ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘নাটাই দক্ষিণ বিরাসার মাদ্রাসা’ এলাকায় কওমি মাদ্রাসা হিসেবেই পরিচিত। ওই মাদ্রাসার এক ছাত্রের গ্রামের বাড়ি একই জেলার সরাইলে। বাবা-মা নিম্ন আয়ের মানুষ। ষষ্ঠ শ্রেণির এই শিক্ষার্থী হেফাজতে ইসলামের মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নেয় নিয়মিত। সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির সহিংস কর্মসূচিতে নিজ মাদ্রাসার অন্য ছাত্রদের সঙ্গে অংশ নিয়েছিল এই শিক্ষার্থীও। তার ভাষ্য, মিছিল-মিটিংয়ে ছাত্ররা অংশ নিতে চায় না। মাদ্রাসা কর্র্তৃপক্ষ অনেকটা জোর করেই মিছিল-সমাবেশ বা এ ধরনের যেকোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করে। কেউ যেতে না চাইলে ছাত্রত্ব কেড়ে নেওয়ারও হুমকি দেওয়া হয়।
হেফাজতের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে প্রায় একই ধরনের তথ্য দিয়েছে রাজধানী ঢাকার সানারপাড় জামিয়াতুল আবরার হাফিজিয়া মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মো. আকবর হোসেন। তার গ্রামের বাড়ি বরিশাল। সে দেশ রূপান্তরকে বলে, ‘বাবা-মা কষ্ট করে আমাকে পড়ালেখা করাচ্ছেন। অথচ বড় হুজুররা মিছিল-মিটিংয়ে যেতে বাধ্য করেন। না গেলে নানাভাবে হুমকি দেন তারা। বাধ্য হয়ে আমরা আন্দোলনে যাই।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ঢাকার ওই দুই মাদ্রাসাছাত্রের মতো হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতারা আরও অনেক শিশুকে কৌশলে তাদের কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। হেফাজত নেতারা যে শিশুদের ব্যবহার করছেন, তা তদন্তে বেরিয়ে এসেছে বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও। তবে হেফাজত নেতারা বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছেন, মাদ্রাসার ছাত্ররা ইসলামের জন্য রাস্তায় নামে। কাউকে জোর করে আন্দোলনে নামানো হয় না। এসব বিশেষ মহলের প্রোপাগান্ডা।
শিশু অধিকার কর্মী ও আইনজ্ঞরা বলছেন, শিশু আইন-২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সবাই শিশু হিসেবে গণ্য হবে। একই সঙ্গে শিশুর প্রতি মানবিক আচরণ, তাদের পরিচর্যা এবং যার বা যে প্রতিষ্ঠানের জিম্মায় শিশু থাকবে, ওই শিশুর প্রতি তার বা তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে আইনে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে। যারা জোর করে শিশুদের আন্দোলনে নামাচ্ছে, তারা শাস্তিযোগ্য অপরাধ করছেন। তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। শিশুরা সংবেদনশীল এবং আইন অনুযায়ী তারা যেখানেই থাকুক না কেন পরিবারের মতো সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও মানবিক আচরণ পাওয়ার অধিকারী হলেও প্রায়ই এর ব্যত্যয় হচ্ছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগে ঘাটতি এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্দোলনের নামে হেফাজত কোমলমতি শিশুদের ব্যবহার করছে। হেফাজতের যেকোনো আন্দোলনের সময়ই দেখা গেছে, মিছিলের সামনের ভাগে ছোট শিশুরা থাকছে। তারা ভাঙচুর করলেও শিশু হওয়ায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অ্যাকশনে যেতে পারে না।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘২০১৩ সালের ১৩ মে শাপলা চত্বর ঘেরাওয়ের নামে হাজার হাজার শিশুকে মাঠে নামানো হয়েছিল। সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে হেফাজত বেশ কয়েকটি জেলায় তা-ব চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতি করেছে। এ সময়ও দেখা গেছে, হেফাজত নেতারা শিশুদের ব্যবহার করেছেন। বিষয়টি নিয়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা তদন্ত করছেন। যারা এসব ঘটনায় জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশুদের ধ্বংসাত্মক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা অত্যন্ত জঘন্য কাজ এবং এ ক্ষেত্রে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। কারণ যে কেউ যা খুশি তা-ই করতে পারে না। দেশে আইন-আদালত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশ বাহিনী রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারেরও একটা দায়িত্ব রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিশুদের এসব ধ্বংসাত্মক কাজে যদি ছোটবেলা থেকেই ব্যবহার করা হয় এটা তো কোনো মানবিক কাজ হলো না। আইনেই বলা আছে, শিশুদের কখনো ঝুঁকিপূর্ণ কোনো কাজ বা রাস্তাঘাটে যেকোনোভাবে ব্যবহার করা যাবে না। এ ধরনের কর্মকা- কোনো আইন বা কোনো সভ্যদেশে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আইন ও সংবিধান কিন্তু সব সময় শিশুদের রক্ষা করা তাদের যে অধিকার সেটি সুরক্ষিত রাখার কথা বলে। তাই এ ব্যাপারে সরকারের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
তবে শিশুদের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা নাসির উদ্দিন মনির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশু বলতে কী বোঝায় আপনি বোঝেন? যাদের বয়স ১ থেকে ১০ বছর তারা হলো শিশু। ১২ থেকে ১৮ বছর তারা হলো কিশোর। আর ২০ থেকে ২৬ বছর তারা হলো যুবক। তাহলে এবার আপনিই বলেন, আন্দোলনে আমরা কি শিশু নামাচ্ছি? কাউকে জোর করে নামানো হচ্ছে না। আমরা সারা দেশের মাদ্রাসাগুলোকে বলে দিয়েছি, মিছিল-মিটিংয়ে কোনো শিশুকে নেওয়া যাবে না।’
হেফাজতের এই কেন্দ্রীয় নেতা আরও বলেন, ‘হেফাজত একটি অরাজনৈতিক দল। আমরা ক্ষমতার জন্য আন্দোলন করছি না। ইসলামের জন্য আন্দোলন করছি। শিশুদের নিয়ে একটি মহল প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। তারা মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে।’
তবে হেফাজত নেতারা যে শিশুদের ব্যবহার করছেন তা তদন্তে বেরিয়ে এসেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হেফাজত নেতারা কোমলমতি শিশুদের ব্যবহার করছেন। আমাদের তদন্তেও তা বেরিয়ে এসেছে। যারা এসব অপকর্ম করছেন, তাদের শাস্তি পেতেই হবে। দেশের শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করার চেষ্টা করছে হেফাজত। সামনের দিনগুলোয় আর কেউ পরিবেশ নষ্ট করতে পারবে না। কঠোরভাবে তাদের দমন করা হবে।’
হেফাজতের কর্মসূচিতে শিশুদের অংশগ্রহণের বিষয়ে এই প্রতিবেদকের কথা হয় সংগঠনটির সাবেক আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর ছোট ছেলে আনাস মাদানীর সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এখন হেফাজতের সঙ্গে নেই। হেফাজতের মিছিল বা আন্দোলনে কোমলমতি শিশুরা অংশ নেয় তা সত্য। তবে ঢালাওভাবে অভিযোগ করা ঠিক নয়। আমি যখন হেফাজতের সঙ্গে ছিলাম, তখন শিশুদের মিছিলে নিতে নিষেধাজ্ঞা ছিল। তারপরও ফাঁকে চলে যেত শিশুরা।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৩ সাল থেকে হেফাজতে ইসলাম বেপরোয়া আচরণ করতে থাকে। ওই বছরের ১৩ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বর দখলের নামে তাণ্ডব চালায় তারা। ওই কর্মসূচিতে বেশির ভাগই ছিল শিশু। তারা মিছিলের অগ্রভাগে ছিল। এ নিয়ে পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার লোকজন দীর্ঘদিন ধরেই অনুসন্ধান চালায়। অনুসন্ধানে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে সারা দেশে হেফাজতের নিয়ন্ত্রণে অন্তত হাজারখানেক মাদ্রাসা আছে। এসব মাদ্রাসা থেকেই শিশুরা হেফাজতের মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নেয়। গোয়েন্দাদের তথ্যানুযায়ী, যেসব মাদ্রাসা থেকে মিছিল-মিটিংয়ে শিশু ছাত্রদের নেওয়া হচ্ছে তার মধ্যে আল-হাইয়্যাতুল উলয়াও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দারুল আরকাম মাদ্রাসা, জামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসা, ইসলামপুর মাদ্রাসা, সৈয়দুন্নেসা মাদ্রাসা, অষ্টগ্রাম বাজার মাদ্রাসা, আশুগঞ্জ বেড়তলা মাদ্রাসা, সরাইল উচালিয়া মাদ্রাসা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া দারমা মাদ্রাসা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাটাই দক্ষিণ বিরাসার মাদ্রাসা, ঢাকার সানারপাড় জামিয়াতুল আবরার হাফিজিয়া মাদ্রাসা, সিদ্ধিরগঞ্জের মা. হাদুশ শাইখ ইদরীম আল ইসলামী মাদ্রাসা, আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসা, আশরাফিয়া মহিলা মাদ্রাসা, আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া নূরুল কোরআন মাদ্রাসা, আব্দুল আলী দারুস সালাম হিফজুল কোরআন মাদ্রাসা, ইফয়জুল উলুম মুহিউচ্ছুন্নাহ আরাবিয়্যাহ, ভূঁইয়াপাড়া জামিয়া মুহাম্মদিয়া মাদ্রাসা, জামিয়াতুল ইব্রাহিম মাদ্রাসা, মারকাজুল তাহরিকে খাতমি নবুওয়াত কারামাতিয়া মাতালাউল উলুম মাদ্রাসা, নুরে মদিনা দাখিল মাদ্রাসা, চট্টগ্রামের হাটহাজারীর জামিয়া আহমদিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম বড় মাদ্রাসা, জামিয়া ইসলামিয়া হামিউস সুন্নাহ মাদ্রাসা, জামিয়া ইসলামিয়া ক্বাসেমুল উলুম মাদ্রাসা, জামিয়া হামিদিয়া নাছেরুল ইসলাম ও মাদ্রাসা মাহমুদিয়া মদিনাতুল উলুম, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর আজিজুল উলুম মাদ্রাসা, আল জামিয়াতুল কোরআনিয়া তালিমুদ্দিন হেফজখানা, নাজিরহাট আল জামেয়াতুল আরাবিয়া নাসিরুল ইসলাম মাদ্রাসা, উত্তর নিশ্চিতপুর এলাকার তালীমুল কোরআন বালক-বালিকা মাদ্রাসা, পটিয়ার আল জামিয়া আল ইসলামিয়া মাদ্রাসা, হাফেজিয়া তালীমুল কোরআন মাদ্রাসা, আশিয়া এমদাদুল উলুম মাদ্রাসা, উত্তর বারমাসিয়া হাফেজুল উলুম ইসলামিয়া মাদ্রাসা, দাঁতমারা তালীমুল কোরআন ইসলামিয়া মাদ্রাসা, সিরাজুল উলুম মাদ্রাসা, আল জামিয়া ইসলামিয়া এমদাদুল ইসলাম মাদ্রাসা, আল মাহমুদিয়া ইসলামিয়া বালক-বালিকা মাদ্রাসা, আল মাদ্রাসাতুল ইসলামিয়া আরাবিয়া হেফজখানা, কামরাঙ্গীরচরের খালপাড় মারকাযুল কোরআন আশরাফাবাদ মাদ্রাসা ও নিদাউল কোরআন ওয়াস সুন্নাহ মাদ্রাসা অন্যতম।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, হেফাজতের তা-বের পর পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে হেফাজতের নিয়ন্ত্রণাধীন মাদ্রাসাগুলোর ব্যাপারে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়। ওই সব মাদ্রাসা থেকেই জোর করে শিশুদের মিছিল-মিটিংয়ে নেওয়া হয়। কেউ যেতে না চাইলে মাদ্রাসা কর্র্তৃপক্ষ ছাত্রত্ব কেড়ে নেওয়ার হুমকি দেয়।
হাইওয়ে পুলিশের খাটিহাতা থানার (সরাইল) ওসি সাখাওয়াত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হেফাজতের গত হরতালের দিন ৪ থেকে ৫ হাজার নেতাকর্মী থানায় হামলা চালায়। ওই সময় দেখা গেছে তাদের মধ্যে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজারের মতো শুধু শিশুই। তাদের হামলায় থানার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। শুধু জীবনটা রক্ষা করতে পেরেছে পুলিশ।’
আইনজ্ঞরা জানান, শিশু আইন-২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সবাই শিশু হিসেবে গণ্য হবে। একই সঙ্গে শিশুর প্রতি মানবিক আচরণ, তাদের পরিচর্যা এবং যার বা যে প্রতিষ্ঠানের জিম্মায় শিশু থাকবে, ওই শিশুর প্রতি তার বা তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে আইনে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে। আইনের ৬৩ ধারা অনুযায়ী, সরকার প্রত্যয়িত প্রতিষ্ঠানে অবস্থানরত শিশুদের যথাযথ পরিচর্যার জন্য সরকার ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানে অবস্থানকারী প্রতিটি শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থরক্ষা, তাদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। শিশুর ওপর জিম্মাদারের নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে আইনের ৬৮ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রত্যয়িত প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে কোনো শিশুকে সোপর্দ করা হলে ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ওই শিশুকে তার মাতা-পিতার ন্যায় নিয়ন্ত্রণ, সুরক্ষা, যতœ-পরিচর্যা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করবে। আইনের ৭০ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি তার হেফাজতে, দায়িত্বে বা পরিচর্যায় থাকা কোনো শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন, অবহেলা, বর্জন, অরক্ষিত অবস্থায় পরিত্যাগ বা ব্যক্তিগত পরিচর্যার কাজে ব্যবহার করে এবং এর ফলে শিশুর অহেতুক দুর্ভোগ সৃষ্টি বা স্বাস্থ্য ও শরীরের ক্ষতি হয়, মানসিক বিকৃতি ঘটে, তাহলে দোষী ব্যক্তি পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দ-িত হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী এলিনা খান এ প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য যে বিভিন্নভাবে সুবিধার জন্য রাজনীতিতে শিশুদের ব্যবহার করা হয়। এটি কিন্তু নতুন নয়। এর আগেও শিশুদের ব্যবহার করা হয়েছে। যে শিশুদের রাস্তায় নামানো হয় তারা কিন্তু পরিবারের মধ্যে খুব কম থাকে। এর মধ্যে পথশিশুরাও রয়েছে। অথচ এই শিশুরাই হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ। কোমলমতি এই শিশুরা মারপিট, রক্ত এগুলো দেখে বড় হচ্ছে। এভাবে বড় হয়ে তারা সমাজকে কী দেবে? তাদের মনের মধ্যে তো আমরা সুকুমারবৃত্তি দিতে পারছি না। হাইকোর্টের নির্দেশনা ছিল যে শিশুদের এভাবে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু এই নির্দেশনার আলোকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা নেই।’
আর শিশু অধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশুরা সংবেদনশীল। তারা রাজনীতি, মিছিল, সমাবেশ বোঝে না। শিশু কোনো জিনিসপত্র বা কারও সম্পদ না যে কোনো হীন উদ্দেশ্য বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে তাকে দিয়ে যা খুশি তা-ই করানো যাবে। বৈধভাবে প্রতিবাদ, সমাবেশ, মিছিল করার অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু যার মতামত দেওয়ার সক্ষমতা নেই, অধিকার বোঝার মতো সক্ষমতা নেই, তাকে দিয়ে আন্দোলন করানো হচ্ছে। তাদের ব্যবহার করে অরক্ষিত অবস্থায় সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিতে দাঁড় করানো হলো। তার শরীরে গুলি লাগতে পারে। যেকোনো শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হতে পারে। এই যে পরিস্থিতি, এটি এক ধরনের নিষ্ঠুরতা। এতে করে শিশুর মৌলিক অধিকার ক্ষুণœ করা হলো।’