ব্রাজিলের ‘দেবদূতরা’ মরছে করোনায়

মহামারী করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকেই দাবি করা হচ্ছিল শিশু ও তরুণরা তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিমুক্ত। পরিসংখ্যানও বলছিল সেই কথা। কিন্তু ভাইরাসের ধরন বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। তরুণরাই এখন আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। বাদ যাচ্ছে না শিশুরাও। কয়েক মাস ধরেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশুদের আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। তবে শিশুদের করোনা আক্রান্তের বিষয়ে সম্প্রতি ব্রাজিলের যে তথ্য সামনে এসেছে তা আঁতকে ওঠার মতো। দেশটিতে গত এক বছরে করোনায় আক্রান্ত হয়ে এক বছরের কম বয়সী অন্তত ১ হাজার ৩০০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। করোনায় আক্রান্ত শিশুদের সেবা দিতে দিতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন দেশটির চিকিৎসক-নার্সরা। তারা বলছেন, চোখের সামনে ‘দেবদূতের’ মতো শিশুদের মৃত্যু দেখতে দেখতে তারা ক্লান্ত। 

এদিকে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় শিশু হাসপাতালগুলোর বাইরেও কাউকে আসতে দেওয়া হচ্ছে না। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সিনারা কার্নেইরো বলেন, ‘আইসিইউতে তাদের বাবা-মাও কাছে আসতে পারছেন না। টেলিফোনেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হচ্ছে। তাদের অনেকেই জানতেও পারছেন না আদরের বাচ্চাটি হয়তো কখনই তাদের কোলে ফিরবে না।’ তিনি বলেন, ‘ফুলের মতো পবিত্র শিশুরা নিজেদের সমস্যার কথা বলতেও পারছে না। প্রতিটি মৃত্যু আমাদের হৃদয় ভেঙে দিচ্ছে।’

ব্রাজিলে এত বেশি শিশুর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। গত বৃহস্পতিবার সেই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে তারা। আর তাতেই উঠে এসেছে দেশটির শিশুদের করুণ মৃত্যুর কিছু তথ্য, কিছু অজানা গল্প। প্রতিবেদনটিতে এই মহামারীর শিকার লুকাস নামের এক বছর বয়সী শিশুর করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ঘটনাক্রম তুলে আনা হয়েছে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লুকাস যখন করোনায় আক্রান্ত হয় তখন তার বয়স ছিল এক বছর। তার পরিবারের দাবি, ছোট্ট লুকাসের ছোট্ট শরীরে করোনাভাইরাসের অনেক উপসর্গই ছিল। কিন্তু তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক বলেন, ‘ওর করোনা হয়নি। চিন্তার কোনো কারণ নেই। সাধারণ ফ্লু হতে পারে। এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। করোনা পরীক্ষারও দরকার নেই তার।’

লুকাসের বাবা-মা ভরসা রেখেছিলেন ওই চিকিৎসকের কথায়। লুকাসও প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে উঠেছিল। শারীরিক দুর্বলতা ছাড়া আর বিশেষ কোনো লক্ষণও ছিল না এক মাস অবধি। কিন্তু এরপরই দ্রুত বদলাতে থাকে লুকাসের অবস্থা। কয়েক দিনের মধ্যেই তীব্র অসুস্থতা পেয়ে বসে তাকে। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নেওয়া হয় আইসিইউতে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কয়েক দিনের লড়াইয়ে মৃত্যুর কাছে হার মানে ছোট্ট লুকাস।

লুকাসের মা জেসিকা রিকার্টে বিবিসিকে বলেন, ‘আমার মনে হয় করোনার টেস্টটা আগেই করালে লুকাসকে বাঁচানো যেত। সে হয়তো যথাযথ চিকিৎসাটা পেত। কিন্তু ডাক্তার সেটা চাননি। তিনি শুধু সামান্য দেখে রোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।’

লুকাসের মতো অনেক শিশুর করোনা টেস্ট না হওয়ার কারণে শারীরিক অবস্থা জটিল হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই মারা গেছে উপযুক্ত চিকিৎসা না পেয়ে। দেশটির রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ফাতিমা মারিনহো বলেন, ‘করোনা শনাক্ত করতে গিয়ে আমাদের গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের জন্য টেস্ট করার সুযোগ খুবই কম। শিশুদের ক্ষেত্রে তা আরও নগণ্য। যেহেতু রোগ শনাক্ত হতেই দেরি হচ্ছে, তাই শিশুদের চিকিৎসার শুরুতেও হচ্ছে বিলম্ব। কিন্তু ততক্ষণে আর করার কিছুই থাকছে না।’

তিনি জানান, ‘অনেক ক্ষেত্রে করোনা টেস্ট বা চিকিৎসায় বর্ণবাদেরও শিকার হচ্ছে শিশুরা। এর কারণে করোনার বলি হচ্ছে দরিদ্র ও কৃষ্ণাঙ্গ শিশুরা।’

এই রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞের মতে, শুরুতেই করোনার পরীক্ষা করা গেলে শিশুদের মৃত্যুহার হয়তো কিছুটা কমানো যেত। অকালেই ঝরে পড়ত না ‘স্বর্গের’ ফুলগুলো।