করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি রুখতে সরকার ঘোষিত কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও দোকানপাট খোলা রাখার দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার তৃতীয় দিনের মতো রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তারা দিনের নির্দিষ্ট সময় সরকারের বিধিবদ্ধ স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকানপাট খোলা রাখতে চান। তবে ব্যবসায়ীরা যখন দোকানপাট খোলা রাখার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন তখন গতকাল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অভিযান চালিয়ে দোকানপাট বন্ধ করে দিতে দেখা যায়। এ নিয়ে দোকান মালিক-কর্মচারীদের সঙ্গে অভিযানে অংশ নেওয়া লোকজনের বাগ্বিতণ্ডায় লিপ্ত হতে দেখা যায়।
শপিং মল ও দোকানপাট খুলে দেওয়ার দাবিতে গতকাল রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় বিক্ষোভ ও মিরপুরে মানববন্ধন করেছেন সাধারণ দোকানিরা। এ সময় তারা দিনের নির্দিষ্ট সময় সরকারের বিধিবদ্ধ স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকানপাট খোলা রাখার দাবি জানান। এর বিপরীতে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ, ঢাকা জেলা প্রশাসন এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আলাদা আলাদা অভিযান চালিয়ে দোকানপাট বন্ধ করে দেয়। এ সময় দোকান মালিক-কর্মচারীদের সঙ্গে অভিযানে অংশ নেওয়া লোকজনের বাগ্বিতণ্ডায় লিপ্ত হতে দেখা যায়।
করোনাজনিত বিধিনিষেধের মধ্যে দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে গতকাল তৃতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ করেছেন নিউ মার্কেট, গাউছিয়া মার্কেট, চাঁদনী চক, নীলক্ষেতসহ আশপাশ এলাকার ব্যবসায়ীরা। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চাঁদনী চক শপিং কমপ্লেক্সের সামনে বিক্ষোভ করেন তারা। বিক্ষোভকারীরা দিনের নির্দিষ্ট একটা সময় সরকারের বিধিবদ্ধ স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান ও শপিং মল খোলা রাখার দাবি জানান। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকারের বিধিনিষেধের কারণে ওষুধের দোকান ও কাঁচাবাজার ছাড়া অন্যান্য দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
চাঁদনী চক মার্কেটের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইব্রাহিম মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলে, ‘গত বছর আমরা দোকান চালাতে পারিনি। অনেকের পুঁজি শেষ। ঋণ ও ধার-দেনা করে দোকানে মাল তুলেছি। সামনে বাংলা নববর্ষ ও ঈদ মৌসুম। আমরা দোকানদারি করতে না পারলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান টিকবে না। আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান না টিকলে দেশও টিকবে না। আমরা নির্দিষ্ট একটা সময় দোকান ও শপিং মল খোলা রাখতে চাই। রমজানে দোকান খোলা না থাকলে কী হবে, জানি না। গত বছরের ক্ষতিই পুষিয়ে উঠতে পারিনি।’
চাঁদনী চক বিজনেস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন বলেন, ‘গত বছর করোনার কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ধাক্কা জানুয়ারি মাস থেকে একটু একটু করে সামলে ওঠার চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরা। আমাদের বিক্রি করা বস্ত্র পাইকারি বিক্রেতাদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে যাবে। তারপর ক্রেতারা কিনবেন, এরপর টেইলরের কাছে বানাতে দেবে। আমাদের ভরা মৌসুম। অথচ দোকান খুলতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। থ্রি-পিস এবং অন্যান্য জামা ১০ থেকে ১৫ রোজার পর আর বিক্রি হয় না। কারণ টেইলরের কাজ থাকে পরে। টেইলর যদি অর্ডার নেওয়া বন্ধ করে দেন, তখন আর কাপড়ও কেউ কিনবে না।’
মার্কেট খুলে দেওয়ার দাবিতে রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর মোড়ে গতকাল বিক্ষোভ করেছেন ব্যবসায়ীরা। দুপুর ১২টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত মানববন্ধন করেন তারা। এর আগে ওই এলাকার বিভিন্ন সড়কে দোকান খোলা রাখার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন ব্যবসায়ীরা। এ সময় প্রায় আধা ঘণ্টা মিরপুর ১ ও এর আশপাশ সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। মিরপুর ১ নম্বর এলাকায় কো-অপারেটিভ মার্কেটের ব্যবসায়ী আনোয়ার খান বলেন, ‘সরকার বিধিনিষেধ দিলেও অফিস-আদালত, বইমেলা, শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে অনেক কিছুই খোলা রেখেছে। অথচ দোকান খোলা রাখতে পারছে না।’
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পুলিশ, ঢাকা জেলা প্রশাসন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মোবাইল কোর্ট ও এলাকায় বিট পুলিশের সদস্যদের বিভিন্ন মার্কেট ও পাড়া-মহল্লায় অভিযান চালাতে দেখা যায়। দুপুর ১২টার দিকে বিজয়নগর এলাকায় অভিযানকারী দলের সঙ্গে দোকানদাররা বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।
সিলেটে ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ : সিলেট নগরীতে গতকাল বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। দুপুরে সিলেটের সর্বস্তরের ব্যবসায়ীদের ব্যানারে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয় নগরীর কোর্ট পয়েন্টে। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ী-কর্মচারীরা খ- খ- মিছিল করেছেন। সমাবেশে ব্যবসায়ীরা বলেন, লকডাউন ঘোষণা করে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন। মার্কেট-শপিং মল বন্ধ রেখে অন্য সবকিছু খোলা রাখা হয়েছে। এটা তাদের প্রতি অবিচার।
নারায়ণগঞ্জে ব্যবসায়ীদের মানববন্ধন : ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। গতকাল দুপুরে শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে এ মানববন্ধন করেন তারা। এ সময় ব্যবসায়ীরা বলেন, কয়েক দিন পরই আসছে রমজান মাস। রমজান উপলক্ষে তারা লাখ লাখ টাকার দেশি ও বিদেশি পণ্য আমদানি করেছেন। কিন্তু সরকারের দেওয়া ‘লকডাউন’ চলতে থাকলে তারা পথে বসবেন।
সদর থানার ওসি শাহ জামান বলেন, ‘লকডাউন প্রত্যাহারের দাবিতে চাষাড়ায় ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন করেছে। খবর পাওয়ামাত্র বিক্ষোভকারীদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।’
সাভারে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ : সাভারে মার্কেট খুলে দেওয়ার দাবিতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন ব্যবসায়ীরা। এ সময় মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। গতকাল দুপুরে সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে প্রায় এক ঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন তারা। পরে পুলিশ তাদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
সিরাজগঞ্জে ব্যবসায়ী-কর্মচারীদের মানববন্ধন, বিক্ষোভ : স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান খোলার দাবিতে সিরাজগঞ্জ শহরের এসএস রোড়ের বড় বাজার এলাকায় গতকাল বেলা ১১টার দিকে দোকান মালিক ও কর্মচারীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। সিরাজগঞ্জ শহর ব্যবসায়ী সমিতি এ কর্মসূচির আয়োজন করে। কর্মসূচিতে শহরের সর্বস্তরের ব্যবসায়ীরা অংশগ্রহণ করেন। মানববন্ধন শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল সিরাজগঞ্জ শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড় প্রদক্ষিণ করে।
কুমিল্লা ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ : কুমিল্লায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকানপাট খোলা রাখার দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা রাস্তায় অবস্থান করে ব্যবসা পরিচালনার দাবি জানিয়ে মানববন্ধন করেন। গতকাল সকাল ১০টা থেকে কুমিল্লা নগরীর বৃহৎ মার্কেটগুলোর সামনে ও সড়কে অবস্থান করেন ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা। কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড়, মনোহরপুর, শাসনগাছা, সাত্তারখান কমপ্লেক্স, ইস্টার্ন প্লাজার সামনে অবস্থান করে দোকান মালিক-কর্মচারীরা বিক্ষোভ করেছেন।
মির্জাপুরে ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ : টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে দ্বিতীয় দিনের মতো ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। গতকাল বেলা ১২টার দিকে মির্জাপুর বাজারে তারা এই বিক্ষোভ মিছিল করেন।
সিদ্ধিরগঞ্জে মানববন্ধন : সিদ্ধিরগঞ্জে মার্কেট খুলে দেওয়ার দাবিতে সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখেই গতকাল বেলা ১১টার দিকে শিমরাইল মোড় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মানববন্ধন করেন কয়েক শতাধিক ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীরা মহাসড়কে আধা ঘণ্টা পর্যন্ত মানববন্ধন করলেও প্রশাসনিকভাবে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি।
বরিশালে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকানপাট খোলার দাবি : বরিশালে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নির্দিষ্ট সময়ে দোকানপাট খোলা রাখার দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন ব্যবসায়ী ও দোকান শ্রমিকরা। শুরুতে বরিশাল চকবাজার এলাকার ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে ওই বিক্ষোভে নগরের অন্যান্য ব্যবসায়ী যোগ দেন। এ সময় তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে দোকানপাট খোলা রাখার দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। পরে পুলিশ এসে তাদের নিবৃত্ত করেন।