রাজস্ব ফাঁকি দিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে পছন্দের কর্মকর্তাদের দিয়ে আমদানি করা পণ্যের শুল্কায়নের অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে মিথ্যা ঘোষণার পণ্য সহজে পার পেয়ে যাওয়ায় সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। দেশব্যাপী শুল্ক স্টেশনগুলোতে নির্ধারিত কর্মকর্তার বাইরে অন্য কর্মকর্তা দিয়ে এভাবে দেদার পণ্য শুল্কায়ন হওয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে খোদ এনবিআরে। আর এ প্রবণতা বন্ধে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বাইরে অন্য কোনো কর্মকর্তাকে দিয়ে আমদানিকৃত চালানের শুল্কায়ন না করার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়ে আদেশ জারি করেছে এনবিআর। গত ১১ এপ্রিল এমন আদেশ জারি করা হয়।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, দেশব্যাপী আমদানিকৃত পণ্যের শুল্কায়নে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন করে থাকে সংশ্লিষ্ট শুল্ক স্টেশনের কর্তৃপক্ষ। তবে অনেক দিন ধরেই আমদানি চালানে অনিয়ম করার স্বার্থে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়েই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বদলে অন্য কর্মকর্তা দিয়ে এ কাজ করানোর অভিযোগ উঠেছে। এক্ষেত্রে সাধারণত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান কিংবা আমদানিকারকের পক্ষের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট নিজেদের পছন্দের রাজস্ব কর্মকর্তাকে দিয়ে কৌশলে বিল অব এন্ট্রি তথা আমদানি চালান শুল্কায়ন করিয়ে নেয়। ধারণা করা হচ্ছে, এর ফলে মিথ্যা ঘোষণার পণ্য সহজে পার পেয়ে যাওয়ায় সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বাইরে হুটহাট অন্য কোনো কর্মকর্তাকে দিয়ে আমদানিকৃত চালানের শুল্কায়ন না করার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে এনবিআর।
এনবিআরের ওই আদেশে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বাইরে অন্য কর্মকর্তার মাধ্যমে আমদানিকৃত চালান শুল্কায়নের ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি নিতে হবে। যথাযথ অনুমোদন ছাড়া পণ্য চালান শুল্কায়নে কর্মকর্তা বদলের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দিয়ে পণ্য শুল্কায়ন সংক্রান্ত এনবিআরের আদেশে বলা হয়, এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে কোনো কর্মকর্তার নামে সিস্টেম হতে বরাদ্দকৃত বিল অব এন্ট্রি যথাযথ কারণ উল্লেখ ছাড়া কোনোভাবেই অন্য কর্মকর্তাকে দিয়ে যাতে শুল্কায়ন হতে না পারে, কাস্টম হাউজ থেকে যথাযথ কার্যক্রম গ্রহণ করা দরকার। ২০১৩ সালে এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড পদ্ধতি চালু হলেও বিষয়টি এখন পর্যন্ত কোনো কাস্টম হাউজ থেকে এনবিআরের নজরে আনা হয়নি। এতে বলা হয়, ইতিমধ্যে সব কাস্টম হাউজ থেকে তথ্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করে উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের আমদানি রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি হয় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের মাধ্যমে। এর বাইরে বেনাপোল কাস্টমস হাউজ ছাড়াও বেশ কয়েকটি কাস্টম হাউজের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি পণ্য শুল্কায়ন হয়ে থাকে। গত কয়েক বছর থেকেই সব শুল্ক স্টেশনে একই নিয়মে শুল্কায়ন করার লক্ষ্যে অনলাইনভিত্তিক শুল্কায়ন বা এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড পদ্ধতি ব্যবহার হয়ে আসছে। এই পদ্ধতি ব্যবহার শুরু হলে অনিয়ম কমবে বলে বলা হলেও বাস্তবে নানা ফাঁকফোকর বের করে অনিয়ম হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, আমদানিকৃত পণ্য চালানের বিল অব এন্ট্রি পরীক্ষা করে এতে কী হারে শুল্ক হবে, তা রাজস্ব কর্মকর্তারা নির্ধারণ করেন। শুল্ক ফাঁকি দিতে কোনো কোনো আমদানিকারক মিথ্যা ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে বেশি মূল্যের পণ্যকে কমমূল্যে শুল্কায়নের চেষ্টা করে থাকেন। এক্ষেত্রে আমদানিকারক কিংবা আমদানিকারকের পক্ষ হয়ে কাজ করা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা তাদের পছন্দের কর্মকর্তাদের দিয়ে এটি করানোর চেষ্টা করেন। আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ কিংবা অপেক্ষাকৃত সৎ কর্মকর্তাদের দিয়ে এ ধরনের অনিয়ম করানো সম্ভব না হওয়ায় তারা পছন্দের কর্মকর্তাদের দিয়ে শুল্কায়ন করানোর চেষ্টা চালান। নানা কায়দায় এ কাজটি করিয়ে নেন তারা। এক্ষেত্রে শুল্ক স্টেশনগুলোতে সিন্ডিকেটও রয়েছে বলে অভিযোগ।
এনবিআরের এ সংক্রান্ত আদেশ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, সাধারণত যেসব আমদানিকৃত চালানের ডকুমেন্টে ঘাপলা থাকে, তারা পছন্দের কর্মকর্তাকে দিয়ে শুল্কায়ন করানোর চেষ্টা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। যে কর্মকর্তা ভালো আইন বোঝেন কিংবা সহজে অনিয়ম ছাড় দেন না, আমদানিকারকরা ওই ধরনের কর্মকর্তাকে এড়ানোর চেষ্টা করেন।