মাগুরায় করোনায় কর্মহীন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের জন্য প্রণোদনার অর্থ বিতরণে বড় ধরনের অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। মাথাপিছু ১০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ পাওয়া ৪৩৮ জনের এই তালিকায় বেশ কিছু মৃত ব্যক্তিসহ একই পরিবারের ৬ থেকে ১৫ জন করে সদস্যের নাম রয়েছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ ও সরকারবিরোধী অনেকের নামও রয়েছে তালিকায়, যাদের কেউই শিল্পী বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নন। আবার দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে রয়েছেন এমন অনেকের নাম রয়েছে সুবিধাভোগীর তালিকায়। অন্যদিকে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন করোনায় কর্মহীন প্রকৃত শিল্পী-কলাকুশলীদের অনেকেই।
জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদকের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে সহসাধারণ সম্পাদক বিশ^জিৎ চক্রবর্তী ও অজিত রায় এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে নিজেদের সুবিধামতো বিভিন্ন ব্যক্তির নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর সংগ্রহ করে মনগড়া ওই তালিকা চূড়ান্ত করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তালিকা যাচাই করে দেখা গেছে, ৩৫৫ নম্বর ক্রমিকে থাকা সুধা রানী চক্রবর্তী গত ১২ মার্চ মারা গেছেন। অথচ তার নামে বরাদ্দ হওয়া চেকের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। তালিকায় ২৩৮, ২৭২, ২৭৪, ২২৯, ২৫৫, ২৫৬, ২৫৭, ২৬৪, ২৬৫, ২৬৬, ২৬৭, ২৬৮,২৭০, ২৭১, ২৩৮ নম্বর ক্রমিকে থাকা ব্যক্তিরা জেলা শিল্পকলা একাডেমির সহসাধারণ সম্পাদক বিশ^জিৎ চক্রবর্তীর নিকটাত্মীয়। তাদের মধ্যে জেলার শালিখা উপজেলার তালখড়ি গ্রামের আনন্দ চক্রবর্তী ও তার আপন ছোট বোন বীথি চক্রবর্তী ৫ বছর ধরে সপরিবারে ভারতে রয়েছেন। তালিকায় নাম থাকা বিশ^জিৎ চক্রবর্তীর অন্য আত্মীয়রা হলেন পবিত্র কুমার চক্রবর্তী, ইন্দ্রজিৎ চক্রবর্তী, বরুণ চক্রবর্তী, ইতি চক্রবর্তী, প্রণয় চক্রবর্তী, প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী, গোপাল চক্রবর্তী, বন্দনা চক্রবর্তী, প্রদীপ চক্রবর্তী, কার্তিক চক্রবর্তী, সুদীপ্ত চক্রবর্তী, দুলাল ভট্টাচার্য ও ছবি রানী ভট্টাচার্য। এরা কেউই করোনায় কর্মহীন শিল্পী নন। শুধু বিশ^জিৎ চক্রবর্তীর পরিবারের সদস্য হওয়ায় স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে তাদের নাম তালিকাভুক্ত করে ১০ হাজার টাকা করে উত্তোলন করা হয়েছে। একইভাবে শিল্পকলা একাডেমির সংগীত শিক্ষক অজিত রায়ের পরিবারের ৬ নারীর নাম দিয়ে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। তারা হচ্ছেন সন্ধ্যা রানী ঘোষ, প্রিয়া ঘোষ, রিয়া ঘোষ, ডলি ঘোষ, আপন ঘোষ ও লিলি ঘোষ। শহরের কেশব মোড়ের বাসিন্দা বর্তমানে স্বামীর কর্মস্থল ঢাকায় অবস্থানরত স্নিগ্ধা পাল ও তার মায়ের নামে ১০ হাজার করে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্নিগ্ধা পালের স্বামী একজন কাস্টমস কর্মকর্তা। মাগুরা শহরে তার দুটি ফ্ল্যাট, একটি বাড়ি ও একটি বিশাল বাগানবাড়ি রয়েছে। অথচ স্বজনপ্রীতি করে তাকে ও তার মা জোছনা পালকে ১০ হাজার করে মোট ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদকের অসুস্থতার কারণে অফিসে না আসার সুযোগ নিয়ে সহসাধারণ সম্পাদক বিশ^জিৎ চক্রবর্তী ও অজিত রায় এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একটি অসাধুচক্র নিজের সুবিধামতো বিভিন্ন ব্যক্তির নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর সংগ্রহ করে মনগড়া ওই তালিকা চূড়ান্ত করেছেন।
তালিকা যাচাই করতে গিয়ে দেখা গেছে, ২২ নম্বর ক্রমিকে অচলা ম-ল নামে এক নারীর নাম রয়েছে। তার নামের পাশে দেওয়া ফোন নম্বরে করলে ওই নারীর বদলে সাতক্ষীরা থেকে আবদুর রহমান নামে এক ব্যক্তি কল রিসিভ করেন। অন্যদিকে শহরের তাঁতিপাড়া এলাকার বাসিন্দা শিল্পী কবরী ঘোষের নাম তালিকায় থাকলেও তিনি কোনো টাকা বা চেক পাননি বলে জানিয়েছেন। অথচ ইতিমধ্যে চেক বিতরণ করা হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন শিল্পকলা একাডেমির সংশ্লিষ্টরা।
মাগুরার শিল্পী শামসুজ্জামান পান্না, রানী হায়দার, শংকর বিশ^াসসহ একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, শিল্পকলার এই প্রণোদনার তালিকায় থাকা নামগুলোর মধ্যে ৭০ ভাগই তালিকা প্রস্তুতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পছন্দের। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ ও সরকারবিরোধী অনেকের নাম এই তালিকায় আছে। যারা কেউ সাংস্কৃতিক ব্যক্তি নন। বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য পরিচয়ে তারা এই টাকা পেয়েছেন।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জেলা শিল্পকলা একাডেমির সহসাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার পরিবারের সদস্যরা যদি প্রণোদনা পাওয়ার উপযোগী হন, তাহলে তারা টাকা পেতেই পারেন। আমি কোনো স্বজনপ্রীতি বা দুর্নীতি করিনি।’
এ প্রসঙ্গে জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘শিল্পকলা একাডেমি থেকে নামের তালিকা চেয়ে পাঠানোর পর দ্রুত তা পাঠানো হয়েছে। ফলে কিছুটা অসামঞ্জস্য থাকতেই পারে।’ তালিকার সবাইকে টাকা দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে তালিকায় একই পরিবারের ১৫ জনের নাম থাকাটা দুর্ভাগ্যজনক বলে স্বীকার করেন এই কর্মকর্তা।
এ ব্যাপারে জেলা শিল্পকলা একাডেমির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শামীম আহমেদ খান বলেন, ‘এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনার বিপুল পরিমাণ টাকা বণ্টনের ক্ষেত্রে ব্যাপক সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে তালিকা প্রণয়নের সময় শিল্পকলার নির্বাহী কমিটির সদস্যদের অধিকাংশের মতামতই নেওয়া হয়নি। যে কারণে সাংস্কৃতিক ব্যক্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত পছন্দের প্রভাব তৈরি হয়েছে, যা কাম্য নয়।’
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক ড. আশরাফুল আলম বলেন, ‘তালিকা অনুযায়ী বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে বণ্টন করা হয়েছে। তবে তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হলে সেটি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’