করোনাভাইরাস অতিমারীতে দেশের প্রান্তিক পরিবারগুলোর ঋণের বোঝা বাড়ছে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সঞ্চয় ভেঙে চলার মতো পদক্ষেপের পরও ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার দেনার মধ্যে পড়েছে বলে অতিমারীর প্রভাব নিয়ে পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ফেব্রুয়ারি মাসে এ জরিপ পরিচালনা করে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ‘কীভাবে অতিমারীকে মোকাবেলা করছে বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী : একটি খানা জরিপের ফলাফল’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে ফলাফল উপস্থাপন করেন জরিপের প্রধান গবেষক বেসরকারি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ইশতিয়াক বারী।
কভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্য, আর্থিক ও জীবনধারণের ওপর প্রভাব নিয়ে এ জরিপ পরিচালনা করা হয়। সারা দেশের ১০টি প্রান্তিক গোষ্ঠীর ১ হাজার ৬০০ খানায় জরিপটি সরাসরি পরিচালিত হয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত মার্চ ২০২০-এর তুলনায় ফেব্রুয়ারি ২০২১-এ প্রান্তিক গোষ্ঠীর আয় ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ ও ব্যয় ৮ দশমিক ১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এ পরিবারগুলোর প্রায় ৭৮ দশমিক ৮ শতাংশ অতিমারীর ফলে আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল, যার ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশই পুনরুদ্ধার হয়নি। সমীক্ষা করা পরিবারের প্রায় ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারকে বিকল্প পন্থা হিসেবে ঋণ নিতে হয়েছিল এবং সেটি পরিশোধ করতে তাদের গড়পড়তা প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে।
এ গবেষণার ওপর মূল্যায়ন করতে গিয়ে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অতিমারী চলাকালীন প্রান্তিক মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা যথেষ্ট নয়। এ সহযোগিতা আরও বহুগুণ বাড়ানো উচিত।
তিনি বলেন, এ অতিমারী সংকটাপন্ন মানুষকে আরও বিপন্ন করেছে। তাদের এ সমস্যা বহুমাত্রিক। একদিকে তাদের আয় কমে গেছে, খাদ্য সংকটে পড়েছে, আবার ঋণগ্রস্ত হচ্ছে। মহামারী মোকাবিলায় আগামী বাজেটে ‘সংহতি তহবিল’ গঠনের পরামর্শ দিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, এ তহবিল থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ নিশ্চিত করা গেলে প্রান্তিক মানুষের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে সিপিডির আরেক সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সংহতি তহবিল গঠনকে যৌক্তিক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে এটি সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পরিচালনার কাঠামো গঠনের কথা বলেন। তিনি আগামী বাজেটে এজন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার পরামর্শ দেন।
জরিপের প্রধান গবেষক ইশতিয়াক বারী বলেন, জরিপকালে এসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠী জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের সময়কার কষ্টের মধ্যে টিকে থাকতে প্রথমে খাদ্য বাছাইয়ে সামঞ্জস্য আনার অর্থাৎ সুষম খাবার বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এরপর খাদ্যবহির্ভূত পণ্য কেনা বাদ দিয়েছেন। এরপরও ৬০ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার বলেছে তারা ঋণগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, মহামারীর মধ্যে তারা চলমান আয় দিয়ে চলতে পারছেন কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে উপকূলীয় এলাকার ৮৬ শতাংশ, বস্তিবাসীর ৮৭ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি (এমএসএমই) উদ্যোক্তাদের প্রায় ৯৩ শতাংশ মানুষ তাদের চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন।
গবেষণার উপাত্ত তুলে ধরে তিনি আরও জানান, অতিমারীর সময়কালে পরিবারগুলোর মধ্যে ৮০ দশমিক ৬ শতাংশ খাদ্যের জন্য ব্যয় কমিয়েছে। খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় কমিয়েছে ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার সরকারি ও বেসরকারি উৎস থেকে আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছে। এর মধ্যে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার সরকারি আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার সঞ্চয় ভেঙেছে বলে উল্লেখ করে। অন্যদিকে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার আর্থিক অনটনে পড়ে গবাদিপশু বিক্রি করেছে। ২ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার জমি বা স্বর্ণ বন্দক দিয়ে অর্থের সংস্থান করেছে।
জরিপের ফলাফল তুলে ধরে শিক্ষক ইশতিয়াক বলেন, এ সময়ে চরাঞ্চলের ২১ দশমিক ১ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। অন্যান্য এলাকায়ও ১৪ থেকে ১৮ শতাংশের আয় কমেছে। একই সময়ে এদের মধ্যে ৭ থেকে ১০ শতাংশ ব্যয় কমিয়েছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ মানুষের সঞ্চয় কমে গেছে বলে জানান তিনি।
জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে সরকার ফ্রি ভ্যাকসিন দিলে তা নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন ৮২ শতাংশ মানুষ। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, মহামারীকালে ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ সরকারি সহায়তা নিয়েছেন। ১১ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার, বন্ধু ও প্রতিবেশীদের থেকে সহযোগিতা পেয়েছেন। বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছেন ২১ দশমিক ৯ শতাংশ। আবার বিভিন্ন দান বা অনুদান নিয়েছেন ৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ।
মহামারীর প্রথমদিকে প্রতি ৭০ জনে একজন চাকরি হারিয়েছেন। পরে আবার প্রতি ৯১ জনের মধ্যে একজন চাকরি পেয়েছেন বলে জরিপের আরেক উপাত্তে দেখা গেছে।