যুক্ত হয়। তবে রিসোর্ট কর্র্তৃপক্ষ ডিসকাউন্ট করে মামুনুল হককে ৭ হাজার টাকায় ভাড়া দেয়।
রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ বকুল বলেন, অভ্যর্থনার কর্মীরা মামুনুলের কাছে তার সঙ্গিনীর পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেছেন তার স্ত্রী, নাম আমেনা তাইয়্যেবা। মামুনুল কক্ষ ভাড়া করার সময় নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপিও জমা দেন। হেফাজত নেতা ১২ ঘণ্টার জন্য ভাড়া করে যান ৫০১ নম্বর কক্ষটি। সেখানে এক ঘণ্টা অবস্থানের পর মামুনুল খাবারের অর্ডার করেন। এরপর সাড়ে ৫টার দিকে শুরু হয় হাঙ্গামা। পরে হেফাজতের কর্মীরা তাণ্ডব চালিয়ে মামুনুলকে নিয়ে যায়।
সোনারগাঁ থানার ওসি প্রত্যাহার, বিজিবি মোতায়েন : সোনারগাঁ প্রতিনিধি জানান, সোনাগাঁয়ে রয়েল রিসোর্টে মামুনুলকে অবরুদ্ধ করার পরবর্তী সময়ে হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনার জেরে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত রবিবার মধ্যরাতে সোনারগাঁ থানা থেকে প্রত্যাহার করে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ লাইনে তাকে সংযুক্ত করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রবিবার বিকেল থেকে এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পাঁচ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন রয়েছে।
নারায়ণঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোস্তাফিজুর রহমান থানার ওসি প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ওসি রফিকুল ইসলামকে জনস্বার্থে বদলি করা হয়েছে।
গত বছর ৫ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা থেকে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলমের নির্দেশে সোনারগাঁ থানার ওসির দায়িত্ব পান রফিকুল ইসলাম। সোনারগাঁ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) খন্দকার তবিদুর রহমান বলেন, ওসি রফিকুল ইসলাম রবিবার রাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন। এখন পর্যন্ত নতুন ওসি যোগদান করেননি।
মামুনুলের পক্ষে সাফাই এএসআই প্রত্যাহার : কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, মামুনুলের পক্ষে সাফাই গাওয়ায় কুষ্টিয়ার ইন সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে কর্মরত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) গোলাম রাব্বানীকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে একটি রিসোর্টে কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীসহ অবরুদ্ধ হওয়ার ঘটনায় তিনি হেফাজত নেতা মামুনুল হকের পক্ষে সাফাই গেয়ে ফেইসবুক লাইভে এসে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন।
কুষ্টিয়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অপেশাদার আচরণ করায় ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার ও ইন সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্ট তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। পুলিশি এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তিন দিনের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর এএসআই গোলাম রব্বানীর বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে গতকাল সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে গোলাম রাব্বানীর ৬ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের বক্তব্যের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। বক্তব্য দেওয়ার সময় তার পুলিশের পোশাক পরা ছিল। তার গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরে। তিনি পার্বতীপুর ডিগ্রি কলেজের ছাত্র ছিলেন এবং কনস্টেবল থেকে এএসআই পদে পদোন্নতি পান।
সুনামগঞ্জে যুবলীগ নেতার জামিন : এদিকে মামুনুলকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করায় গ্রেপ্তার যুবলীগ নেতা এমদাদ আহমেদ ওরফে জয়েরকে (২৮) জামিন দিয়েছে আদালত। এর আগে গতকাল তাহিরপুর থানা পুলিশ একটি মামলা দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়। এমদাদ তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের ভোলাখালী গ্রামের প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা জজ মিয়ার ছেলে। তিনি ইউনিয়ন যুবলীগের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক। এমদাদ তার ফেইসবুক পেজে আপত্তিকর মন্তব্য করায় গত রবিবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
নারায়ণগঞ্জের এসপির নামে ভুয়া স্ট্যাটাস : মামুনুল হককে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলমের নাম ব্যবহার করে একটি স্ট্যাটাস ফেইসবুকে ভাইরাল হয়েছে। গতকাল দুপুরে ওই ভুয়া স্ট্যাটাসের প্রতিবাদ জানিয়ে ‘জেলা পুলিশ নারায়ণগঞ্জ’ ফেইসবুক আইডি থেকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম। তিনি অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে বলেন, সম্প্রতি ফেইসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপারের বরাত দিয়ে হেফাজত ইসলামের নেতা মামুনুল হককে নিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে পুলিশ সুপার নারায়ণগঞ্জ এ ধরনের কোনো বিবৃতি প্রদান করেননি। পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম জানান, যারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে আমরা তাদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছি। জনসাধারণকে এরকম বিভ্রান্তিকর তথ্য যাচাই না করে কোনোরকম মন্তব্য বা শেয়ার থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেছি।