বিধিনিষেধে চার দিনে তিন পরিবর্তন

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের উচ্চ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা তো যাচ্ছেই না। বরং প্রতিদিন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। মার্চের শুরু থেকেই দেশ করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে প্রবেশ করে। শুরুর দিকে সংক্রমণ ও মৃত্যুর গতি কিছুটা কম ছিল। কিন্তু মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে। আর এপ্রিলের প্রথম দিন থেকে আক্রান্তের হার এবং মৃত্যু বাড়তে থাকে আশঙ্কাজনকভাবে। এ পর্যায়ে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে গঠিত কারিগরি ও বিশেষজ্ঞ কমিটির পক্ষ থেকে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিতে সরকারের কাছে জনসমাগম বন্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ দেয়।

এর মধ্যে মার্চের শেষদিক থেকেই হাসপাতালে করোনা রোগীর চাপ বাড়তে থাকে। দেখা দেয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এবং হাসপাতালের বেড সংকট। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তর থেকে তাদের অপারগতার বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে জানানো হয়। জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার প্রতিটি বক্তব্যেই অনুরোধ করেন। জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হতে বলা হয়। এরপর পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে গত ৫ এপ্রিল সোমবার থেকে দেশে এক সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণা করে সরকার। এজন্য গত ৪ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১১ দফা নির্দেশনা জারি করে।

কিন্তু নির্দেশনার প্রথম দিন থেকেই দেশব্যাপী বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখা দেয়। বেসরকারি অফিস সীমিত আকারে খোলার নির্দেশনা থাকায় দেখা দেয় পরিবহন সংকট। ফলে প্রথম দিনের পর দ্বিতীয় দিনই সরকারের প্রজ্ঞাপনে পরিবর্তন এনে ১১ সিটি করপোরেশনে গণপরিবহন চলার আদেশ আসে। লকডাউন বা সরকারের এ বিধিনিষেধের শিথিলতায় ব্যবসায়ী ও রাইডশেয়ারিং হোল্ডাররা বিক্ষোভ শুরু করে। বিশেষ করে বইমেলা খোলা রেখে দোকানপাট বন্ধ রাখার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয় সারা দেশে। ফলে গতকাল বৃহস্পতিবার লকডাউনের চার দিনের মাথায় আবারও সরকারি প্রজ্ঞাপনে পরিবর্তন আসে। আজ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত দোকানপাট সকাল ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত খোলার রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

এদিকে গতকাল ছিল দেশে করোনায় মৃত্যুর রেকর্ড। এ পরিস্থিতিতে পুরো লকডাউন না নিয়ে বিধিনিষেধ আরও শিথিল করে প্রজ্ঞাপন দেওয়ায় জনস্বাস্থ্যবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বিস্ময় প্রকাশ করেন। তারা বলেন, এ বিধিনিষেধের গলদের কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়বে। তারা এ বিধিনিষেধের প্রজ্ঞাপন তৈরির পরিকল্পনায় ভুল রয়েছে বলে সমালোচনা করেন। তারা বলেন, পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায় এমন পরিকল্পনা নিতে হবে। না হয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়।

তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী রবি বা সোমবার নতুন প্রজ্ঞাপন আসতে পারে। সেখানে কঠোর বিধিনিষেধ আসবে এবং প্রয়োজনে সাধারণ ছুটি ঘোষণা হতে পারে। গতকাল বিসিএস প্রশাসনের একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীও সামনে কঠোর কর্মসূচি আসতে পারে এমন ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এছাড়া জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনও বলেছেন, সবকিছু বিবেচনা করে রবিবার পরিকল্পিত নির্দেশনা আসবে।

জানা গেছে, গত চার দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এই ঢিলেঢালা নির্দেশনায় অন্যান্য মন্ত্রণালয় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে এবার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. বে-নজির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ বিধিনিষেধ যে কতটা অপরিপক্ব তা প্রথম দিন থেকেই স্পষ্ট হয়েছে। দেশে যখন প্রথমবারের চেয়ে খারাপ অবস্থা তখন এ ধরনের আধাপাকা সিদ্ধান্ত আমরা আশা করি না। এটা এখন হাস্যকর হয়ে উঠছে। এটার সঙ্গে কোনো জনপ্রতিনিধি যুক্ত নেই। মন্ত্রী, মন্ত্রণালয় বা এমপিরা নেই। তারা তাদের পছন্দমতো একটা বিধিনিষেধ দিয়েছে। এখন জরুরি ভিত্তিতে ১৪ দিনের লকডাউন দিয়ে করোনার বিস্তার ঠেকাতে হবে। এর সঙ্গে সবাইকে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি হাসপাতাল, হাই-ফ্লো অক্সিজেন ন্যাজাল, আইসিইউ বেড বাড়ানো ও ফিল্ড হাসপাতাল তৈরির দ্রুত পদেক্ষপ নিতে হবে।

প্রথমে সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও লকডাউন শুরুর দুদিনের মাথায় এ ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়। গত বুধবার সকাল থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় বাস চলাচলের অনুমতি দেয় সরকার। সেই সঙ্গে আজ শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত মার্কেট-শপিং মল ও অন্যান্য দোকান খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বাকি নির্দেশনা আগের মতোই রয়েছে।