জরুরি সেবায় নিযুক্তদের ভোগান্তি দূর করুন

করোনা সংক্রমণের তীব্রতা বাড়তে থাকায় সরকার ঘরের বাইরে যাওয়া-আসা ও চলাচলে আরোপ করেছে কঠোর বিধিনিষেধ। তবে গণমাধ্যম, ব্যাংক, শিল্পকারখানা ও হাসপাতালে কাজ চলছে। জরুরি সেবা খাতগুলোও খোলা রয়েছে। জরুরি সেবার কাজে জড়িতদের এবং জরুরি প্রয়োজনে জনসাধারণের বাইরে বের হওয়ার জন্য পুলিশ পাসের কথা বলা হয়েছে। যেটিকে বলা হচ্ছে ‘মুভমেন্ট পাস’। এই পাসের মেয়াদ থাকবে মাত্র ৩ ঘণ্টা। লকডাউনের মধ্যে চলাচলের জন্য পুলিশের ‘মুভমেন্ট পাস’ পেতে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ১৫ কোটি ৯৯ লাখ ২২ হাজার ৬৫ বার হিট করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মিনিটে হিট হয়েছে ১৪ হাজার ২৬টি। ৪৬ ঘণ্টায় ওয়েবসাইটে ঢুকে মুভমেন্ট পাসের জন্য নিবন্ধন করেছেন চার লাখ ৯৭৭ জন। আর পাস ইস্যু করা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৮০১টি। পুলিশ সদর দপ্তরের এই তথ্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে, মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় অনুমোদন খুবই সীমিত।

এছাড়া ‘মুভমেন্ট পাস’ অ্যাপটিতে ঢুকতেও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। যদিও পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রথম দিনে একসঙ্গে অনেকে মুভমেন্ট পাস নেওয়ার চেষ্টা করায় এই ঝামেলা হয়েছে। দুপুরের দিকে বা একটু বেশি রাতের দিকে মুভমেন্ট পাস পাওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে বলেও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

চলমান পরিস্থিতিতে কারা বের হতে পারবেন, কারা পারবেন না, এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির ঘটনাও ঘটছে। পুলিশ এমন অনেকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়েছে, যারা জরুরি সেবার আওতায় পড়েছেন। বাসা থেকে হাসপাতালে ও হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরতে ভোগান্তি ও দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন বলেও একাধিক চিকিৎসক জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষের দুর্ভোগের ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে। কাউকে কাউকে জরিমানা গুনতে হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে দেওয়া, কিংবা দুই ঘণ্টা পর্যন্ত পথে আটকে থাকার মতো ঘটনাও ঘটেছে। ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি রাইটস অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটিজ (এফডিআরএস) এসব খবর দিয়েছে। ‘মুভমেন্ট পাস’ এই উদ্যোগটিও শুরুতেই সমালোচিত হলো। অথচ, চাইলেই এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো।

রাস্তায় বের হওয়া কোনো কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অসৌজন্যমূলক আচরণেরও অভিযোগ তুলেছেন অনেকে। জরিমানা করার পাশাপাশি চিকিৎসকের গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও এসেছে। বারবার চেষ্টা করেও মুভমেন্ট পাস বের করতে পারেননি বলেও উল্লেখ করেছেন অনেকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানবিক হলে এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। চলমান ‘লকডাউন’-এ চিকিৎসকরা কী করে হাসপাতালে পৌঁছাবেন, তার একটা ব্যবস্থা করা অতি জরুরি। কোনো কোনো ব্যাংক কর্মকর্তার মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানোর ঘটনাও ঘটেছে। সবার ব্যক্তিগত গাড়ি নেই। নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা রাখার সক্ষমতা না থাকলেও বিকল্প ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্যোগী হতে হবে।

বাংলাদেশের বিরাজমান বাস্তবতায় একটা নিয়ম নির্ধারণ করে দেওয়া দরকারি। আর সেটি যদি শুরুতেই করা যেত তাহলে ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হতো না। চলমান কঠোর বিধিনিষেধে সবাই ঘরবন্দি হয়ে আছে। মনে রাখতে হবে, এর মধ্যে রোগীদের হাসপাতালের প্রয়োজন ফুরায়নি। তারা হাসপাতালের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছেন। কিন্তু এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘোরার ভোগান্তি কমেনি। রোগীর সঙ্গে রোগীর স্বজনরা রয়েছেন। একসঙ্গে সবার মুভমেন্ট পাস সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে পাস ছাড়াই অনেকে ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ঘটনা জানা যাচ্ছে, যা আমাদের হতবিহ্বল করে দিচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে করোনা দুর্যোগের মধ্যে ‘লকডাউন’ যেন নতুন বিপদ হয়ে দেখা না দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেসব সদস্য বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও মানবিক আচরণ জনসাধারণের দুর্ভোগ কমাতে পারে। করোনা মহামারীর এই দুঃসময়ে একজন আরেকজনের ভোগান্তির কারণ না হয়ে সহমর্মী হয়ে পাশে দাঁড়াবে এটাই প্রত্যাশিত।