মোমেন-কেরি সংবাদ সম্মেলন

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার সম্মান দেখায়নি : জন কেরি

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশ অনেক কিছু করেছে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নয় বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরি। সমস্যা সমাধানে তিনি মিয়ানমারের সাবেক স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু তারা এটিকে সম্মান দেয়নি বলেও জানান তিনি।

গতকাল শুক্রবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জন কেরি এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেনের আমন্ত্রণপত্র নিয়ে গতকাল তিনি ঢাকায় আসেন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার উপস্থিত ছিলেন। ২২-২৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রে এ সম্মেলন হবে। ৪০টি দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান ভার্চুয়ালি এতে অংশ নিতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীকে বাইডেনের আমন্ত্রণপত্র দিয়ে গতকাল বিকেলেই জন কেরি ঢাকা ত্যাগ করেন।

মিয়ানমারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বাইডেনের দূত বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিনকেন এ বিষয়ে নজর রাখছেন। নতুন প্রশাসন মিয়ানমারে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য সবকিছু করবে। এর ফলে রোহিঙ্গাদের ওপর যে চাপ ও চ্যালেঞ্জ আছে, সেটি কিছুটা কমবে।’

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত শিবিরের প্রশংসা করে জন কেরি বলেন, ‘বাংলাদেশ তাদের জন্য একটি দ্বীপ দিয়েছে। তবে রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এগিয়ে আসা উচিত। কারণ এটি বাংলাদেশের একার বোঝা নয়। যুক্তরাষ্ট্র অনেক চেষ্টা করেছে যাতে করে মিয়ানমার সঠিক পথে অগ্রসর হয়। আমি অং সান সু চির সঙ্গে নিজে দেখা করেছি, যাতে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া যায়। আমি মিয়ানমারে গিয়েছি এবং সেখানকার জেনারেলদের সঙ্গে দেখা করেছি। দায়বদ্ধতার বিষয়ে বলেছি। কিন্তু তারা এটিকে সম্মান দেয়নি।’

১০০ মিলিয়ন নাগরিককে করোনা টিকা দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশে^ টিকা সরবরাহ করবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশে^র অন্যান্য দেশের জন্য আমেরিকা ভ্যাকসিন উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।’ এ সময় তিনি নবায়নযোগ্য জ¦ালানির জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, কার্বন নিঃসরণ, অভিযোজনসহ জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সহযোগিতার বিষয়ে কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলার জন্য প্রতি বছর ১০০ কোটি ডলার তহবিলে অর্থায়ন করার কথা উন্নত বিশে^র। কিন্তু এ বিষয়ে অগ্রগতি খুবই কম। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরিকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। জন কেরি সব জায়গায় সফল হয়েছেন। আমি আশা করি, প্রতি বছর ১০০ কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহের কাজটি তিনি করতে পারবেন। এই অর্থের ৫০ শতাংশ অভিযোজন (অ্যাডাপটেশন) এবং ৫০ শতাংশ প্রশমনের (মিটিগেশন) জন্য ব্যয় করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে এবং এ বিষয়ে আমরা কেরিকে জানিয়েছি। এ ছাড়া গ্লাসগোতে কপ-২৬-এ বাংলাদেশ একটি উচ্চপর্যায়ের সাই ইভেন্ট করতে চায়। এ জন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছি। রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের বনায়ন ধ্বংস করছে। তাদের টেকসই প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে এর সমাধানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা দরকার বলে কেরিকে জানিয়েছি।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জন কেরি ও আবদুল মোমেনের মধ্যকার বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ, নবায়নযোগ্য জ¦ালানি বিষয়ে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়। জন কেরিকে মোমেন বলেন, বাংলাদেশ স্বল্প কার্বন নিঃসরণের দিকে এগোচ্ছে। সরকারের গৃহীত জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট, জাতীয় সৌরশক্তি রোডম্যাপ, জাতীয় অ্যাডাপশন প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন (এনএপিএ), ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা’ নবায়নযোগ্য জ¦ালানি, জ¦ালানি সাশ্রয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বাংলাদেশের এই সব উদ্যোগকে জন কেরি উচ্চ প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও জলবায়ু পরিবর্তনে আশ্চর্যজনক ভূমিকা পালন করেছে। জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত ফোরামে (সিভিএফ) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন তিনি।

বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ¦ালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ও সে দেশের ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনুরোধ জানান। বাংলাদেশের বনায়নের উন্নয়নেও দেশটির সহযোগিতা চান তিনি। জন কেরি এ বিষয়ে বাংলাদেশকে তার দেশ সহযোগিতা করবে বলে আশ্বাস দেন।