হেফাজতের তান্ডব

বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুরকারী সেই যুবক গ্রেপ্তার

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের তান্ডবের সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল শাবল চালিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে আলোচিত মো. আরমান আলিফকে (২২) অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে চালানো ওই তান্ডবের ৮ দিনের মাথায় গত রবিবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বিশ্বরোড এলাকা থেকে তাকে আটক করে র‌্যাব-১৪-এর ভৈরব ক্যাম্পের সদস্যরা। গতকাল সোমবার বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য জানিয়েছেন র‌্যাব-১৪-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আবু নাঈম মো. তালাত। গ্রেপ্তার আরমান আলিফ নাসিরনগর উপজেলার ফুলকাকান্দি গ্রামের শুকুর মিয়ার ছেলে।

র‌্যাব কর্মকর্তা আবু নাঈম মো. তালাত জানান, গত রবিবার রাত ৯টার দিকে আলিফকে আটকের পর তার দেওয়া তথ্যমতে জেলা শহরের কাজীপাড়া মহল্লার ভাড়া বাসা থেকে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুরের কাজে ব্যবহার করা শাবলটি উদ্ধার করা হয়। এছাড়া তার বাসা থেকে একটি পিস্তল ও দুটি ম্যাগাজিন এবং চার রাউন্ড গুলিও উদ্ধার করা হয়।

তিনি আরও জানান, ভিডিও ফুটেজ ও ছবি দেখে আরমানকে শনাক্ত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙার পর তার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে বুঝতে পেরে নিজেকে লুকানোর জন্য চুল কেটে খুব ছোট করে ফেলে এবং গায়ের পোশাক পরিবর্তন করে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে আরমান। র‌্যাব কর্মকর্তা আবু নাঈম মো. তালাত বলেন, ‘আরমান নাশকতামূলক আর বেশ কিছু কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছে। তার দলীয় পরিচয় ও তার ব্যাপারে আরও তথ্য উদ্ধারে আমরা তদন্ত চালু রেখেছি। তাকে গ্রেপ্তারে র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা ইউনিটও সহায়তা করেছে। আরমানের সঙ্গে ভিডিওতে যাদের ভাঙচুরে দেখা যাচ্ছে তাদেরও গ্রেপ্তার করা হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১৪-এর ভৈরব ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার রফিউদ্দিন মো. যোবায়ের বলেন, ‘আরমান খুবই চালাক প্রকৃতির। ঘটনার পরপরই সে তার এলাকায় চলে যায়। র‌্যাব নজরদারি বাড়ালে সে এখানে-সেখানে পালাতে চেষ্টা করে। অবশেষে পালিয়ে যাওয়ার জন্য বিশ্বরোড মোড়ে এলে তাকে আটক করা হয়।’

গত ২৮ মার্চ হেফাজতের হরতালের সময় হেফাজত সমর্থকরা শহরের বঙ্গবন্ধু স্কয়ারে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগসহ সারা শহরের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে তা-ব চালায়। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙার ভিডিও ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালে চরম জিঘাংসা নিয়ে আরমানের শাবল চালানোর ছবি ভাইরাল হলে ফেইসবুকে অনেকে তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করেন।

ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও ঘটনার উৎস সন্ধানে তদন্ত কমিটি : গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে এবং ২৮ মার্চ হেফাজতের হরতালের দিনে হেফাজত সমর্থকদের তা-বের ঘটনায় পুলিশের তদন্তকাজ এগিয়ে চলছে। ওই তা-বের উৎস অনুসন্ধান, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও জড়িতদের ব্যাপারে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে কাজ করছে পুলিশ সদর দপ্তর গঠিত এই তদন্ত কমিটি। গতকাল দুপুরে তিন সদস্যের এই তদন্ত কমিটি হেফাজতি তা-বে ক্ষতিগ্রস্ত প্রেস ক্লাব পরিদর্শন করে।

তদন্ত দলের প্রধান চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. জাকির হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা গত ২ এপ্রিল থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত ৪০টি স্থানে আমরা পরিদর্শন করে তদন্তকাজ চালিয়েছি। প্রতিটি স্থান ও ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, স্টিল ছবি সংগ্রহ করেছি। প্রত্যেকটি স্থানের প্রত্যক্ষদর্শী ও কর্র্তৃপক্ষের বক্তব্য নিয়েছি। আমরা ঘটনার উৎস অনুসন্ধান, কারা হামলা করেছে, ক্ষয়ক্ষতির ধরন ও পরিমাণ নিয়ে কাজ করছি। কর্র্তৃপক্ষের নির্দেশে ৭ কার্যদিবসেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

হেফাজতি তা-বে ভাঙচুর প্রেস ক্লাব পরিদর্শনে হেফাজত নেতারা : হেফাজতি তা-বে ক্ষতিগ্রস্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাব পরিদর্শন করেছেন হেফাজতে ইসলামের ব্রাহ্মণবাড়িয়া শাখার নেতারা। গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসা থেকে তারা প্রেস ক্লাব পরিদর্শনে আসেন। এরপর নেতারা প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে বসে হেফাজত সমর্থকদের হামলায় আহত প্রেস ক্লাব সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন জামিকে সমবেদনা জানান। এ সময় হেফাজত নেতারা প্রেস ক্লাব ভাঙচুর, প্রেস ক্লাব সভাপতিসহ সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন। প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জাবেদ রহিম বিজন ক্লাবে ভাঙচুরের বর্ণনা দেন। এরপর ক্লাবের সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন জামি তার ওপর চালানো হামলার বিষয়টি হেফাজত ও মাদ্রাসা নেতাদের কাছে তুলে ধরেন।

এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন হেফাজত নেতা মাওলানা আলী আজম, মাওলানা বোরহার উদ্দিন কাসেমী, আল্লামা নোমান হাবিবী, মুফতি এনামুল হাসান, মাওলানা মো. জাকারিয়া, মাওলানা তানভীর আহমেদ ও মাওলানা এরশাদুল্লাহ কাসেমী প্রমুখ।