সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু বিচার বিভাগকে নতুনভাবে গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। জুডিশিয়াল পদ্ধতি ও কাঠামো পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন। কিন্তু সেই পরিবর্তন কি হয়েছে? আজকাল টেলিফোনও বাজার দরকার হয় না। শুধু বলতে হয় অমুক স্যার এটাতে সম্পৃক্ত আছেন।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের ওপর উচ্চ আদালতের দুই বিচারপতির লেখা দুটি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। গতকাল শনিবার ভার্চুয়ালি এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধান বিচারপতিসহ অনেকে। ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ একজন যুদ্ধশিশুর গল্প ও অন্যান্য’ শীর্ষক গ্রন্থটি লিখেছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। এ ছাড়া ‘বঙ্গবন্ধু সংবিধান আইন আদালত ও অন্যান্য’ শীর্ষক বইটি লিখেছেন হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম।
আলোচনায় বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বিচারপতি ইমান আলী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু সেখানে বলেছেন ‘মার্শাল ল যখন চলছিল তখনো বিচার পেয়েছিলাম। আজকাল জামিনের কথা উঠলেই টেলিফোন বেজে ওঠে।’ বিচারপতি ইমান আলী বলেন, ‘আমি দুঃখিত। আজকাল টেলিফোন বাজারও দরকার হয় না। শুধু বলতে হয় অমুক স্যার এটাতে সম্পৃক্ত আছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, নতুন দেশ। জুডিশিয়াল সিস্টেমে পরিবর্তন দরকার। কিন্তু সেই পরিবর্তন কি এসেছে? পরিবর্তন নিশ্চয়ই এসেছে। কিন্তু কতটুকু ভালোর দিকে আমরা যেতে পেরেছি। আমাদের প্রায় ৪০ লাখ অনিষ্পন্ন মামলা। বঙ্গবন্ধু তখন বলেছিলেন, ‘ইংরেজ আমলের বিচার ব্যবস্থা পরিবর্তন করে এক বছর দেড় বছরের মধ্যে মামলার বিচার নিষ্পত্তি করার জন্য। কিন্তু আমরা এখন যে মামলা করি সেগুলো ১৫ বছর, ২০ বছর, ১০ বছরের নিচে তো নেই-ই। বঙ্গবন্ধু যে সিস্টেম পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন সেই সিস্টেম আমরা আজও পরিবর্তন করতে পারিনি। কিন্তু এটি এখনই করা দরকার।’
তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু দ্রুত বিচারের জন্য নতুন কাঠামো তৈরির কথা বলেছিলেন। সেই কাঠামো কি আমরা তৈরি করেছি। আমি বলব যে না পারি নাই।’ বিচারপতি ইমান আলী বলেন, ‘২০০৩ সালে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর চালু হয়েছিল। এর কতটুকু আমরা ব্যবহার করেছি? পারিনি। ২০১২ সালে মেডিয়েশন (মধ্যস্থতা) বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। মধ্যস্থতার মধ্যে বিচার হলে দুইপক্ষের মধ্যে কোনো আক্রোশ থাকে না। নিজেরাই নিজেদের মধ্যে সিদ্ধান্তে এলে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল, রিভিশন করতে হয় না। মামলাজট এমনিতেই কমে যায়। কিন্তু সেই ব্যবস্থা আমরা আজ পর্যন্ত ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন যে, দেশের উন্নয়নে সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি। কিন্তু দুর্নীতি কি কমেছে? দুর্নীতি এখনো আমাদের দেশের প্রতিটি জায়গায় বিদ্যমান।’
আলোচনায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন গত এক দশকে উচ্চ আদালতের কিছু যুগান্তকারী রায়ের বিষয় উল্লেখ করে সেগুলো কতটা কার্যকর হয়েছে সে প্রশ্ন তোলেন। রায় কার্যকরের লক্ষ্যে একটি মনিটরিং সেল গঠনের পরামর্শ দেন তিনি। বক্তব্যে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের রায় কার্যকর করার জন্য দেশের নির্বাহী বিভাগসহ সব ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেখানে কেন আমাদেরকে কনটেম্পট (আদালত অবমাননা) রুল ইস্যু করতে হবে। তাই সেল করে রায় কার্যকর করা যাবে না। আমরা কনটেম্পট করে রায় কার্যকর করতে পারি। কিন্তু কনটেম্পট করে করেও আমরা হয়রান। এটি করেও যথাযথভাবে রায় কার্যকর যেভাবে হওয়ার কথা, সেভাবে হচ্ছে না। এটা এখন দুঃখের বিষয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি সম্পত্তি আসলে সরকারি না। সম্পত্তির মালিক হলো জনগণ। সরকার হলো সংরক্ষণকারী। জনগণের পক্ষে সরকার সম্পত্তি সংরক্ষণ করে। এই সরকারি সম্পত্তি সংরক্ষণ করা কিন্তু সকলের দায়িত্ব। আদালত সব সময় জনগণের সম্পত্তি রক্ষায় সচেষ্ট। আমাদের যেসব রায় হচ্ছে আশা করি নির্বাহী বিভাগের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রত্যেকটা রায় বাস্তবায়িত হবে।’ বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমাদের বিশাল অর্জন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যদি জাগ্রত করতে হয় তাহলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের কথা আনতে হবে। নতুন প্রজন্মকে এগুলো জানাতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ কোনো খুনিদের দেশ নয়। এটা বঙ্গবন্ধুর সোনার দেশ। বঙ্গবন্ধুর এই সোনার দেশ অবশ্যই আমরা রক্ষা করব। বিচার বিভাগ এ বিষয়ে তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে আপনাদের কথা দিতে পারি।’ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, সাংবাদিক লেখক আনিসুল হক প্রমুখ।