শেষ হলো বইমেলা

৯০ কোটি লগ্নি বই বিক্রি ৩ কোটি ১২ লাখ টাকার

কম বই প্রকাশ আর বই বিক্রির হতাশা নিয়ে নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই শেষ হলো অমর একুশে বইমেলা। গতকাল সোমবার কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন ছাড়াই বইমেলা শেষ হয়েছে। অন্যান্য বছরের শেষ দিন সমাপনী অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলেও এবার কোনো অনুষ্ঠান করা হয়নি। মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, করোনা পরিস্থিতির কারণে সমাপনী অনুষ্ঠান করা হয়নি। বই বিক্রির কোনো হিসাবও জানায়নি বাংলা একাডেমি। এবার নতুন বই প্রকাশ হয়েছে ২৬৪০টি। গতবার নতুন বই প্রকাশের সংখ্যা ছিল ৪৯১৯টি।

অন্যান্য বছর মেলার শেষ দিন নির্ধারিত সময়ের পরও অনেক স্টলে বই বিক্রির ব্যস্ততা দেখা যায়। মেলার তথ্যকেন্দ্র থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া হয় স্টল বন্ধ করার জন্য। গতকাল মেলায় সরেজমিনে দেখা যায়, বিকেল ৫টায় মেলা শেষ করার কথা থাকলেও বিকেল ৪টায় অনেক প্রকাশক বন্ধ করে দেন বাংলা প্রকাশের বিক্রয়কর্মী শাহীন বলেন, ‘লকডাউন শুরু হয়ে যাবে। আর ক্রেতাও বেশি নাই। তাই দ্রুত স্টল গুছিয়ে নিয়েছি। মঙ্গলবারের মধ্যে স্টল ভেঙে মালামাল নিয়ে যেতে হবে। কারণ বুধবার থেকে লকডাউন শুরু হয়ে যাবে।’

এদিকে এবার মেলায় বিক্রি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন বেশিরভাগ প্রকাশক। মেলায় লোকসান হওয়ায় সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণও দাবি করেছেন প্রকাশকরা। বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি গতকাল মেলা প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে, এবার মেলায় ৯০ কোটি টাকা লগ্নি করে বই বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। তবে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন না জ্ঞান ও সৃজনশীল সমিতির কোনো প্রতিনিধি। পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, এবার মোট ৪১৩টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিয়েছে। সবচেয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী (১ ইউনিট স্টল) মেলা উপলক্ষে ন্যূনতম ১০-১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে। সব মিলিয়ে এবার প্রকাশকরা ৯০ কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ করেছিল। অন্যান্য বছরের ধারাবাহিকতায় এবার ১০০ কোটি টাকারও বেশি বিক্রির আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বিক্রি খুবই হতাশাজনক।

পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সহসভাপতি শ্যামল পাল সরকারের কাছে বেশ কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছে আমাদের প্রস্তাব প্রকাশকদের ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া, যা সমিতির মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। মেলায় অংশ নেওয়া প্রকাশকদের কাছ থেকে ১০০ কোটি টাকার বই ক্রয় করা। প্রকাশনা শিল্পের জন্য ১ হাজার কোটি টাকার সহজ শর্ত ও স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা।’

এদিকে বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি কী দাবি জানিয়েছে আমার জানা নাই। তবে জ্ঞান ও সৃজনশীল সমিতি থেকে আগেও সরকারের কাছে বিভিন্ন প্রস্তাবনা জানিয়েছি। আমরা চাই, সরকার বই ক্রয় করুক। এবার প্রকাশকরা বড় রকম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। করোনার এই ভয়াল সময়ে প্রকাশনা শিল্পের পাশে সরকার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিক।’

প্রতিভা প্রকাশের মুঈন মুরসালীন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্যান্য বছর মেলায় প্রতিদিন ৪০-৫০ হাজার টাকাও বিক্রিও হয়েছে। এবার আমাদের ৪ ইউনিটের স্টলে এক দিনে ৭৫ টাকার বইও বিক্রি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিক্রি যেদিন হয়েছে সেদিন ৮ হাজার টাকা বিক্রি করেছি।’

মেলায় কোনো সমাপনী অনুষ্ঠান না করার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার জন্য এবার সমাপনী অনুষ্ঠান করা হয়নি। আর বই বিক্রি কেমন হয়েছে তা তো সবাই দেখেছেন। আমরা প্রতিবারের মতো এবার প্রকাশকদের কাছ থেকে বিক্রির তথ্য সংগ্রহ করিনি। বাংলা একাডেমির কয়েকজন কর্মকর্তাও করোনা আক্রান্ত।’

প্রকাশকদের ক্ষতিপূরণ দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, ‘এটা প্রকাশকরা সরকারের কাছে দাবি জানাতেই পারে। তারা যদি বাংলা একাডেমির কাছে কোনো লিখিত প্রস্তাবনা জানায়, আমরা সেটি সরকারের নজরে আনার ব্যবস্থা করব। সরকার ক্ষতিপূরণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।’

এবারের মেলায় নতুন বই প্রকাশ হয়েছে ২৬৪০টি। এর মধ্যে গল্প ৩৩৯টি, উপন্যাস ৪০৫, প্রবন্ধ ১৫৮, গবেষণা ৪৭, ছড়া ৫২, শিশুসাহিত্য ৪১, জীবনী ৮৩, রচনাবলি ১৬, মুক্তিযুদ্ধ ৮২, নাটক ১৩, বিজ্ঞান ৪২, ভ্রমণ ৩৪, ইতিহাস ৬০, রাজনীতি ১৬, স্বাস্থ্য ১২, বঙ্গবন্ধু ৫৫, রম্য/ধাঁধা ১৪, ধর্মীয় ৩৫, অনুবাদ ৩০, সায়েন্স ফিকশন ২১ এবং অন্যান্য বই এসেছে ১৮৯টি। অন্যান্য বছর মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মানসম্পন্ন বইয়ের সংখ্যা জানালেও এবার সেটি করা হয়নি।