উন্নয়নশীল আট দেশের জোট ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে জোটভুক্ত দেশসমূহের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়ে জোর দিয়েছেন সদস্য দেশগুলোর সরকারপ্রধানরা। তারা আশা করছেন, সদস্য দেশগুলোর ৫৫ কোটি যুবশক্তি কাজে লাগিয়ে আর্থসামাজিক উন্নয়ন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক সরকারপ্রধান আলাদা আলাদা রূপরেখা দিয়েছেন।
সম্মেলনে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারকে ডি-৮ নেতাদের চাপ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিন বছরেও এদের প্রত্যাবাসন করতে না পারাকে দুর্ভাগ্যজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সংকটের সমাধান না হলে এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ভার্চুয়ালি দশম উন্নয়নশীল আট দেশের সমন্বয়ে গঠিত জোট ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে গণভবন থেকে যুক্ত হয়ে সভাপতি হিসেবে যুক্ত হন শেখ হাসিনা। মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান এবং তুরস্কের সরকারপ্রধানরা নিজ নিজ দেশ থেকে ভার্চুয়ালি অংশ নেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘পরিবর্তনশীল বিশ্বে অংশীদারিত্ব : যুবশক্তি ও প্রযুক্তির প্রস্তুতি’।
আগামী দুই বছরের জন্য শেখ হাসিনা ডি-৮-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ১৯৯৭ সালের ১৫ জুন ইস্তাম্বুল ঘোষণার মাধ্যমে সংস্থাটির যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য বাংলাদেশ এবার দ্বিতীয় আয়োজক। এর আগে ঢাকায় ১৯৯৯ সালে দ্বিতীয় ডি-৮ সম্মেলন বসেছিল। শেখ হাসিনাই একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি দুবার এ সংস্থার চেয়ারম্যান হতে পেরেছেন।
ডি-৮ নেতাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মানবিক বিবেচনাবোধ থেকে বাংলাদেশ ১১ লাখ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিককে আশ্রয় দিয়েছে। শুরু থেকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা নাগরিকদের নিরাপদ, সম্মানজনক এবং টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য চেষ্টা করে আসছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিন বছরের বেশি সময় পার হলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন এখনো শুরু হয়নি। এ সমস্যা বাংলাদেশের পরিবেশ, সমাজ এবং অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।’
তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়িক ধারণা, মডেল, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিতে তরুণদের শক্তি এবং সম্ভাবনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি, এমনকি সরকারি থেকে বেসরকারি পর্যায়েও ব্যবসা উদ্যোগের মাধ্যমে আমাদের (ডি-৮) যুবকদের একত্রিত হতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। ডি-৮ বিজনেস ফোরামের সঙ্গে প্রথম ডি-৮ ইয়ুথ সম্মেলন একটি বিরল সুযোগ তৈরি করেছে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী ক্ষেত্রে কার্যকরী অংশীদারিত্ব এবং বৃহত্তর সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রযুক্তির সঙ্গে যুবকদের খুব ভালো সম্পৃক্ততা কভিড-১৯ মহামারীর মধ্যেও আমাদের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে যুবশক্তিকে কাজে লাগানো, তথ্যপ্রযুক্তি সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার, প্রয়োজনীয় আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত কর্মকাঠামো তৈরি; কানেকটিভিটি বাড়ানো, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিতে হবে।’
জোটের দেশগুলোকে বাণিজ্য বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ডি-৮ সেক্রেটারিয়েট সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ক্ষেত্রে সম্ভাবনার তথ্য সরবরাহ করতে পারে। এ ধরনের তথ্য সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আরও বেশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ করতে সহায়তা করবে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ব্যবসায়ীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্বারোপ এবং কার্যকর ও টেকসই উন্নয়নে জোটের জলবায়ু ইস্যুতে সহযোগিতার ওপর জোর দিতে হবে।
মেগাব্যাংকের প্রস্তাব এরদোয়ানের : ডি-৮ভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে একটি মেগাব্যাংক গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি অনলাইনভিত্তিক এ ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলামিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এবং মুসলিম দেশগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে।’
তুর্কি রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, ‘ডি-৮ সদস্যভুক্ত দেশগুলোর বাণিজ্য সাতগুণ বেড়েছে। কিন্তু এটা যথেষ্ট নয়। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে এটা আরও বাড়ানো যাবে। আমরা (তুরস্ক) সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সহজীকরণের কৌশল প্রস্তুত করেছি এবং এটি আপনাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।’ ডি-৮ভুক্ত দেশগুলোকে উচ্চমূল্য সংযোজন সমৃদ্ধ প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পণ্য উৎপাদন প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
পারস্পরিক বাণিজ্য বৃদ্ধির আহ্বান ইমরান খানের : পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, ডি-৮ভুক্ত দেশগুলোতে ৫৫ কোটি যুবক রয়েছেন। আমাদের যুবকরা শুধু সুযোগগুলোকে কাজে লাগানোর জন্যই যথেষ্ট না, সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও তারা সক্ষম। তাদের কাজে লাগাতে হবে। তাদের মধ্যে প্রচুর উদ্যোক্তা, ব্যবসা উদ্ভাবক, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, শিক্ষাবিদ, অ্যাকটিভিস্ট, আর্টিস্ট এবং সাংবাদিক রয়েছে। এই নতুন প্রজন্মের জন্য অবশ্যই আমাদের সুযোগ করে দিতে হবে। প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী করা, উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেওয়া, যুবকদের শিক্ষা, দক্ষতা এবং প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
ইমরান খান বলেন, ‘বর্তমানে ডি-৮ দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলার। এটাকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে হবে। এই জোটের দেশগুলোর মধ্যে সীমান্ত পদ্ধতি (ইমেগ্রেশন) সহজীকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ বাড়ানো এবং বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য নতুন উদ্যোগ নিতে হবে।’ ডি-৮ পেমেন্ট কার্ড নামে নতুন একটি আর্থিক ব্যবস্থার প্রস্তাব দেন তিনি। এর মাধ্যমে সদস্য দেশভুক্ত দেশে লোকাল কারেন্সিতে অর্থ বিনিময় করা যাবে।
মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গঠনের আহ্বান ইরানের : ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে ডি-৮ সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। তিনি আশা করছেন, এ জোটের মাধ্যমে একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা গেলে বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে।
হাসান রুহানি বলেন, ‘বিশ্ব এখন ইসলামোফোবিয়ায় ভুগছে। এই প্রবণতার কারণে শুধু ইসলামে মূল্যবোধই কমছে না, এর ফলে মুসলিম দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’ তিনি এ সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচিত নিউক্লিয়ার চুক্তিতে ফিরে আসার আহ্বান জানান।